যুক্তরাজ্যের সামাজিক আবাসন বা কাউন্সিল হাউজিং ব্যবস্থায় বসবাসরত বিদেশি নাগরিকদের তিন মাসের মধ্যে বিকল্প ব্যক্তিগত বাসস্থান খুঁজে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন রিফর্ম ইউকের নেতা নাইজেল ফারাজ। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিকল্প আবাসনের ব্যবস্থা করতে ব্যর্থ হলে তাদের যুক্তরাজ্যে থাকার অধিকার বাতিল করে বহিষ্কারের আওতায় আনার কথাও বলেছেন তিনি।
রোববার প্রকাশিতব্য তার নতুন প্রবন্ধে ফারাজ বলেন, রিফর্ম ইউকে ক্ষমতায় এলে সামাজিক আবাসন বরাদ্দের ক্ষেত্রে যুদ্ধফেরত সেনাসদস্য, দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় এলাকায় বসবাসকারী ব্রিটিশ নাগরিক, ডমোস্টিক ভায়োল্যান্সের শিকার ব্যক্তি এবং কেয়ার সেন্টার থেকে বেরিয়ে আসা তরুণদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
তিনি লিখেছেন, “যেসব বিদেশি নাগরিক তিন মাসের গ্রেস পিরিয়ডের পরও ব্যক্তিগত ভাড়া বাসায় স্থানান্তরিত হতে পারবেন না, তারা যুক্তরাজ্যে থাকার অধিকার হারাবেন এবং ‘অপারেশন রিস্টোরিং জাস্টিস’-এর আওতায় বহিষ্কারের জন্য দায়বদ্ধ হবেন।”
টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দ্বৈত নাগরিকত্বধারীদের ক্ষেত্রে সরাসরি কাউন্সিল বাসা ছাড়তে বাধ্য করা হবে না। তবে তাদের হাউজিং বেনিফিটসহ বিভিন্ন কল্যাণমূলক সুবিধা কমিয়ে আনা হতে পারে।
আগামী বৃহস্পতিবার মেকারফিল্ড উপনির্বাচনকে সামনে রেখে রিফর্ম ইউকের অভিবাসন নীতিতে আরও কঠোর অবস্থান নেওয়ার ইঙ্গিত হিসেবে এই ঘোষণাকে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, দলটি কিছু ভোটার সমর্থন হারিয়ে ডানপন্থী আরেকটি দল ‘রিস্টোর ব্রিটেন’-এর চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
ফারাজ তার প্রবন্ধে দাবি করেন, ২০২০ সালের পর থেকে হাজার হাজার সামাজিক আবাসন শরণার্থীদের বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা তিনি “একটি অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত” বলে বর্ণনা করেন।
তার ভাষায়, “সামাজিক আবাসনের ক্ষেত্রে ব্রিটিশ নাগরিকদের অগ্রাধিকার নিশ্চিত করতে হবে।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, আবাসন নীতির পরিবর্তনের কারণে কিছু এলাকায় মূল ব্রিটিশ জনগোষ্ঠী আবাসন সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছে এবং এর ফলে স্থানীয় সম্প্রদায়ের সামাজিক কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ফারাজ দাবি করেন, বর্তমানে লন্ডনের সামাজিক আবাসনে বসবাসরত প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ভাড়াটিয়া যুক্তরাজ্য বা আয়ারল্যান্ডের বাইরে জন্মগ্রহণ করেছেন। যদিও সরকারি পরিসংখ্যান এই দাবির ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছে।
২০২৪ সালে মাইগ্রেশন অবজারভেটরির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে নতুন সামাজিক আবাসন বরাদ্দের প্রতি ১০টির মধ্যে একটি ক্ষেত্রে প্রধান ভাড়াটিয়া ছিলেন অ-ব্রিটিশ নাগরিক। গবেষণা প্রতিষ্ঠানটির মতে, জনসংখ্যায় অ-ব্রিটিশ নাগরিকের সংখ্যা বৃদ্ধির কারণেই এই পরিবর্তন ঘটেছে।
একই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী সামাজিক আবাসনে বসবাসকারীদের ৭ শতাংশের অ-ব্রিটিশ পাসপোর্ট ছিল। ২০১১ সালে এই হার ছিল ৫ শতাংশ।
