TV3 BANGLA
আন্তর্জাতিক

তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কায় কি প্রস্তুতি নিচ্ছে বিশ্বঃ যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্য-জাপান ও ইউরোপে জরুরি সতর্কতা

বিশ্বজুড়ে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, সাইবার হামলা এবং সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি বাড়তে থাকায় জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুতি জোরদার করছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ। কোথাও সামরিক ঘাঁটিকে দীর্ঘ সময় স্বয়ংসম্পূর্ণ রাখার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে, কোথাও সাধারণ নাগরিকদের ঘরে জরুরি খাদ্য ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী মজুত রাখতে বলা হচ্ছে। এসব পদক্ষেপ নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—বিশ্ব কি বড় কোনো যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে?

সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি সাইবার হামলা, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থায় বিপর্যয়, অন্তর্ঘাত, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা দীর্ঘস্থায়ী সরবরাহ সংকট মোকাবিলাও এসব উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য।

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিতে ৯০ দিনের প্রস্তুতিঃ

যুক্তরাষ্ট্রে পেন্টাগন এমন একটি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে, যার লক্ষ্য দেশটির মূল ভূখণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটিগুলোকে বাইরের সহায়তা ছাড়াই অন্তত ৯০ দিন সচল রাখার সক্ষমতা তৈরি করা। ‘ফরচুন’-এর এক প্রতিবেদনের বরাতে দ্য ইকোনমিক টাইমস জানিয়েছে, ‘ফোর্ট্রেস’ নামে পরিচিত এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থা বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো বিপর্যস্ত হলেও সামরিক স্থাপনাগুলোর কার্যক্রম চালু রাখা।

পরিকল্পনার আওতায় বিদ্যুৎ সরবরাহের বিকল্প ব্যবস্থা, জ্বালানির কৌশলগত মজুত এবং বিকল্প সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। এর মাধ্যমে বড় ধরনের সংকটের সময় সামরিক কার্যক্রম যাতে দেশের বাইরের সরবরাহ বা দুর্বল হয়ে পড়া জাতীয় অবকাঠামোর ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল না থাকে, তা নিশ্চিত করতে চায় পেন্টাগন।

যুক্তরাজ্যে ‘বি রেডি’ কর্মসূচিঃ ঘরে রাখতে হবে তিন দিনের জরুরি সামগ্রী

যুক্তরাজ্যও সাধারণ নাগরিকদের জরুরি পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানিয়েছে। গত ২২ অক্টোবর হালনাগাদ ‘বি রেডি’ প্রচার অভিযান চালু করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বড় কোনো বিপর্যয়ে স্বাভাবিক সেবা ব্যাহত হলে মানুষ যেন অন্তত তিন দিন নিজেদের প্রয়োজন নিজেরাই সামাল দিতে পারে।

এ জন্য ঘরে পর্যাপ্ত পানীয় জল, শুকনো খাবার, টর্চ, অতিরিক্ত ব্যাটারি, প্রাথমিক চিকিৎসার সরঞ্জাম, নগদ অর্থ এবং ব্যাটারিচালিত বা বিকল্প ব্যবস্থায় চালানো যায় এমন রেডিও রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সাইবার হামলা, অন্তর্ঘাত কিংবা বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে জরুরি সেবার ওপর চাপ কমানোই এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।

ব্রিটেনের ২০২৫ সালের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলেও দেশের নিরাপত্তা ও ভূখণ্ডের ওপর সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলায় সতর্ক থাকার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। সরকারের বার্তা হলো, নাগরিকদের আতঙ্কিত করা নয়; বরং সংকটের প্রথম কয়েক দিন যেন তারা তাৎক্ষণিক সরকারি সহায়তার ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল না থাকেন।

জাপানে দুর্যোগ মোকাবিলার পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ আশ্রয়কেন্দ্রঃ

জাপানের জরুরি প্রস্তুতির পেছনে বড় কারণ দেশটির ভূমিকম্প, সুনামি ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি। দেশটিতে নতুন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থার কার্যক্রম ২ নভেম্বর শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। এর পাশাপাশি নাগরিকদের দুর্যোগের প্রথম তিন থেকে সাত দিন নিজেদের প্রয়োজনীয় খাবার, পানীয় জল ও স্যানিটেশন সামগ্রী প্রস্তুত রাখার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

তবে জাপানের প্রস্তুতি শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগে সীমাবদ্ধ নয়। সামরিক হামলার আশঙ্কা বিবেচনায় শহরাঞ্চলের ভূগর্ভস্থ স্থাপনাগুলোকে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনাও নেওয়া হচ্ছে। চলতি বছরের মার্চে ‘দ্য জাপান টাইমস’ এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এর লক্ষ্য হলো জরুরি পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের নিরাপদ আশ্রয়ের সুযোগ বাড়ানো।

রাশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোতে বেসামরিক প্রতিরক্ষা জোরদারঃ

