জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের মূল ভূখণ্ডে পরাগের মৌসুম উল্লেখযোগ্যভাবে দীর্ঘ হয়ে উঠছে, যার ফলে কোটি কোটি মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। সাম্প্রতিক এক আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৯০-এর দশকের তুলনায় বর্তমানে পরাগ মৌসুম এক থেকে দুই সপ্তাহ পর্যন্ত দীর্ঘ হয়েছে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি, তাপপ্রবাহ এবং খরার পাশাপাশি পরাগ উৎপাদনও বেড়েছে, যা অ্যালার্জিজনিত রোগীদের জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি হয়তো বন্যা বা দাবানলের মতো দৃশ্যমান বিপর্যয় নয়, তবে দীর্ঘমেয়াদে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে এর প্রভাব ব্যাপক।
গবেষণার সহ-পরিচালক ও পরিবেশগত মহামারীবিদ ইয়োআকিম রকলভ বলেন, এই পরিবর্তনগুলো ধীরে ধীরে হলেও মানুষের কষ্ট বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। তার মতে, এটি এমন একটি সূচক যা দেখায়—জলবায়ু পরিবর্তন মানুষের জীবনে প্রতিনিয়ত নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
উষ্ণ আবহাওয়া এবং বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের উচ্চমাত্রা উদ্ভিদকে বেশি পরিমাণে পরাগ উৎপাদনে সহায়তা করছে। এর ফলে খড়জ্বর ও অন্যান্য অ্যালার্জিতে আক্রান্ত মানুষের মধ্যে উপসর্গ বাড়ছে, যা কখনও কখনও গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে।
গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে, বার্চ, অ্যাল্ডার এবং অলিভ গাছের পরাগ মৌসুম এখন আগের তুলনায় এক থেকে দুই সপ্তাহ আগে শুরু হচ্ছে। একই সঙ্গে এসব গাছের পরাগের তীব্রতাও ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে, বিশেষ করে যুক্তরাজ্যের দক্ষিণাঞ্চল, উত্তর ফ্রান্স, জার্মানি এবং পূর্ব ইউরোপে।
বিশেষজ্ঞরা আরও সতর্ক করেছেন আগ্রাসী উদ্ভিদ প্রজাতি র্যাগউইড নিয়ে। এই উদ্ভিদের বিস্তার ইউরোপজুড়ে বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে এটি একটি বড় স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে।
অন্য এক গবেষক ক্যাথারিনা বাস্তল বলেন, পরাগজনিত অ্যালার্জি এখন জলবায়ু পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। যদিও এর প্রভাব অঞ্চলভেদে ভিন্ন, তবুও বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ইতোমধ্যে পরাগায়ন প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করেছে।
৪৬টি একাডেমিক ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের ৬৫ জন গবেষকের সমন্বয়ে তৈরি এই প্রতিবেদনে জলবায়ু পরিবর্তন ও জনস্বাস্থ্যের ৪৩টি সূচক বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, তাপজনিত মৃত্যুর হার প্রতি দশ লাখে গড়ে ৫২ জন বেড়েছে এবং চরম তাপমাত্রার সতর্কবার্তা চারগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
এছাড়া সংক্রামক রোগের বিস্তারও বাড়ছে, বিশেষ করে ডেঙ্গুর সংক্রমণের সম্ভাবনা গত কয়েক দশকে তিনগুণের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে ইউরোপের অধিকাংশ অঞ্চলে গ্রীষ্মকালীন তীব্র খরার সময়কালও বেড়েছে।
গবেষকরা বলছেন, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। শহরে সবুজায়ন বাড়ানো, জনস্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
তবে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনও লক্ষ্য করা গেছে।
পরিবহন খাতে দূষণজনিত মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতেও দূষণজনিত মৃত্যুর হার দ্রুত হ্রাস পেয়েছে।
সব মিলিয়ে, গবেষণাটি স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে যে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন আর দূরের কোনো হুমকি নয়; এটি ইতোমধ্যেই মানুষের স্বাস্থ্য, পরিবেশ এবং দৈনন্দিন জীবনে গভীর প্রভাব ফেলছে।
সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান
এম.কে

