মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরান সংঘাতের প্রভাবে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিতে নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে। সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মার্চ মাসে দেশটির বার্ষিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩.৩ শতাংশে, যা ফেব্রুয়ারিতে ছিল ৩ শতাংশ।
দেশটির জাতীয় পরিসংখ্যান দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মূলত জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, বিমান ভাড়া এবং খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণেই এই উর্ধ্বগতি দেখা গেছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে বৈশ্বিক তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় সরাসরি প্রভাব পড়েছে পরিবহন খাতে।
সংঘাত শুরুর পর থেকে পেট্রোল ও ডিজেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। মার্চ মাসে পেট্রোলের দাম প্রতি লিটারে গড়ে ৮.৬ পেন্স বেড়ে ১৪০.২ পেন্সে পৌঁছেছে, যা গত বছরের আগস্টের পর সর্বোচ্চ। একই সময়ে ডিজেলের দাম ১৭.৬ পেন্স বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫৮.৭ পেন্সে, যা গত বছরের নভেম্বরের পর সর্বোচ্চ।
এছাড়া পরিবহন খাতে সামগ্রিক মূল্যবৃদ্ধি বেড়ে ৪.৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা ফেব্রুয়ারিতে ছিল ২.৪ শতাংশ। একই সঙ্গে খাদ্য মূল্যস্ফীতিও ৩.৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩.৭ শতাংশ হয়েছে। চকলেট, মিষ্টিজাত পণ্য, মাংস, মাছ এবং কোমল পানীয়র দাম বৃদ্ধিই এ ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা রেখেছে।
অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করেছেন, পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বছরের শেষে ৯ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীতে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় সার উৎপাদনেও প্রভাব পড়তে পারে, যা ভবিষ্যতে খাদ্যদ্রব্যের দাম আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল সতর্ক করে জানিয়েছে, চলতি বছরে জি-সেভেন দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাজ্যের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি ধীর হতে পারে এবং একই সঙ্গে উচ্চ মূল্যস্ফীতির মুখে পড়তে পারে দেশটি।
বর্তমান মূল্যস্ফীতির হার সরকারের নির্ধারিত ২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক বেশি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইতোমধ্যে সুদের হার অপরিবর্তিত রাখলেও জানিয়েছে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এবং জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা অব্যাহত থাকলে ঋণের সুদ বাড়ানোর প্রয়োজন হতে পারে।
যুদ্ধের আগে ধারণা করা হয়েছিল, এপ্রিল মাসে মূল্যস্ফীতি কমে প্রায় ২ শতাংশে নেমে আসবে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সেই সম্ভাবনা অনেকটাই কমে গেছে এবং পুরো বছরজুড়েই মূল্যস্ফীতি তুলনামূলক উচ্চ অবস্থানে থাকতে পারে।
অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, এই যুদ্ধ দেশটির নয়, কিন্তু এর প্রভাব সরাসরি সাধারণ মানুষের ওপর পড়ছে। তাই পরিবার ও ব্যবসার ব্যয় কমাতে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে।
এদিকে, কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে পোশাক খাত, যেখানে মূল্যবৃদ্ধি তুলনামূলক কম হয়েছে। পাশাপাশি মূল মূল্যস্ফীতি সামান্য কমে ৩.১ শতাংশে নেমে এসেছে, যা পূর্বে ছিল ৩.২ শতাংশ।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা কমে এবং জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক হয়, তাহলে মূল্যস্ফীতি ৩.৫ থেকে ৪ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে। তবে পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে তা ৫ শতাংশ পর্যন্তও পৌঁছাতে পারে।
এছাড়া জুলাই মাসে জ্বালানির মূল্যসীমা পুনর্নির্ধারণের সময় গৃহস্থালির খরচ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, বৈশ্বিক সংঘাতের প্রভাব এখন স্পষ্টভাবে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিতে প্রতিফলিত হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও কঠিন করে তুলছে।
সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান
এম.কে

