TV3 BANGLA
আন্তর্জাতিক

গাজা হত্যাযজ্ঞের অভিযোগে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে নিজ দেশের নির্মাতাদেরই তথ্যচিত্র

ইসরায়েলের গাজা অভিযানে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি এবং লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের অভিযোগ নিয়ে নির্মিত ইসরায়েলি তথ্যচিত্র ‘নাজা’ ঘিরে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শনের পর তথ্যচিত্রটি প্রায় ২৫ মিনিটের দাঁড়িয়ে করতালি পায় এবং বিশেষ জুরি পুরস্কারও অর্জন করে। তবে তথ্যচিত্রে উঠে আসা অভিযোগগুলোকে ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা’ ও ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেছে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী বা আইডিএফ।

ইসরায়েলি নির্মাতা ইউভাল আব্রাহাম ও র‍্যাচেল সোর পরিচালিত ‘নাজা’ তথ্যচিত্রে ইসরায়েলি সামরিক ও গোয়েন্দা সংস্থার ২৪ জন সাবেক বা বর্তমান সদস্যের বেনামি সাক্ষাৎকার ব্যবহার করা হয়েছে। সাক্ষাৎকারদাতারা গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের লক্ষ্য নির্ধারণ, বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়ে বিভিন্ন দাবি করেছেন। তাদের পরিচয় গোপন রাখা হয়েছে।

তথ্যচিত্রটির অন্যতম অভিযোগ হলো, গাজায় সম্ভাব্য হামলার লক্ষ্য শনাক্ত করতে ‘ল্যাভেন্ডার’ নামে একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-সহায়িত ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়েছিল। চলচ্চিত্রে সাক্ষাৎকার দেওয়া ব্যক্তিদের দাবি অনুযায়ী, গাজার যোগাযোগব্যবস্থা থেকে সংগৃহীত বিপুল তথ্য বিশ্লেষণ করে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের শনাক্ত করা হতো এবং তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোও হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারত।

তথ্যচিত্রে আরও দাবি করা হয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে লক্ষ্যবস্তু হিসেবে চিহ্নিত ব্যক্তিদের বাড়িতে বেসামরিক মানুষ থাকার বিষয়টি জানা থাকা সত্ত্বেও হামলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো। সাক্ষাৎকারদাতাদের বর্ণনায় সামরিক লক্ষ্য নির্ধারণের এই প্রক্রিয়াকে এমন একটি ব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে, যেখানে দূর থেকে প্রযুক্তিনির্ভর সিদ্ধান্তের মাধ্যমে হামলা পরিচালিত হয়।

তথ্যচিত্রে সবচেয়ে আলোচিত দাবিগুলোর একটি হলো—একজন হামাস সদস্যকে লক্ষ্য করে পরিচালিত একটি হামলায় সম্ভাব্য ৫০০ জন মানুষের মৃত্যুর অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল বলে এক সাক্ষাৎকারদাতা দাবি করেন। তবে এই নির্দিষ্ট অভিযোগকে আইডিএফ সরাসরি ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। আইডিএফ জানিয়েছে, এমন কোনো হামলার পরিকল্পনা, অনুমোদন বা বাস্তবায়ন করা হয়নি।

আইডিএফের বক্তব্য, তথ্যচিত্রটি এমন বেনামি ব্যক্তিদের বক্তব্যের ওপর নির্ভর করেছে, যাদের পরিচয় যাচাই করা সম্ভব নয়। তারা আদৌ আইডিএফে দায়িত্ব পালন করেছেন কি না, করলে কী পদে ছিলেন এবং যেসব বিষয়ে বক্তব্য দিয়েছেন সেগুলোর সঙ্গে তাদের প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্টতা ছিল কি না—এসব বিষয়ও নিশ্চিত করা যায়নি বলে দাবি করেছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী।

ইসরায়েলি বাহিনী আরও বলেছে, হামলার লক্ষ্য নির্বাচন এবং হামলার অনুমোদনের সিদ্ধান্ত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নেয় না। এসব সিদ্ধান্ত মানব কর্মকর্তারাই আইডিএফের নির্দেশনা ও সামরিক নিয়ম অনুসারে নিয়ে থাকেন। আইডিএফের দাবি, তারা আন্তর্জাতিক আইন ও সশস্ত্র সংঘাতের আইন মেনে অভিযান পরিচালনা করে এবং বেসামরিক মানুষের ক্ষয়ক্ষতি কমানোর জন্য ব্যবস্থা নেয়।

