যুক্তরাজ্যের দক্ষ কর্মী ভিসা ব্যবস্থাকে ঘিরে নতুন করে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। গাড়ি ধোয়ার প্রতিষ্ঠান, কাবাবের দোকান, ভ্যাপের দোকান, মিনি-মার্ট, নাপিতের দোকানসহ বিপুলসংখ্যক ছোট ব্যবসা এখনো বিদেশি কর্মী নিয়োগের জন্য স্পনসর লাইসেন্স ধরে রেখেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এতে প্রশ্ন উঠেছে—উচ্চ দক্ষতার পেশাজীবীদের আকৃষ্ট করার উদ্দেশ্যে তৈরি এই ভিসা ব্যবস্থা কি বাস্তবে ছোট ও অপেক্ষাকৃত কম দক্ষতার খাতেও ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করছে?
সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যুক্তরাজ্যে ১ হাজার ৯০০টিরও বেশি ছোট উচ্চসড়কভিত্তিক ব্যবসা এখনো বিদেশি কর্মীদের স্পনসর করার লাইসেন্সের তালিকায় রয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৫০০টির বেশি মুদি ও সুবিধা-ভিত্তিক দোকান, প্রায় ১৫০টি ট্যাক্সি পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান, শতাধিক নাপিতের দোকান এবং কয়েক ডজন গাড়ি ধোয়ার প্রতিষ্ঠান ও ভ্যাপের দোকান রয়েছে।
এদিকে জুনে প্রকাশিত আরেক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ব্রিটেনে অন্তত ১৫৯টি কাবাবের দোকানের কাছে বিদেশি কর্মীদের স্পনসর করার জন্য স্বরাষ্ট্র দপ্তরের লাইসেন্স রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট যোগ্যতা পূরণকারী কর্মীদের নিয়োগের সুযোগ রয়েছে। তবে কোনো কাবাবের দোকান বা অন্য কোনো ব্যবসা লাইসেন্সধারী হওয়ামাত্রই সেখানে থাকা সব ধরনের পদে বিদেশি কর্মী আনা বৈধ হয়ে যায় না।
দক্ষ কর্মী ভিসা মূলত যুক্তরাজ্যে প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও যোগ্যতাসম্পন্ন বিদেশি কর্মীদের নিয়োগের একটি প্রধান অভিবাসন পথ। তবে বর্তমানে যে প্রশ্নটি সামনে এসেছে, তা হলো—একটি প্রতিষ্ঠান কেন স্পনসর লাইসেন্স পাচ্ছে এবং সেই লাইসেন্স ব্যবহার করে কোন ধরনের পদে বিদেশি কর্মী নিয়োগ করতে পারছে।
২০২৫ সালের জুলাইয়ে দক্ষ কর্মী ভিসার নিয়মে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়। নতুন ব্যবস্থায় সাধারণভাবে এই ভিসার জন্য বেতনসীমা বাড়িয়ে বছরে ৪১ হাজার ৭০০ পাউন্ড করা হয় এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রে স্নাতক পর্যায়ের দক্ষতাসম্পন্ন পেশাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। এর ফলে দোকানের সাধারণ কর্মী, খুচরা বিক্রয়কর্মী, ট্যাক্সিচালকসহ বহু পদ নতুন করে স্পনসর করার সুযোগ থেকে বাদ পড়ে।
তবু পুরোনো স্পনসর লাইসেন্সধারী অনেক প্রতিষ্ঠান সরকারি তালিকায় রয়ে গেছে। এর একটি কারণ হলো, স্পনসর লাইসেন্স এবং নির্দিষ্ট একটি পদে বিদেশি কর্মী স্পনসর করার যোগ্যতা—দুটি আলাদা বিষয়।
কোনো ব্যবসার স্পনসর লাইসেন্স থাকলে প্রতিষ্ঠানটি অভিবাসন স্পনসর ব্যবস্থায় অংশ নেওয়ার অনুমতি পায়। কিন্তু সেই লাইসেন্স থাকার অর্থ এই নয় যে প্রতিষ্ঠানটি ইচ্ছামতো যেকোনো পদে বিদেশি কর্মী নিয়োগ করতে পারবে। প্রস্তাবিত চাকরিটি বর্তমান অভিবাসন বিধিতে যোগ্য হতে হবে, সঠিক পেশাগত শ্রেণির সঙ্গে মিলতে হবে এবং নির্ধারিত বেতন ও দক্ষতার শর্ত পূরণ করতে হবে।
এখানেই মূল বিতর্ক। সমালোচকদের অভিযোগ, কিছু ব্যবসা তাদের প্রকৃত কাজের ধরন পরিবর্তন করে বা চাকরির পদকে এমনভাবে উপস্থাপন করতে পারে, যাতে তা যোগ্য পেশার আওতায় পড়ে। যদিও কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান এমন অনিয়ম করেছে—এমন অভিযোগ প্রমাণিত না হলে তাকে অনিয়মকারী হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না।
যুক্তরাজ্যের রক্ষণশীল দলের এমপি ক্রিস ফিলপ বিষয়টি নিয়ে সরব হয়েছেন। তিনি লন্ডনের হোয়াইটচ্যাপেল এলাকায় কয়েকটি ছোট ব্যবসার উদাহরণ তুলে ধরে দাবি করেছেন, দক্ষ কর্মী ভিসার ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি করেছে। তার মতে, এই ব্যবস্থা সংস্কার করে কেবল সত্যিকারের উচ্চ দক্ষতার কর্মীদের জন্য বিদেশ থেকে নিয়োগের সুযোগ রাখা উচিত।
আরেক এমপি কেটি ল্যামও অভিবাসন ব্যবস্থায় এই ধরনের ব্যবহারের সমালোচনা করেছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, দক্ষ কর্মী ভিসা বিশেষায়িত দক্ষতা থাকা এবং দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম ব্যক্তিদের জন্য তৈরি হয়েছিল; সাধারণ শ্রমবাজারের পদ পূরণের জন্য নয়। স্থানীয় কর্মী পাওয়া কঠিন হলে ব্যবসাগুলোর বেতন বাড়ানো, প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং ব্রিটিশ কর্মীদের দক্ষ করে তোলার দিকে নজর দেওয়া উচিত বলেও তিনি মত দিয়েছেন।
