দুই দিনের গুরুত্বপূর্ণ বেইজিং সফর শেষে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্যকে ঘিরে তাইওয়ান প্রণালীতে নতুন করে কূটনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ট্রাম্প একদিকে যেমন তাইওয়ানের আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা ঘোষণার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন, অন্যদিকে দ্বীপটির জন্য ১১ বিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য অস্ত্র প্যাকেজ অনুমোদনের ইঙ্গিত দিয়ে চীনের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তুলেছেন।
এই প্রেক্ষাপটে তাইওয়ান স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে—তারা ইতোমধ্যেই একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র, ফলে নতুন করে স্বাধীনতা ঘোষণার কোনো প্রয়োজন নেই।
বেইজিংয়ে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকের পর ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, তাইওয়ান ইস্যুতে তিনি “কোনো পক্ষেই কোনো প্রতিশ্রুতি দেননি”। তবে তিনি এটাও স্পষ্ট করেন যে, তিনি চীনের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত চান না।
ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন,
“আমি কাউকে স্বাধীন হতে উৎসাহিত করছি না। ৯,৫০০ মাইল দূরে গিয়ে যুদ্ধ করতে চাই না। আমি চাই পরিস্থিতি শান্ত থাকুক।”
তার এই বক্তব্যকে তাইওয়ানের স্বাধীনতার পক্ষে আন্দোলনের প্রতি এক ধরনের সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে যখন বেইজিং বহু বছর ধরে তাইওয়ানকে নিজেদের অবিচ্ছেদ্য অংশ দাবি করে আসছে এবং প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগের হুমকিও দিয়ে যাচ্ছে।
চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ট্রাম্পকে জানিয়েছেন, তিনি তাইওয়ানের স্বাধীনতার কোনো আন্দোলন দেখতে চান না। ট্রাম্পও বলেন, শি এই ইস্যুতে “অত্যন্ত দৃঢ় অবস্থানে” রয়েছেন।
তবে ট্রাম্পের বক্তব্যের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট কার্যালয় পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানায়।
প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তের মুখপাত্র কারেন কুও বলেন, “ এটি স্বতঃসিদ্ধ যে তাইওয়ান একটি সার্বভৌম, স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক দেশ। ”
তিনি আরও বলেন, তাইওয়ান বর্তমানে ‘স্থিতাবস্থা’ বজায় রাখতে চায়। অর্থাৎ, তারা আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা ঘোষণা করবে না, আবার চীনের সঙ্গেও একীভূত হবে না।
তাইওয়ানের বর্তমান প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তে বরাবরই বলে আসছেন, তাইওয়ান বাস্তবিক অর্থেই স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে। ফলে নতুন কোনো ঘোষণার প্রয়োজন নেই। তবে এই অবস্থানকে চীন বিচ্ছিন্নতাবাদী মনোভাব হিসেবে দেখে থাকে।
বেইজিং ইতোমধ্যে লাই চিং-তেকে “ঝামেলা সৃষ্টিকারী” এবং “দুই তীরের শান্তির ধ্বংসকারী” হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন তাইওয়ানের চারপাশে ব্যাপক সামরিক মহড়া চালিয়ে অঞ্চলজুড়ে উত্তেজনা বাড়িয়েছে।
এদিকে ট্রাম্প প্রশাসন তাইওয়ানের জন্য ১১ বিলিয়ন ডলারের একটি অস্ত্র বিক্রয় প্যাকেজ বিবেচনা করছে বলে জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী, ওয়াশিংটনের দায়িত্ব তাইওয়ানকে আত্মরক্ষার সক্ষমতা নিশ্চিত করা। যদিও আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকলেও দুই পক্ষের মধ্যে ঘনিষ্ঠ অনানুষ্ঠানিক সম্পর্ক বিদ্যমান।
ট্রাম্প বলেন, অস্ত্র চুক্তি নিয়ে তিনি তাইওয়ানের নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনা করবেন। তবে সরাসরি প্রেসিডেন্টের নাম উল্লেখ না করে তিনি বলেন,
“আমাকে সেই ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলতে হবে, যিনি এখন তাইওয়ান পরিচালনা করছেন।”
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই মন্তব্য ও অস্ত্র সহায়তার সম্ভাবনা যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের ভারসাম্যকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। কারণ, ওয়াশিংটন দীর্ঘদিন ধরে “এক চীন নীতি” মেনে চললেও একই সঙ্গে তাইওয়ানের নিরাপত্তা রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা, তাইওয়ানকে ঘিরে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের এই কূটনৈতিক টানাপোড়েন আগামী মাসগুলোতে আরও তীব্র হতে পারে। বিশেষ করে দক্ষিণ চীন সাগর ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে সামরিক ও ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা যেভাবে বাড়ছে, তাতে তাইওয়ান প্রশ্নটি আবারও বৈশ্বিক রাজনীতির কেন্দ্রে উঠে এসেছে।
সূত্রঃ বিবিসি
এম.কে