অন্যদিকে তথ্যচিত্রটির নির্মাতাদের বক্তব্য ও সাক্ষাৎকারদাতাদের বর্ণনায় গাজায় সামরিক প্রযুক্তি ও লক্ষ্য নির্ধারণ ব্যবস্থার মাধ্যমে ব্যাপক বেসামরিক প্রাণহানির একটি ভিন্ন চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তথ্যচিত্রে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা এমন একটি ব্যবস্থার বর্ণনা দিয়েছেন যেখানে বেসামরিক প্রাণহানি সামরিক লক্ষ্য নির্ধারণের প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বিবেচিত হতো বলে তারা দাবি করেন।

ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে তথ্যচিত্রটির প্রদর্শনীর পর দর্শকদের দীর্ঘস্থায়ী করতালি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিষয়টিকে আরও আলোচনায় নিয়ে আসে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে এটিকে উৎসবটির অন্যতম আলোচিত প্রদর্শনী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তথ্যচিত্রটি পরে বিশেষ জুরি পুরস্কারও লাভ করে।

তথ্যচিত্রটির বিরুদ্ধে ইসরায়েলি রাজনৈতিক মহলেও তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ইসরায়েলের সংস্কৃতিমন্ত্রী মিকি জোহার পরিচালক ইউভাল আব্রাহাম ও র‍্যাচেল সোরের বিরুদ্ধে ‘রাষ্ট্রদ্রোহের’ অভিযোগ তুলেছেন এবং তাদের ইসরায়েলি নাগরিকত্ব বাতিলের জন্য পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।

মিকি জোহার অভিযোগ করেছেন, দুই নির্মাতা আন্তর্জাতিক প্রশংসা পাওয়ার জন্য নিজেদের দেশের ক্ষতি করছেন। তিনি তাদের কর্মকাণ্ডকে রাষ্ট্রের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে উল্লেখ করে নাগরিকত্ব বাতিলের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান।

তবে নাগরিকত্ব বাতিলের বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হয়নি। এ বিষয়ে আইনগত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলে আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। হারেৎজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জোহার সংশ্লিষ্ট আইন ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের বিষয়টি পরীক্ষা করার অনুরোধ করেছেন।

এদিকে ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটও তথ্যচিত্রটির সমালোচনা করেছেন। তিনি এটিকে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ‘রক্তের অপবাদ’ হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেছেন, অভিযোগগুলো ইসরায়েলি নির্মাতাদের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ায় বিষয়টি আরও বেদনাদায়ক। একই সঙ্গে তিনি গাজায় বেসামরিক মানুষের মৃত্যু যে মর্মান্তিক, সেটিও উল্লেখ করেছেন।

অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে তথ্যচিত্রটির গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে মূলত এর অভ্যন্তরীণ সূত্র ও ইসরায়েলি সামরিক ও গোয়েন্দা ব্যবস্থার সঙ্গে পরিচিত ব্যক্তিদের বক্তব্যের কারণে। দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তথ্যচিত্রটি গাজা অভিযানে লক্ষ্য নির্ধারণ এবং বেসামরিক মানুষের ওপর এর প্রভাব নিয়ে ইসরায়েলি সামরিক ব্যবস্থার অভ্যন্তরীণ চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করেছে।

ফলে ‘নাজা’কে ঘিরে একদিকে গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের পদ্ধতি ও বেসামরিক প্রাণহানি নিয়ে গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে, অন্যদিকে আইডিএফ এসব অভিযোগের সত্যতা ও তথ্যচিত্রটির সূত্র নিয়ে সরাসরি আপত্তি জানিয়েছে। ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কার ও ব্যাপক দর্শক প্রতিক্রিয়ার পর বিষয়টি এখন ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

সূত্রঃ টাইমস অব ইসরায়েল \ এপি

এম.কে

আরো পড়ুন

ইরান যুদ্ধ ও হরমুজ সংকটে যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি দুই বছরের মধ্যে সর্বোচ্চে

ইসরায়েলে অবস্থানরত নাগরিকদের সরানোর সুযোগ নেইঃ মার্কিন দূতাবাস

শুল্ক থেকে মুক্তি চাইলে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য তৈরি করুনঃ ট্রাম্প