22.5 C
London
June 22, 2026
TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

চার গুণ বেশি রোগ শনাক্তের পরও NHS-এ চালু নাও হতে পার ক্যান্সার রক্তপরীক্ষা

ক্যান্সার শনাক্তকরণে যুগান্তকারী সম্ভাবনা তৈরি করা ‘গ্যালেরি’ (Galleri) নামের নতুন রক্তপরীক্ষা যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা সংস্থা (এনএইচএস) ব্যাপকভাবে চালু নাও করতে পারে। যদিও সাম্প্রতিক এক বৃহৎ গবেষণায় দেখা গেছে, পরীক্ষাটি প্রচলিত স্ক্রিনিং ব্যবস্থার তুলনায় প্রায় চার গুণ বেশি ক্যান্সার শনাক্ত করতে সক্ষম।

দীর্ঘদিন ধরে ক্যান্সার নির্ণয়ের ক্ষেত্রে ‘হোলি গ্রেইল’ বা স্বপ্নের প্রযুক্তি হিসেবে বিবেচিত এই পরীক্ষাটি রক্তে ভাসমান টিউমার ডিএনএর ক্ষুদ্র অংশ বিশ্লেষণ করে একসঙ্গে বহু ধরনের ক্যান্সারের উপস্থিতি শনাক্ত করতে পারে। গবেষণায় এটি প্রাথমিক পর্যায়ের ক্যান্সার শনাক্তকরণ ১৬ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে সক্ষম হয়েছে এবং বিশেষ করে ডিম্বাশয়, অন্ত্র ও প্রোস্টেট ক্যান্সারের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা দেখিয়েছে।

তবে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, পরীক্ষাটি ক্যান্সারকে পর্যাপ্ত প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করতে পারছে না। ফলে জাতীয় পর্যায়ে স্ক্রিনিং কর্মসূচি হিসেবে এটি চালু করার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। যদিও এনএইচএস জানিয়েছে, এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি এবং গবেষণার পূর্ণাঙ্গ তথ্য পর্যালোচনা করা হবে।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কোম্পানি গ্যালেরি-এর তৈরি এই পরীক্ষার ফলাফল বিশ্বের বৃহত্তম ক্যান্সার সম্মেলন, আমেরিকান সোসাইটি অব ক্লিনিক্যাল অনকোলজির (ASCO) বার্ষিক সভায় উপস্থাপন করা হয়। প্রায় ১৫০ মিলিয়ন পাউন্ড ব্যয়ে পরিচালিত এই গবেষণায় অংশ নেন ৫০ থেকে ৭৭ বছর বয়সী ১ লাখ ৪২ হাজার ২৫০ জন মানুষ।

গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের অর্ধেককে তিন বছর ধরে প্রতিবছর গ্যালেরি রক্তপরীক্ষা করানো হয় এবং বাকি অর্ধেককে এনএইচএসের প্রচলিত স্ক্রিনিং ব্যবস্থার আওতায় রাখা হয়। বর্তমানে এনএইচএস অন্ত্র, স্তন, জরায়ুমুখ ও ফুসফুসের ক্যান্সারের জন্য স্ক্রিনিং কর্মসূচি পরিচালনা করে।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, প্রচলিত স্ক্রিনিং পাওয়া ৭১ হাজার মানুষের মধ্যে ২৯০টি ক্যান্সার শনাক্ত হয়, যা মোট শনাক্ত ক্যান্সারের প্রায় ৮ শতাংশ। অন্যদিকে Galleri পরীক্ষার আওতায় থাকা অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৯৩৭টি ক্যান্সার শনাক্ত হয়। পাশাপাশি এনএইচএস স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে আরও ২৩৬টি ক্যান্সার ধরা পড়ে। ফলে ক্যান্সার শনাক্তের হার বেড়ে ৩৩ শতাংশে পৌঁছে, যা প্রচলিত ব্যবস্থার তুলনায় প্রায় চার গুণ বেশি।

