ডেনমার্কে সামরিক প্রতিরক্ষা শিল্পের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে লক্ষ্য করে রাশিয়া নাশকতামূলক হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে সতর্ক করেছে দেশটির নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থা পিইটি। ড্যানিশ গোয়েন্দাদের দাবি, ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে কেন্দ্র করে রাশিয়ার পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট নাশকতার পরিকল্পনা তৈরি করা হচ্ছে।
ড্যানিশ সংবাদমাধ্যম ডিআর ও বার্লিংস্কেকে দেওয়া বক্তব্যে পিইটির কাউন্টারইন্টেলিজেন্স বিভাগের প্রধান এমিল গ্রেসহোম জানান, বিষয়টি শুধু ভবিষ্যৎ কোনো সম্ভাব্য হুমকি নয়; বরং রাশিয়া ইতোমধ্যে এ ধরনের হামলার বাস্তব প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা শুরু করেছে বলে গোয়েন্দাদের কাছে তথ্য রয়েছে।
গোয়েন্দা সংস্থাটির ভাষ্য অনুযায়ী, সম্ভাব্য নাশকতার লক্ষ্য হতে পারে ডেনমার্কের এমন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান, যেগুলো ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার সঙ্গে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে যুক্ত। এর ফলে ইউক্রেনকে সমর্থনকারী ইউরোপীয় দেশগুলোর ওপর রাশিয়ার চাপ ও হুমকির নতুন মাত্রা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
শুধু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোকেই নয়, সাধারণ ড্যানিশ নাগরিকদেরও ব্যবহার করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পিইটি। গোয়েন্দাদের দাবি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে অর্থের বিনিময়ে ছবি তোলা বা তথ্য সংগ্রহের কাজে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
গোয়েন্দাদের হাতে এমন প্রমাণও এসেছে বলে দাবি করা হয়েছে, যেখানে সাধারণ নাগরিকদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা ছবি ও তথ্য পরবর্তী সময়ে সম্ভাব্য নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনায় ব্যবহার করা হতে পারে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের কাছে এই বিষয়টিই বিশেষভাবে উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় পিইটি ডেনমার্কের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের উদ্যোগ নিয়েছে। একই সঙ্গে দেশের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকেও সম্ভাব্য গোয়েন্দা তৎপরতা ও সন্দেহজনক যোগাযোগের বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
কনফেডারেশন অব ড্যানিশ ইন্ডাস্ট্রির নিরাপত্তা বিভাগের প্রধান রাসমুস অ্যান্ডারস্কাউ ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানিয়েছেন। বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠান প্রতিরক্ষা খাত, সামরিক সরঞ্জাম কিংবা ইউক্রেনকে সহায়তার সঙ্গে যুক্ত, তাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি সামনে এসেছে।
ড্যানিশ ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ গবেষক ফ্লেমিং স্প্লিডসবোয়েল এই হুমকিকে রাশিয়ার কর্মকাণ্ডের একটি নতুন ও উন্নত মাত্রা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার বক্তব্যে উঠে এসেছে, ইউরোপীয় দেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নাশকতামূলক তৎপরতার আশঙ্কা এখন আগের চেয়ে বেশি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।
অন্যদিকে সাবেক ড্যানিশ সামরিক গোয়েন্দা বিশ্লেষক জ্যাকব কার্সবো মনে করেন, সম্ভাব্য রুশ নাশকতার বিষয়ে ডেনমার্কের এই আগাম সতর্কতা মস্কোর কাছেও একটি স্পষ্ট বার্তা পাঠাবে। অর্থাৎ ডেনমার্ক শুধু সম্ভাব্য হামলার ঝুঁকি শনাক্ত করছে না, বরং এ ধরনের তৎপরতার বিরুদ্ধে পাল্টা নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতিও দেখাচ্ছে।
ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ইউরোপের নিরাপত্তা পরিস্থিতি ইতোমধ্যে ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। ইউক্রেনকে সামরিক ও আর্থিক সহায়তা দেওয়া ইউরোপীয় দেশগুলোকে রাশিয়া বিভিন্ন সময়ে কঠোরভাবে সতর্ক করেছে। সেই প্রেক্ষাপটে ডেনমার্কের মতো ন্যাটো সদস্য দেশের সামরিক শিল্পকে ঘিরে সম্ভাব্য নাশকতার অভিযোগ নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
তবে এখন পর্যন্ত ডেনমার্কে রাশিয়ার পক্ষ থেকে এ ধরনের কোনো হামলা সংঘটিত হয়েছে—এমন দাবি করা হয়নি। একইভাবে গোয়েন্দাদের সতর্কতার অর্থও এই নয় যে কোনো নির্দিষ্ট হামলা অবশ্যম্ভাবী। বরং পিইটির বক্তব্য অনুযায়ী, সম্ভাব্য নাশকতা প্রতিরোধে আগাম সতর্কতা এবং নিরাপত্তা জোরদার করাই বর্তমানে তাদের প্রধান লক্ষ্য।
ড্যানিশ গোয়েন্দাদের এই সতর্কবার্তার ফলে দেশটির প্রতিরক্ষা শিল্প, ইউক্রেনকে সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠান এবং অনলাইন মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহের তৎপরতার ওপর নজরদারি আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে ইউরোপের অন্যান্য দেশও রুশ গোয়েন্দা ও নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে সতর্ক হতে পারে।
সব মিলিয়ে, ডেনমার্কের গোয়েন্দা সংস্থার সর্বশেষ সতর্কবার্তা ইউরোপের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে একটি উদ্বেগজনক দিক সামনে এনেছে—যুদ্ধক্ষেত্র ইউক্রেনের বাইরে সরাসরি যুদ্ধ না হলেও নাশকতা, গোয়েন্দা তৎপরতা ও গোপন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সংঘাতের প্রভাব ইউরোপের অন্যান্য দেশেও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
সূত্রঃ এএফপি
এম.কে

