পবিত্র কোরআনকে কেবল মুসলিমদের জন্য নির্ধারিত ধর্মগ্রন্থ হিসেবে না দেখে সমগ্র মানবজাতির জন্য পথনির্দেশনার উৎস হিসেবে বিবেচনা করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন ভারতীয় গবেষক ড. রজত মালহোত্রা। তার এই দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে ইসলামের সর্বজনীন শিক্ষা, মানবতার প্রতি সহমর্মিতা এবং বিভিন্ন ধর্মের মানুষের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের বিষয়গুলো উঠে এসেছে।
ড. রজত মালহোত্রা সেন্টার ফর পিস অ্যান্ড স্পিরিচুয়ালিটি ইন্টারন্যাশনালের (সিপিএস ইন্টারন্যাশনাল) সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত। প্রতিষ্ঠানটির প্রকাশিত পরিচিতি অনুযায়ী, তিনি এর শিক্ষা কার্যক্রমের বৈশ্বিক সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ইসলাম, আধুনিকতা, শান্তি এবং আন্তধর্মীয় সংলাপ নিয়ে তার একাডেমিক আগ্রহ রয়েছে। বিভিন্ন ধর্মের মানুষের মধ্যে সংলাপ ও শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগেও তিনি অংশ নিয়েছেন।
ড. মালহোত্রা ইসলামের ইতিহাস নিয়েও গবেষণা করেছেন। সিপিএস ইন্টারন্যাশনালে প্রকাশিত তার সাক্ষাৎকারের পরিচিতিতে বলা হয়েছে, ইসলামের আবির্ভাবের পর আরব সমাজের পরিবর্তন এবং মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন নিয়ে তিনি ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেছেন। প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উদ্যোগে তার কাজের ক্ষেত্রের মধ্যে আন্তধর্মীয় সংলাপ ও শান্তি প্রতিষ্ঠা রয়েছে।
২০০১ সালের জানুয়ারিতে প্রয়াত ইসলামি চিন্তাবিদ মাওলানা ওয়াহিদুদ্দিন খান সিপিএস ইন্টারন্যাশনাল প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠানটি একটি অলাভজনক, অরাজনৈতিক ও বেসরকারি সংস্থা। তাদের ঘোষিত লক্ষ্য হলো শান্তি, আধ্যাত্মিকতা এবং পারস্পরিক সহাবস্থানের ভিত্তিতে ইসলামের শিক্ষা বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরা।
মাওলানা ওয়াহিদুদ্দিন খান (১৯২৫–২০২১) কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইসলামের শিক্ষা সমসাময়িক ভাষা ও প্রেক্ষাপটে উপস্থাপনের ওপর গুরুত্ব দিতেন। তার প্রতিষ্ঠিত সংস্থাটি ব্যক্তিগত পর্যায়ে ইতিবাচক চিন্তা, আধ্যাত্মিক উন্নয়ন এবং সমাজে শান্তিপূর্ণ আচরণ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেয়।
কোরআনের শিক্ষা বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে সিপিএস ইন্টারন্যাশনাল অনুবাদ, প্রকাশনা ও বিতরণ কার্যক্রম পরিচালনা করে। প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, তাদের কোরআন অনুবাদ প্রকল্পের আওতায় ৪০টিরও বেশি আন্তর্জাতিক ও ভারতীয় ভাষায় কোরআনের অনুবাদ পাওয়া যায়। একই সঙ্গে তাফসির, ইসলামবিষয়ক বই এবং অন্যান্য শিক্ষামূলক উপকরণও বিভিন্ন ভাষায় প্রকাশ করা হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তাদের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী ৭০ লাখের বেশি কোরআনের কপি এবং ১ কোটি ১০ লাখের বেশি ইসলামবিষয়ক উপকরণ বিতরণ করা হয়েছে। বিভিন্ন বইমেলা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গ্রন্থাগার, পর্যটনকেন্দ্র এবং আন্তধর্মীয় আয়োজনের মাধ্যমে এসব উপকরণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয় বলে সংস্থাটি জানিয়েছে।
ভারতীয় গবেষক ড. রজত মালহোত্রা বলেন, কোরআনের সর্বজনীন বার্তার সঙ্গে সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ আয়াত রয়েছে সূরা আল-আম্বিয়ার ১০৭ নম্বর আয়াতে। সেখানে বলা হয়েছে, ‘আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবেই পাঠিয়েছি।’
এই আয়াতের মূল বক্তব্যে মহানবী (সা.)-এর প্রেরণকে রহমতের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। ইসলামের শিক্ষা ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে আয়াতটি মানবতার প্রতি দয়া, কল্যাণকামিতা ও সহমর্মিতার প্রসঙ্গে আলোচিত হয়। কোরআনের বার্তাকে বৃহত্তর মানবসমাজের কাছে তুলে ধরার যে উদ্যোগ সিপিএস ইন্টারন্যাশনাল গ্রহণ করেছে, তার সঙ্গে এই ধারণার সামঞ্জস্য রয়েছে বলে জানান ড. রজত মালহোত্রা।
আন্তধর্মীয় সংলাপের ক্ষেত্রেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বোঝাপড়া গুরুত্বপূর্ণ। ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে আলোচনা, ধর্মীয় শিক্ষা সম্পর্কে জানার সুযোগ তৈরি এবং ভুল ধারণা দূর করার উদ্যোগ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে আস্থা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। সিপিএস ইন্টারন্যাশনাল তাদের কার্যক্রমে এ ধরনের সংলাপ ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানকে গুরুত্ব দেয়।
ড. রজত মালহোত্রার বক্তব্যের মূল প্রতিপাদ্য হলো, কোরআনের শিক্ষা ও বার্তা বৃহত্তর মানবসমাজের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। ধর্মীয় পরিচয়ের গণ্ডি পেরিয়ে মানবকল্যাণ, শান্তি ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার বিষয়গুলো আলোচনায় আনা আন্তধর্মীয় সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্রঃ সেন্টার ফর পিস অ্যান্ড স্পিরিচুয়ালিটি ইন্টারন্যাশনাল
এমকে