এছাড়া পরীক্ষাটি ব্যবহারকারীদের মধ্যে চতুর্থ পর্যায়ের (স্টেজ-৪) ক্যান্সার শনাক্তের সংখ্যা ১৪ শতাংশ কমিয়েছে। জরুরি বিভাগে গিয়ে ক্যান্সার ধরা পড়ার ঘটনাও ২৫ শতাংশ কমেছে, যা সাধারণত রোগের অগ্রসর পর্যায়ের ইঙ্গিত বহন করে।

গবেষণার প্রধান তদন্তকারী অধ্যাপক চার্লস সোয়ানটন বলেন, গবেষণার প্রথম বছরে পরীক্ষাটির কার্যকারিতা প্রত্যাশিত মাত্রায় না থাকায় সামগ্রিক ফলাফলে প্রভাব পড়েছে। তবে পরবর্তী দুই বছরে ফলাফলে উন্নতি দেখা গেছে।

অন্যদিকে গ্যালেরি-এর প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা স্যার হারপাল কুমার দাবি করেন, এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে ক্যান্সার রোগীদের বেঁচে থাকার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে পারে। তার মতে, বিশেষ করে লিভার, ডিম্বাশয় ও অগ্ন্যাশয়ের মতো ক্যান্সার, যেগুলো সাধারণত অনেক দেরিতে ধরা পড়ে, সেগুলোর ক্ষেত্রে এই পরীক্ষার সম্ভাবনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তবে গবেষণার ফলাফল নিয়ে সব বিশেষজ্ঞ একমত নন। লন্ডনের ইনস্টিটিউট অব ক্যান্সার রিসার্চের জেনেটিক্স ও এপিডেমিওলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক রিচার্ড হাউলস্টন বলেন, গবেষকরা ফলাফলকে বাস্তবতার তুলনায় অনেক বেশি ইতিবাচকভাবে তুলে ধরেছেন। তার মতে, এখনো এমন কোনো সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি যে এই পরীক্ষা রোগীদের মৃত্যুহার কমাতে বা দীর্ঘমেয়াদে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বাড়াতে সক্ষম।

অন্যদিকে গবেষণার আরেক তদন্তকারী অধ্যাপক পিটার সাসিয়েনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, আগামী এক বছরের মধ্যে আরও তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে পরীক্ষাটির প্রকৃত কার্যকারিতা আরও পরিষ্কারভাবে বোঝা যাবে।

এনএইচএস ইংল্যান্ডের জাতীয় ক্যান্সার ক্লিনিক্যাল পরিচালক অধ্যাপক পিটার জনসন বলেন, এই বিশ্ব-প্রথম গবেষণা ক্যান্সার শনাক্তকরণে রক্তপরীক্ষার সম্ভাবনা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে। তিনি জানান, ক্যান্সারকে আরও আগেই শনাক্ত করা জাতীয় ক্যান্সার পরিকল্পনার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য এবং এ বিষয়ে সম্ভাব্য সব প্রযুক্তি বিবেচনায় রাখা হবে।

যুক্তরাজ্যে ক্যান্সার রোগীদের বেঁচে থাকার হার উন্নত করার লক্ষ্যে নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে আলোচনা চললেও গ্যালেরি পরীক্ষার ভবিষ্যৎ এখন নির্ভর করছে এনএইচএসের চূড়ান্ত মূল্যায়নের ওপর। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্যান্সার শনাক্তের হার বাড়ানোর পাশাপাশি রোগীর দীর্ঘমেয়াদি জীবনরক্ষায় এর কার্যকারিতা প্রমাণ করতে পারলেই কেবল এই প্রযুক্তি জাতীয় পর্যায়ে চালুর পথ সুগম হবে।

সূত্রঃ দ্য টেলিগ্রাফ

এম.কে

আরো পড়ুন

যুক্তরাজ্যে প্রায় ৫০ বছর কাটিয়ে অবসরপ্রাপ্ত ব্যবসায়ী জানলেন তিনি ব্রিটিশ নন

যুক্তরাজ্যে ইংল্যান্ডের নতুন স্কুল পাঠ্যক্রমে অডিওবুক যুক্ত করার আহ্বান

২০ হাজার আফগান শরণার্থীকে আশ্রয় দেবে যুক্তরাজ্য

অনলাইন ডেস্ক