9.2 C
London
May 13, 2026
TV3 BANGLA
আন্তর্জাতিক

নৌ অবরোধেও ৪ মাস টিকে থাকতে পারে তেহরানঃ সিআইএর গোপন মূল্যায়নে উদ্বেগ

যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর এক গোপন মূল্যায়নে উঠে এসেছে, টানা সামরিক হামলা ও কঠোর নৌ অবরোধের পরও ইরান এখনো উল্লেখযোগ্য সামরিক সক্ষমতা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।

যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় দেশটি প্রায় ৭৫ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণযান এবং ৭০ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্র মজুত অক্ষত রেখেছে বলে মূল্যায়নে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বলা হয়েছে, মার্কিন নৌ অবরোধ চলমান থাকলেও ইরান অন্তত তিন থেকে চার মাস অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে টিকে থাকতে পারবে।

সিআইএর এই মূল্যায়ন গত সপ্তাহে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিনির্ধারকদের কাছে উপস্থাপন করা হয়। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত চার ব্যক্তি জানিয়েছেন, এই বিশ্লেষণ ট্রাম্প প্রশাসনের প্রকাশ্য দাবির সঙ্গে স্পষ্ট বৈপরীত্য তৈরি করেছে। কারণ, হোয়াইট হাউস বারবার দাবি করে আসছে যে ইরানের সামরিক সক্ষমতা প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে এবং দেশটি দ্রুত ভেঙে পড়ার পথে রয়েছে।

গোপন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কয়েক সপ্তাহের যৌথ বিমান হামলার পরও ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি। বরং দেশটি ভূগর্ভস্থ বহু অস্ত্রাগার পুনরায় সচল করতে সক্ষম হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষেপণাস্ত্র মেরামতের পাশাপাশি যুদ্ধ শুরুর সময় প্রস্তুত অবস্থায় থাকা নতুন কিছু ক্ষেপণাস্ত্রও এখন সক্রিয় অস্ত্রভান্ডারে যুক্ত করা হয়েছে।

একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইরান যুদ্ধের শুরুর ধাক্কা কাটিয়ে দ্রুত সামরিক পুনর্গঠন করেছে। তাদের মতে, তেহরানের সামরিক নেতৃত্ব এখনো পাল্টা হামলা চালানোর মতো যথেষ্ট সক্ষমতা ধরে রেখেছে।

অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সম্প্রতি ওভাল অফিসে দেওয়া বক্তব্যে দাবি করেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র শক্তি প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে এবং দেশটির হাতে মাত্র ১৮ থেকে ১৯ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্র অবশিষ্ট রয়েছে। তবে মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়ন সেই বক্তব্যের সঙ্গে পুরোপুরি মিল খুঁজে পাচ্ছে না।

যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়েও ভিন্নধর্মী চিত্র উঠে এসেছে সিআইএর প্রতিবেদনে। সেখানে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ ইরানের অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করলেও পরিস্থিতি এখনো বিপর্যয়কর পর্যায়ে পৌঁছায়নি। ইরান বিকল্প উপায়ে তেল সংরক্ষণ করছে এবং উৎপাদন নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে তেলক্ষেত্র সচল রাখার চেষ্টা করছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, যদি স্থলপথে তেল পাচার বা রেলপথে মধ্য এশিয়ার দিকে জ্বালানি পরিবহন শুরু করা যায়, তাহলে ইরানের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রত্যাশার চেয়ে দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। কয়েকজন মার্কিন কর্মকর্তা মনে করছেন, তেহরানের দীর্ঘমেয়াদি চাপ সহ্য করার সক্ষমতা সিআইএর অনুমানের চেয়েও বেশি হতে পারে।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র “অপারেশন ইকোনমিক ফিউরি” নামে ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক চাপ বৃদ্ধির কৌশল চালিয়ে যাচ্ছে। হোয়াইট হাউস দাবি করেছে, নৌ অবরোধের কারণে ইরান প্রতিদিন প্রায় ৫০ কোটি ডলার ক্ষতির মুখে পড়ছে। মার্কিন প্রশাসনের ভাষ্যমতে, দেশটির নৌবাহিনী প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে এবং শীর্ষ নেতৃত্ব আত্মগোপনে রয়েছে।

তবে বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক। ওয়াশিংটন পোস্টের এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ইরানের পাল্টা হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনাগুলোতে অন্তত ২২৮টি অবকাঠামো বা সামরিক সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যা সরকারি ঘোষণার তুলনায় অনেক বড় ক্ষয়ক্ষতির চিত্র তুলে ধরে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের চেয়ে কম খরচের ড্রোনই এখন বড় হুমকি হয়ে উঠেছে। কারণ, এসব ড্রোন ছোট স্থাপনাতেও তৈরি করা যায় এবং সহজে গোপন রাখা সম্ভব।

তেল আবিবভিত্তিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক ড্যানি সিট্রিনোভিচ বলেছেন, একটি ড্রোন হামলাই আন্তর্জাতিক তেল পরিবহনে বড় ধরনের আতঙ্ক তৈরি করতে পারে। তার মতে, কয়েক মাস নৌ অবরোধ চললেও ইরান যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত মেনে আত্মসমর্পণ করবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।

তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, যুদ্ধের শুরুতে ইরানের শাসনব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়লেও দীর্ঘমেয়াদে উল্টো দেশটির ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী আরও কঠোর ও সংগঠিত হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে ইরান এখনো ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার মাধ্যমে সংঘাতের সূচনা হয়। পরে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি স্থিতিশীল হয়নি। হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা এবং নৌ চলাচল নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে টানাপোড়েন অব্যাহত রয়েছে।

সর্বশেষ ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রস্তাব তারা পর্যালোচনা করছে এবং পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে জবাব দেওয়া হতে পারে। তবে সামরিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় দ্রুত সমাধানের সম্ভাবনা এখনো অনিশ্চিত বলেই মনে করছেন আন্তর্জাতিক মহল।

সূত্রঃ এপিপি

এম.কে

আরো পড়ুন

নিজ দেশে চাপে ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো, ভারতে খুলছে শাখা ক্যাম্পাস

যুক্তরাষ্ট্রে ভিসা, গ্রিন কার্ড, নাগরিকত্ব অনুষ্ঠান—সব প্রক্রিয়া থেমে গেল ট্রাভেল ব্যানভুক্ত দেশগুলোর জন্য

ইসরায়েল-ফিলিস্তিন দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধান: বাস্তবায়নের উপায় জানালেন ডেভিড ক্যামেরনের আইনজীবী