কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতে নতুন নিয়ন্ত্রণ আরোপের বিরোধিতা করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থান এবং তার পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠ মিত্রদের এআই ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ব্যবসায়িক স্বার্থ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রশ্ন উঠেছে। দ্য গার্ডিয়ানের এক বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের নীতিগত অবস্থান এবং তার পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্বার্থ একই সময়ে একই দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
গত এক বছরে ট্রাম্পের দুই ছেলে ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র ও এরিক ট্রাম্প এআই-সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা খাতের বিভিন্ন উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। এসব উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে ৬২০ মিলিয়ন ডলারের পেন্টাগন ঋণ, মেরিন কর্পসের ২৪ মিলিয়ন ডলারের রোবোটিকস চুক্তি এবং মার্কিন বিমানবাহিনীর ৯০ মিলিয়ন ডলারের একটি ড্রোন চুক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা।
এদিকে ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের বন্ধু ও প্রযুক্তি উদ্যোক্তা মাইকেল ডেলের প্রতিষ্ঠান প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলারের একটি পেন্টাগন চুক্তি পেয়েছে। ডেল ট্রাম্পের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যও।
এআই নিয়ে ট্রাম্পের অবস্থানও সাম্প্রতিক সময়ে আরও স্পষ্ট হয়েছে। সোমবার ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, এআইয়ের প্রয়োজনীয় একমাত্র নিয়ন্ত্রণ বা ‘গার্ডরেল’ হলো একজন “শক্তিশালী ও বুদ্ধিমান প্রেসিডেন্ট”। একই পোস্টে তিনি এআই ও ডেটা সেন্টারবিরোধী অবস্থানের পেছনে একটি “অসুস্থ ষড়যন্ত্র” চলছে বলে দাবি করেন। এরপর সপ্তাহজুড়ে এআই শিল্পের পক্ষে একাধিক বক্তব্য দেন তিনি।
ট্রাম্প প্রশাসন নতুন এআই নিয়ন্ত্রণের বিরোধিতাকে মূলত যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতার সঙ্গে যুক্ত করেছে। ট্রাম্প এবং তার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা পরিষদের সহ-সভাপতি ডেভিড স্যাকসের বক্তব্য, অতিরিক্ত বিধিনিষেধ এআই উন্নয়নের গতি কমিয়ে দিতে পারে এবং এর ফলে চীনের সঙ্গে প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্র পিছিয়ে পড়তে পারে।
বুধবার পলিটিকোর এক সম্মেলনে ডেভিড স্যাকস অ্যানথ্রপিক ও ওপেনএআইয়ের সাম্প্রতিক সতর্কতাকে রাজনৈতিক প্রদর্শনী হিসেবে আখ্যা দেন। তার দাবি, প্রযুক্তির ঝুঁকি নিয়ে যেসব সতর্কতা দেওয়া হচ্ছে, তার কিছু অংশ অধিকারকর্মী সংগঠন ও সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে অতিরঞ্জিত করা হচ্ছে। তার মতে, বিদ্যমান আইনও অনেক ক্ষেত্রে এআই নিয়ন্ত্রণের জন্য যথেষ্ট।
তবে এআই নিয়ে উদ্বেগ শুধু বাইরের সমালোচকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। প্রযুক্তি খাতের ভেতর থেকেও সতর্কবার্তা এসেছে। সেপ্টেম্বরের শুরুতে ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিকে এআই মডেলের মৌলিক প্রশিক্ষণ নিয়ে কাজ করা গবেষক জ্যাকব কক্সন পদত্যাগ করেন। পরে তিনি সতর্ক করে বলেন, প্রতিষ্ঠানগুলো স্ব-উন্নয়নশীল সুপারইন্টেলিজেন্স তৈরির প্রতিযোগিতায় নেমেছে এবং এতে মানবজাতির জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
একই সপ্তাহে অ্যানথ্রপিকের এআই নিরাপত্তাবিষয়ক প্রধান ম্রিনাঙ্ক শর্মাও পদত্যাগ করেন। পদত্যাগের সময় তিনি বিশ্ব বিপদের মধ্যে রয়েছে বলে মন্তব্য করেন।
এআইয়ের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে আলোচনার মধ্যেই চলতি মাসে ক্যালিফোর্নিয়ার একটি সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান একটি এআই-নির্ভর কম্পিউটার ওয়ার্মের সক্ষমতার কথা প্রকাশ করে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে এমন একটি প্রযুক্তি তৈরি করা সম্ভব হয়েছে, যা একটি উত্তর না দেওয়া ফোনকলের মাধ্যমে উইচ্যাট অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করে আক্রান্ত ব্যক্তির যোগাযোগ তালিকার মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