ফারাজের প্রস্তাবের কড়া সমালোচনা করেছে সরকারপক্ষ। হাউজিং সেক্রেটারি স্টিভ রিডের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্রের দাবি, এ ধরনের নীতি বাস্তবায়ন করতে গেলে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন সংস্থা আইসিই (ICE)-এর আদলে একটি বিশেষ বহিষ্কার বাহিনী গঠন করতে হবে।
ওই সূত্র জানায়, “যদি ফারাজ মনে করেন যে ব্রিটিশ জনগণ আমেরিকান ধাঁচের অভিবাসন রাজনীতিকে সমর্থন করবে, তাহলে তিনি ভুল করছেন।”
সরকারের এক মুখপাত্র বলেন, অবৈধ অভিবাসী, আশ্রয়প্রার্থী এবং শিক্ষার্থী বা কর্মভিসাধারীরা সামাজিক আবাসনের জন্য যোগ্য নন।
তিনি আরও বলেন, “প্রায় ৯০ শতাংশ সামাজিক আবাসন ব্রিটিশ নাগরিকদের বরাদ্দ দেওয়া হয়। অধিকাংশ স্থানীয় কর্তৃপক্ষেরই কঠোর স্থানীয় সংযোগ নীতি রয়েছে, যাতে আবাসন প্রকৃত প্রয়োজনভিত্তিকভাবে বরাদ্দ করা যায়।”
রিফর্ম ইউকে এর আগে ঘোষণা দিয়েছিল যে, “অপারেশন রিস্টোরিং জাস্টিস”-এর আওতায় পাঁচ বছরে প্রায় ছয় লাখ অভিবাসীকে বহিষ্কার করার পরিকল্পনা রয়েছে।
গত এপ্রিলে ফারাজ জানিয়েছিলেন, অবৈধভাবে যুক্তরাজ্যে প্রবেশকারী প্রায় চার লাখ শরণার্থীর আশ্রয়ের অধিকার বাতিল করে তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হবে।
এছাড়া দলটি “ইনডেফিনিট লিভ টু রিমেইন” (আইএলআর) ব্যবস্থা বাতিলের প্রস্তাবও দিয়েছে। বর্তমানে অধিকাংশ অ-ইউরোপীয় অভিবাসী পাঁচ বছর বৈধভাবে বসবাসের পর স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পাওয়ার সুযোগ পান। নতুন প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে তাদের নিয়মিত নতুন করে ভিসার আবেদন করতে হতে পারে।
তবে যুক্তরাজ্যে জন্মগ্রহণকারী এবং ব্রিটিশ নাগরিকত্ব পাওয়া শিশুদের বহিষ্কার করা হবে না বলে জানিয়েছে দলটি। যদিও তাদের অভিভাবকদের ভবিষ্যৎ অবস্থান সম্পর্কে এখনো স্পষ্ট কোনো নীতিমালা প্রকাশ করা হয়নি।
অভিবাসন ইস্যুতে রিফর্ম ইউকের ভেতরেও মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি দলের স্বরাষ্ট্রবিষয়ক মুখপাত্র জিয়া ইউসুফ এবং ট্রেজারি বিষয়ক মুখপাত্র রবার্ট জেনরিকের মধ্যে প্রকাশ্যে ভিন্নমত দেখা যায়।
জেনরিক এক সাক্ষাৎকারে বলেন, কাউন্সিল বাসায় থাকার কারণে বিদেশি নাগরিকদের স্বয়ংক্রিয়ভাবে বহিষ্কার করা হবে না।
তবে জিয়া ইউসুফ পরে স্পষ্ট করে জানান, “যদি কোনো বিদেশি নাগরিক করদাতাদের অর্থে পরিচালিত সামাজিক আবাসনে বসবাস করেন, তাহলে তিনি আমাদের অর্থনৈতিক মানদণ্ডে ব্যর্থ হবেন এবং বহিষ্কারের আওতায় পড়বেন।”
শনিবার প্রকাশিত মেকারফিল্ড উপনির্বাচনের এক জরিপে দেখা যায়, লেবার-সমর্থিত প্রার্থী অ্যান্ডি বার্নহাম ৪৫ শতাংশ সমর্থন নিয়ে এগিয়ে রয়েছেন। রিফর্ম ইউকের প্রার্থী রবার্ট কেনিয়নের সমর্থন ৪০ শতাংশ এবং রিস্টোর ব্রিটেনের প্রার্থী রেবেকা শেফার্ড পেয়েছেন ৮ শতাংশ সমর্থন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ক্রমবর্ধমান আবাসন সংকট এবং অভিবাসন প্রশ্নকে কেন্দ্র করে ভোটারদের উদ্বেগকে পুঁজি করতেই রিফর্ম ইউকে আরও কঠোর নীতিগত অবস্থান গ্রহণ করছে। তবে মানবাধিকার, আইনি জটিলতা এবং সামাজিক সংহতির প্রশ্নে ফারাজের প্রস্তাব ইতোমধ্যেই দেশজুড়ে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
সূত্রঃ দ্য টেলিগ্রাফ
এম.কে

