ডেনমার্কে ‘নন-ওয়েস্টার্ন’ বা অ-পশ্চিমা পরিচয়ের কারণে বাড়ি থেকে উচ্ছেদের অভিযোগ তুলে দেশটির সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন সাতটি পরিবার। কোপেনহেগেনের উত্তরে উপকূলীয় শহর হেলসিঙ্গরের এসব পরিবার তাদের সাবেক বাড়িওয়ালার বিরুদ্ধে আইনি লড়াই করছে। শুক্রবার শুরু হওয়া দুই দিনের শুনানিতে তাদের দাবি, নিজেদের কিংবা বাবা-মায়ের জন্মস্থান ও বংশপরিচয়ের কারণে তাদের বাসা ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে।
২০১৮ সালে প্রণীত একটি আইন অনুযায়ী, যেসব সামাজিক আবাসন এলাকায় বাসিন্দাদের অর্ধেকের বেশি ‘নন-ওয়েস্টার্ন’ অভিবাসী অথবা তাদের বংশধর, সেসব এলাকাকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করা হয়। আইনটি আগে ‘ঘেটো আইন’ নামে পরিচিত ছিল। ২০২২ সালে এই আইনের আওতায় হেলসিঙ্গরের পরিবারগুলোর ভাড়ার চুক্তি বাতিল করা হয়। ডেনমার্ক সরকার বলছে, অভিবাসীদের সমাজের মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত করাই এ আইনের উদ্দেশ্য। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে আইনটিকে বৈষম্যমূলক বলে সমালোচনা করে আসছে।
‘নন-ওয়েস্টার্ন’ শব্দটি ডেনমার্কের পরিসংখ্যানগত একটি শ্রেণিবিভাগ। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক দপ্তরের ২০২০ সালের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের অধিকাংশ দেশকে এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তবে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, নরওয়ে, সুইজারল্যান্ডসহ কয়েকটি দেশ এর বাইরে রয়েছে।
এই শ্রেণিবিভাগে শুধু বিদেশে জন্ম নেওয়া ব্যক্তিরাই নন, তাদের বংশধরেরাও অন্তর্ভুক্ত। এমনকি ডেনমার্কে জন্ম নেওয়া ও বেড়ে ওঠা কোনো নাগরিকের বাবা-মায়ের কেউই যদি দেশটিতে জন্ম নেওয়া ডেনিশ নাগরিক না হন, তাহলে তাকেও ‘নন-ওয়েস্টার্ন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হতে পারে। জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের মতে, এর ফলে ডেনমার্কের অশ্বেতাঙ্গ ও অ-ইউরোপীয় জনগোষ্ঠী তুলনামূলকভাবে বেশি এই শ্রেণিতে পড়েন।
আইন অনুযায়ী, প্রতি বছর ১ ডিসেম্বর সরকার ‘প্যারালাল সোসাইটি’ বা সমান্তরাল সমাজ হিসেবে চিহ্নিত এলাকার তালিকা প্রকাশ করে। কমপক্ষে এক হাজার বাসিন্দার কোনো সামাজিক আবাসন এলাকায় ‘নন-ওয়েস্টার্ন’ অভিবাসী ও তাদের বংশধরদের সংখ্যা ৫০ শতাংশের বেশি হতে হয়। পাশাপাশি বেকারত্ব, অপরাধ, শিক্ষার মান ও আয়ের চারটি সূচকের মধ্যে অন্তত দুটি শর্ত পূরণ করতে হয়।
কোনো এলাকা টানা পাঁচ বছর তালিকায় থাকলে সেটিকে ‘ট্রান্সফরমেশন এরিয়া’ বা রূপান্তর এলাকা ঘোষণা করা হয়। এসব এলাকায় ২০৩০ সালের মধ্যে সরকারি পারিবারিক আবাসনের পরিমাণ ৪০ শতাংশে নামিয়ে আনতে হয়। এ জন্য বাড়ি বিক্রি, ভেঙে ফেলা অথবা অন্য কাজে রূপান্তরের ব্যবস্থা নেওয়া হয়। একই ধরনের সামাজিক সমস্যা থাকা সত্ত্বেও কোনো এলাকায় ‘নন-ওয়েস্টার্ন’ বাসিন্দার সংখ্যা নির্ধারিত সীমার নিচে থাকলে সেখানে এই বাধ্যবাধকতা প্রযোজ্য হয় না।