তবে অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যায় বিষয়টি আরও জটিল। বৈধভাবে পরিচালিত প্রায় যেকোনো ধরনের ব্যবসা নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করলে স্পনসর লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে পারে। মূল বিষয় হলো, প্রতিষ্ঠানটি যে পদে কর্মী স্পনসর করতে চাইছে, সেটি সংশ্লিষ্ট সময়ে অভিবাসন বিধির আওতায় যোগ্য কি না।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্বরাষ্ট্র দপ্তরও স্পনসর লাইসেন্সের ওপর নজরদারি বাড়িয়েছে। ২০২৩ সালে যেখানে ৩৪৭টি স্পনসর লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছিল, ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে ৩ হাজার ২৯৯-এ পৌঁছায়। একই সময়ে দক্ষ কর্মী ভিসার আওতাভুক্ত পেশার তালিকা সংকুচিত করা এবং বেতনসীমা বাড়ানোর মতো পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে।
কাবাবের দোকান নিয়েও আলাদা করে নজর পড়েছে। তথ্য অনুযায়ী, ১৫৯টি কাবাবের দোকান বিদেশি কর্মী স্পনসর করার লাইসেন্স পেয়েছে। তবে এসব প্রতিষ্ঠানের কোনো কোনোটি নির্দিষ্ট পেশার জন্য বৈধভাবে কর্মী নিয়োগ করতে পারে। ফলে শুধু কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম স্পনসর তালিকায় থাকা থেকেই অবৈধ অভিবাসন বা ভিসা জালিয়াতির সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়।
এই বিতর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সরকারি কল্যাণব্যবস্থা। ডেইলি মেইলের প্রতিবেদনে অভিবাসন, বিদেশি কর্মী নিয়োগ এবং যুক্তরাজ্যের কল্যাণভাতা ব্যবস্থার মধ্যে সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। সমালোচকদের একাংশের দাবি, বিদেশি কর্মী নিয়োগের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় সহায়তা ও কল্যাণব্যবস্থার ওপর সম্ভাব্য চাপের বিষয়টিও নীতিনির্ধারকদের বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
তবে কোনো নির্দিষ্ট বিদেশি কর্মী বা অভিবাসী স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরকারি ভাতা পাওয়ার অধিকারী—এমন ধারণা সঠিক নয়। ভাতা পাওয়ার যোগ্যতা ব্যক্তির অভিবাসন মর্যাদা, বসবাসের অধিকার, আয় ও সংশ্লিষ্ট সুবিধার নিয়মের ওপর নির্ভর করে। তাই দক্ষ কর্মী ভিসা এবং কল্যাণভাতা ব্যবস্থাকে সরাসরি একই বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
এদিকে কঠোর নিয়মের পর দক্ষ কর্মী ভিসার সংখ্যা কমেছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত ১২ মাসে এই ভিসায় অনুমোদনের সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ কমেছে। বিশেষ করে আতিথেয়তা ও খাদ্য প্রস্তুতিসংক্রান্ত অনেক পেশা নতুন নিয়মে আর আগের মতো স্পনসরযোগ্য নয়।
সরকারের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো—একদিকে প্রকৃত দক্ষতার ঘাটতি পূরণে বিদেশি কর্মী নিয়োগের সুযোগ রাখা, অন্যদিকে অভিবাসন ব্যবস্থার অপব্যবহার ঠেকানো। একই সঙ্গে বৈধ ব্যবসাগুলো যাতে অযথা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো প্রতিষ্ঠান স্পনসর লাইসেন্স ধরে রেখেছে কি না—তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে কোন পদে কর্মী নিয়োগ করছে, সেই পদটি সত্যিকার অর্থে যোগ্য কি না, কর্মীর দায়িত্ব ও চাকরির নামের মধ্যে সামঞ্জস্য আছে কি না এবং নির্ধারিত বেতন ও অন্যান্য শর্ত পূরণ হচ্ছে কি না।
ফলে গাড়ি ধোয়ার প্রতিষ্ঠান, কাবাবের দোকান, ভ্যাপের দোকান বা মিনি-মার্টের স্পনসর লাইসেন্স থাকা নিজেই অবৈধতার প্রমাণ নয়। তবে এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিদেশি কর্মী নিয়োগের পরিমাণ এবং ব্যবস্থাটির ব্যবহার নিয়ে যে রাজনৈতিক ও জনমতভিত্তিক প্রশ্ন উঠেছে, তা এখন যুক্তরাজ্যের অভিবাসন নীতির অন্যতম আলোচিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র দপ্তরের জন্য মূল পরীক্ষা হবে—কাগজে-কলমে নিয়ম কঠোর করার পাশাপাশি বাস্তবে কোনো ব্যবসা সেই নিয়ম মেনে চলছে কি না তা নিশ্চিত করা। কারণ দক্ষ কর্মী ভিসা ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা অনেকাংশেই নির্ভর করছে, প্রকৃত দক্ষতার চাকরির জন্য বিদেশি কর্মী আনা হচ্ছে, নাকি অন্য কোনো উদ্দেশ্যে ব্যবস্থাটিকে ব্যবহার করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে—তার ওপর।
সূত্রঃ ডেইলি মেইল
এম.কে