প্রতিষ্ঠানটির হিসাব অনুযায়ী, এ ধরনের প্রযুক্তি কয়েক ঘণ্টার মধ্যে এক বিলিয়নের বেশি ডিভাইসকে ঝুঁকিতে ফেলতে সক্ষম হতে পারে।
জনমতেও এআই নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থানের সঙ্গে সাধারণ মানুষের মনোভাবের পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। বুধবার প্রকাশিত এক জরিপে মাত্র ১১ শতাংশ আমেরিকান নিজেদের এলাকায় এআই ডেটা সেন্টার নির্মাণের পক্ষে মত দিয়েছেন। বিপরীতে ৬৫ শতাংশ এর বিরোধিতা করেছেন। রিপাবলিকানদের মধ্যেও ৫২ শতাংশ এ ধরনের ডেটা সেন্টারের বিরোধিতা করেছেন।
একই জরিপে ৫৭ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, এআই ইস্যুতে ট্রাম্পের ভূমিকা ভালো নয়। মার্চের তুলনায় এই হার ৭ শতাংশ বেড়েছে।
এআই অবকাঠামোর বাড়তি ব্যয় নিয়েও মার্কিন কংগ্রেসে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। প্রতিনিধি পরিষদ ৪১৭-৩ ভোটে একটি বিল পাস করেছে, যাতে ডেটা সেন্টারগুলোর কার্যক্রমের কারণে বিদ্যুৎ গ্রিড উন্নয়নে যে অতিরিক্ত ব্যয় হয়, তা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকেই বহনের কথা বলা হয়েছে।
এদিকে ট্রাম্প পরিবারের ব্যবসায়িক স্বার্থের অন্যতম ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে ডেটা সেন্টার ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি। ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র ও এরিক ট্রাম্প গত বছর বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ডমিনারি হোল্ডিংসের সঙ্গে যুক্ত হন। পরে তারা আমেরিকান ডেটা সেন্টারস ইনকরপোরেটেড নামে একটি এআই অবকাঠামো উদ্যোগ চালু করেন। এতে ডমিনারি সংখ্যালঘু অংশীদার হিসেবে রয়েছে।
এই উদ্যোগের সময়ের কাছাকাছি ট্রাম্প সংযুক্ত আরব আমিরাতের ধনকুবের হুসেইন সাজওয়ানির কাছ থেকে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের ডেটা সেন্টার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করেছিলেন। একই সময়ে বেসরকারি খাত থেকে ৫০০ বিলিয়ন ডলারের এআই বিনিয়োগ পরিকল্পনার কথাও সামনে আসে।
এরপর ট্রাম্পের দুই ছেলে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির দিকে আরও এগিয়ে যান। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ভলকান এলিমেন্টস—বিরল-মাটির চুম্বক উৎপাদনকারী একটি স্টার্টআপ, যার পণ্য এআই ডেটা সেন্টার, ড্রোন ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ব্যবহৃত হয়।
ডিসেম্বরে পেন্টাগন ভলকান এলিমেন্টসকে ৬২০ মিলিয়ন ডলারের ঋণ দেওয়ার ঘোষণা দেয়। এটি প্রতিরক্ষা বিভাগের স্ট্র্যাটেজিক ক্যাপিটাল কার্যালয়ের দেওয়া সবচেয়ে বড় ঋণ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর তিন মাস আগে ট্রাম্প জুনিয়র অংশীদার হিসেবে থাকা বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ১৭৮৯ ক্যাপিটাল ভলকানে বিনিয়োগ করেছিল।
প্রোপাবলিকার এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ভলকানের ঋণ পাওয়ার প্রক্রিয়াটি পেন্টাগন বা ভলকানের পক্ষ থেকে শুরু হয়নি; বরং ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও হোয়াইট হাউসের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা পিটার নাভারো বিষয়টি এগিয়ে নেন। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, পেন্টাগনের কর্মকর্তাদের বিষয়টি অস্বাভাবিক দ্রুততার সঙ্গে এগিয়ে নিতে বলা হয়েছিল।
তবে ট্রাম্প জুনিয়রের মুখপাত্র, পেন্টাগন এবং ভলকান এলিমেন্টস জানিয়েছে, চুক্তিতে ট্রাম্প জুনিয়রের কোনো ভূমিকা ছিল না এবং প্রতিষ্ঠানটি রাজনৈতিক সুবিধা পায়নি।
এরিক ট্রাম্প ফাউন্ডেশন ফিউচার ইন্ডাস্ট্রিজ নামের একটি রোবোটিকস স্টার্টআপের প্রধান কৌশলগত উপদেষ্টা। প্রতিষ্ঠানটি মেরিন কর্পসের ২৪ মিলিয়ন ডলারের চুক্তির সঙ্গে যুক্ত। এই চুক্তি নিয়ে সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেন সমালোচনা করেছেন।