ডেনমার্ক সরকারের দাবি, একই এলাকায় বিপুলসংখ্যক অ-পশ্চিমা বিদেশির বসবাস ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিকভাবে পৃথক সমাজ গড়ে ওঠার ঝুঁকি বাড়ায়। ২০২১ সালে তৎকালীন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী কায়ারে দিবাদ বেক বলেছিলেন, কোনো এলাকায় অতিরিক্তসংখ্যক অ-পশ্চিমা বিদেশির বসবাস সমান্তরাল সমাজ গঠনের ঝুঁকি তৈরি করে।
ভাড়াটিয়াদের সংগঠনগুলোর হিসাব অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে ডেনমার্কজুড়ে প্রায় ১১ হাজার মানুষকে তাদের বর্তমান বাড়ি ছাড়তে হতে পারে। হেলসিঙ্গরের নয়সমহেড আবাসন এলাকায় বাড়িওয়ালা প্রতিষ্ঠান বোলিগার্ডেন ২০২০ সালের শুরুতে ৯৬টি অ্যাপার্টমেন্ট সংস্কারের ঘোষণা দেয়। পরে সেখানে বসবাসকারী ভাড়াটিয়াদের চুক্তি বাতিল করা হয়। উচ্ছেদের মুখে পড়া অধিকাংশ বাসিন্দারই বিদেশি বংশোদ্ভূত পরিচয় ছিল।
এদিকে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের আদালত ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে এক রায়ে বলেছে, শুধু নাগরিকত্ব বা জন্মস্থান দিয়ে কারও জাতিগত পরিচয় নির্ধারণ করা যায় না। তবে আপাতদৃষ্টিতে নিরপেক্ষ কোনো মানদণ্ড যদি নির্দিষ্ট জাতিগত জনগোষ্ঠীর ওপর বেশি প্রভাব ফেলে, তাহলে সেটি জাতিগত বৈষম্যের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। আদালত আরও বলেছে, এ ধরনের শ্রেণিবিভাগের কারণে কোনো বাসিন্দার ভাড়ার চুক্তি আগেভাগে বাতিল হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে গেলে তা কম অনুকূল আচরণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের আদালত ডেনমার্কের আইন সরাসরি বাতিল করেনি। দেশটির আদালতকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে, ‘নন-ওয়েস্টার্ন’ মানদণ্ডের প্রয়োগ জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে বৈষম্য তৈরি করেছে কি না।
এখন পর্যন্ত ডেনমার্ক সরকার আইনটি পরিবর্তন করেনি। দেশটির তৎকালীন সামাজিক বিষয় ও আবাসন মন্ত্রী সোফি হেস্টর্প অ্যান্ডারসেন জানুয়ারিতে সংসদীয় শুনানিতে বলেছিলেন, পূর্বাঞ্চলীয় উচ্চ আদালতের রায় না আসা পর্যন্ত কর্তৃপক্ষকে আইনটি প্রয়োগ অব্যাহত রাখতে হবে।
হেলসিঙ্গরের সাত পরিবারের মামলার রায়ের নির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা করা হয়নি। তবে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি মাসের শেষ দিকে রায় আসতে পারে। পরিবারগুলো মামলায় জয়ী হলে তাদের আগের বাড়ির মতো সমমানের আবাসনে পুনর্বাসনের সম্ভাবনা রয়েছে। এদিকে, কোপেনহেগেনের মিয়োলনারপার্কেন এলাকার একই ধরনের আরেকটি মামলা পূর্বাঞ্চলীয় উচ্চ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।
সূত্রঃ আল জাজিরা
এমকে