২০২২ সালে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর ইউরোপের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে রাশিয়ার কাছাকাছি অবস্থিত ফিনল্যান্ড, সুইডেন, পোল্যান্ড এবং বাল্টিক অঞ্চলের এস্তোনিয়া, লাটভিয়া ও লিথুয়ানিয়া বেসামরিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করছে।

পোল্যান্ডে নতুন প্রতিরক্ষা আইন এবং ২০২৫ সালে পাস হওয়া বেসামরিক প্রতিরক্ষা আইনের আওতায় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ ও সংস্কারের উদ্যোগ বাড়ানো হয়েছে। জরুরি পরিস্থিতিতে নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে একটি বিস্তৃত কাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে।

ফিনল্যান্ডের রয়েছে বিস্তৃত ভূগর্ভস্থ আশ্রয়কেন্দ্রের নেটওয়ার্ক। দেশটি এসব আশ্রয়কেন্দ্রের সক্ষমতা ও কৌশলগত মজুত বাড়ানোর পাশাপাশি প্রায় নয় মাসের চাহিদা পূরণ করতে পারে এমন শস্য মজুত রাখার ব্যবস্থাও জোরদার করেছে।

সুইডেন তার সর্বাত্মক প্রতিরক্ষা নীতিকে নতুন করে গুরুত্ব দিচ্ছে। সামরিক প্রতিরক্ষার পাশাপাশি বেসামরিক জনগণের প্রস্তুতিও এই নীতির অংশ। দেশটির হালনাগাদ নির্দেশনায় সশস্ত্র হামলাসহ গুরুতর সংকটের জন্য নাগরিকদের প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে।

অন্যদিকে, এস্তোনিয়া, লাটভিয়া ও লিথুয়ানিয়া জরুরি সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা, আশ্রয়কেন্দ্র এবং অত্যাবশ্যকীয় পরিষেবা সুরক্ষার ব্যবস্থা জোরদার করছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভিন্ন প্রস্তুতি কৌশলঃ

ইউরোপীয় ইউনিয়নও সংকট মোকাবিলায় সদস্যদেশগুলোর মধ্যে সমন্বিত প্রস্তুতির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। ‘প্রিপেয়ার্ডনেস ইউনিয়ন স্ট্র্যাটেজি’ নামে পরিচিত এই কৌশলের আওতায় ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, সামরিক সংঘাত, সাইবার হামলা এবং জলবায়ুজনিত দুর্যোগের মতো পরিস্থিতিতে সরকার, প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষের সমন্বিত ভূমিকার কথা বলা হয়েছে।

এই কৌশলে নাগরিকদের অন্তত ৭২ ঘণ্টার জরুরি প্রয়োজন মেটানোর মতো খাবার, পানি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী প্রস্তুত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সীমান্ত পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে এমন সংকটের সময় জ্বালানি, পরিবহন, যোগাযোগ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পরিষেবা সচল রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

ইউরোপের দেশগুলো মনে করছে, আধুনিক সংঘাতে শুধু সামরিক বাহিনীর সরাসরি লড়াই নয়, বিদ্যুৎ গ্রিডে নাশকতা, সাইবার আক্রমণ, যোগাযোগব্যবস্থা অচল করা কিংবা সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটিয়েও একটি দেশকে বড় সংকটে ফেলা সম্ভব। ইউক্রেন যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে এ ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতির প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়েছে।

তাহলে কি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ আসন্ন?

যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সাম্প্রতিক উদ্যোগ বিশ্ব নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের প্রতিফলন হলেও এগুলোকে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার নিশ্চিত পূর্বাভাস বলা যায় না। দেশগুলোর প্রস্তুতির ধরন ও উদ্দেশ্যও এক নয়। যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনায় সামরিক ঘাঁটির জ্বালানি ও বিদ্যুৎ নিরাপত্তা গুরুত্বপূর্ণ, যুক্তরাজ্য নাগরিকদের জরুরি প্রস্তুতির ওপর জোর দিচ্ছে, জাপান প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি সামরিক ঝুঁকি বিবেচনায় নিচ্ছে, আর ইউরোপের দেশগুলো বেসামরিক প্রতিরক্ষা ও জাতীয় অবকাঠামোর সক্ষমতা বাড়াচ্ছে।

বিশ্বজুড়ে সংঘাত ও নিরাপত্তাঝুঁকি বাড়ার কারণে সরকারগুলো এখন আগের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে জরুরি প্রস্তুতি নিচ্ছে।

সূত্রঃ  দ্য গার্ডিয়ান\রয়টার্স

এমকে

আরো পড়ুন

টাইম ম্যাগাজিনের ১০০ প্রভাবশালীর তালিকায় নাহিদ ইসলাম

আমেরিকা, কানাডা ও ইংল্যান্ডে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা র-এর দরজা বন্ধ: দ্য প্রিন্ট

ভুতের সঙ্গে বিয়ে ও পরে বিচ্ছেদ