অন্যদিকে ট্রাম্প পরিবারের দুই ছেলের সমর্থন পাওয়া ড্রোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান পাওয়ারাস পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর সঙ্গে নতুন একটি চুক্তি করেছে। প্রতিষ্ঠানটির মার্কিন বিমানবাহিনীর সঙ্গে ৯০ মিলিয়ন ডলারের একটি চুক্তিও রয়েছে। এআই প্রযুক্তির ব্যবহার ড্রোন খাতে ভবিষ্যতে আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জুলাইয়ে ওয়াশিংটন পোস্টের এক বিশ্লেষণে বলা হয়, ট্রাম্পের দুই ছেলের বিনিয়োগ তহবিলের সঙ্গে যুক্ত ১৫টি প্রতিষ্ঠান তাদের সম্পৃক্ততার পর অন্তত ৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের সরাসরি ফেডারেল ব্যবসা পেয়েছে। তবে এর ৯৭ শতাংশ এসেছে স্পেসএক্স ও অ্যান্ডুরিল থেকে। ১৫টির মধ্যে ১০টি প্রতিষ্ঠান ট্রাম্পের দুই ছেলে বিনিয়োগ করার আগেই সরকারি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিল।
স্পেসএক্স ও অ্যান্ডুরিল বাদ দিলে বাকি ১৩টি প্রতিষ্ঠান ট্রাম্পের দুই ছেলের বিনিয়োগের পর ১০৩ মিলিয়ন ডলারের সরাসরি ফেডারেল অর্থায়ন এবং প্রায় ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের দীর্ঘমেয়াদি সরকারি প্রতিশ্রুতি পেয়েছে।
ট্রাম্প পরিবারের বাইরে তার ঘনিষ্ঠ প্রযুক্তি মিত্র ডেভিড স্যাকসের আর্থিক স্বার্থ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তার ভেঞ্চার প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সসহ বিভিন্ন এআই স্টার্টআপে বিনিয়োগ করেছে। এর আগে মেটা, পালান্টির ও এয়ারবিএনবিতেও বিনিয়োগ ছিল।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তা ব্যক্তিগতভাবে খতিয়ে দেখেছিলেন—নতুন এআই বিধিনিষেধ ঠেকিয়ে স্যাকস নিজে আর্থিকভাবে লাভবান হতে পারেন কি না। তবে এ ধরনের স্বার্থের সংঘাত প্রমাণিত হয়েছে—এমন তথ্য প্রতিবেদনে দেওয়া হয়নি।
এদিকে ইলন মাস্ক, মেটার মার্ক জাকারবার্গ এবং এনভিডিয়ার জেনসেন হুয়াং গত মাসে ট্রাম্পের সঙ্গে এআই নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে আলোচনা করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। শিল্পখাতের অর্থায়নে এআই তদারকি সংস্থা গঠনের একটি প্রস্তাবের বিরোধিতার পর পরিকল্পনাটি আর এগোয়নি বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।
মাইকেল ডেলের প্রতিষ্ঠান প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলারের পেন্টাগন চুক্তি পাওয়ার পর তার উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যপদ নিয়েও সরকারি নৈতিকতা পর্যবেক্ষকদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। তাদের প্রশ্ন, সরকারি উপদেষ্টা হিসেবে তার ভূমিকা এবং তার প্রতিষ্ঠানের সরকারি চুক্তির মধ্যে কোনো অনিরসিত স্বার্থের সংঘাত তৈরি হয়েছে কি না।
তবে পুরো প্রযুক্তি শিল্প ট্রাম্পের অবস্থানের সঙ্গে একমত নয়। ওপেনসিক্রেটসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি নির্বাচনী চক্রে বৃহত্তর যোগাযোগ ও ইলেকট্রনিকস খাতের রাজনৈতিক অনুদানের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ এখনো ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ও কমিটিগুলোর কাছে যাচ্ছে।
আগামী সপ্তাহে ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ এআই প্রতিষ্ঠানগুলোর নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন বলে পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার মাইক জনসনের সঙ্গে আয়োজিত ওই বৈঠকের সময় চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সফরও হওয়ার কথা রয়েছে।
এআই খাতে নিয়ন্ত্রণ, জাতীয় নিরাপত্তা, অবকাঠামোগত ব্যয় এবং সরকারি অর্থায়ন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বিতর্কের মধ্যেই ট্রাম্প পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ ও সরকারি ব্যবসা অব্যাহত রয়েছে।
সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান \ ওয়াশিংটন পোস্ট,
এমকে

