২০১৫ সালে বিয়ে করেছিলেন সিনায়াত মাহজাবীন ও আবির হাসান। দুজনের পড়াশোনার বিষয় আলাদা, গবেষণার ক্ষেত্রও ভিন্ন। কিন্তু উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন তাদের দুজনকেই নিয়ে গেছে যুক্তরাজ্যের বিখ্যাত অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। নিজেদের স্বপ্ন পূরণের পাশাপাশি তারা একে অপরের পথচলারও সহযোগী হয়েছেন।
সিনায়াত ঢাকার নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি থেকে ফার্মাসিউটিক্যাল সায়েন্সেসে স্নাতক সম্পন্ন করেন। অন্যদিকে আবির হাসান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী ছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর করেন।
উচ্চশিক্ষা নিয়ে দুজনেরই ছিল বড় স্বপ্ন। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে নিজেদের সক্ষমতা যাচাই করা, নতুন পরিবেশে শেখা এবং গবেষণার সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকেই তারা বিদেশে পড়াশোনার প্রস্তুতি শুরু করেন।
অক্সফোর্ডে যাওয়ার প্রথম সুযোগটি পান আবির। জননীতি বিষয়ে স্নাতকোত্তর করার সুযোগ পেলেও একই সময়ে বিশ্বব্যাংকে কাজের প্রস্তাব পান তিনি। পেশাগত সুযোগটি গ্রহণ করে অক্সফোর্ডে ভর্তি এক বছর পিছিয়ে দেন আবির।
এই সময় তিনি স্ত্রী সিনায়াতকেও অক্সফোর্ডে আবেদন করতে উৎসাহিত করেন। সিনায়াত অক্সফোর্ডের পাশাপাশি ডেনমার্কের কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়েও আবেদন করেছিলেন। ডেনিশ সরকারের বৃত্তিসহ সেখানে পড়ার সুযোগ পেলেও শেষ পর্যন্ত তিনি অক্সফোর্ডকেই বেছে নেন।
এর অন্যতম কারণ ছিল—দুজন একই সময়ে একই শহরে থেকে উচ্চশিক্ষার নতুন অধ্যায় শুরু করতে চেয়েছিলেন। সিনায়াতের ভাষায়, তাদের অক্সফোর্ডযাত্রা শুধু দুজনের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার গল্প নয়; বরং একে অপরের স্বপ্নকে জায়গা দেওয়া এবং জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে পরস্পরকে সহযোগিতা করার গল্পও।
অক্সফোর্ডে পড়াশোনার সময় দুজনের ব্যস্ততা ছিল নিজ নিজ গবেষণা ও কাজ নিয়ে। আবিরের আগ্রহ ছিল জননীতি, অর্থনীতি ও উন্নয়ন নিয়ে। অন্যদিকে সিনায়াতের গবেষণার জগৎ ছিল ফার্মাকোলজি ও জীববিজ্ঞানকেন্দ্রিক।
তবু দিনের শেষে তারা নিজেদের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতেন। নতুন কোনো বিষয় শেখা, কঠিন চ্যালেঞ্জ, পড়াশোনার চাপ কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা—সবকিছু নিয়েই চলত তাদের আলোচনা।
তাদের সম্পর্কের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল, কেউ কাউকে নিজের পছন্দের পথে পরিচালিত করার চেষ্টা করেননি। বরং দুজন নিজেদের আলাদা পথকে স্বাধীনভাবে অনুসরণ করেও পাশাপাশি থাকার চেষ্টা করেছেন।
অক্সফোর্ডের অধ্যায় শেষ হওয়ার পর সিনায়াতের গবেষণার পথ তাকে নিয়ে যায় কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে। দেশে ফিরে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার সময় গবেষণার প্রতি তার আগ্রহ আরও গভীর হয়। পরে ইউসুফ জামিল বৃত্তি নিয়ে ফার্মাকোলজিতে পিএইচডি করেন তিনি।
সিনায়াতের গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল মানুষের শরীরের কোষে ক্যালসিয়াম কীভাবে সংকেত আদান-প্রদান করে। কোষের বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে এই সংকেতব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় সমস্যা হলে বিভিন্ন রোগের সঙ্গে এর সম্পর্ক তৈরি হতে পারে।
তার গবেষণার লক্ষ্য ছিল এমন নতুন অণু শনাক্ত করা, যা এই প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এবং ভবিষ্যতে ওষুধ তৈরির গবেষণায় কাজে লাগতে পারে।
অন্যদিকে আবিরের গবেষণার কেন্দ্রবিন্দু বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের রপ্তানি খাত। কীভাবে তৈরি পোশাকের মতো সীমিত কয়েকটি খাতের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নতুন শিল্প ও রপ্তানি খাত গড়ে তোলা যায় এবং দীর্ঘমেয়াদে প্রয়োজনীয় নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার করা সম্ভব—এসব বিষয় নিয়ে কাজ করছেন তিনি।
বর্তমানে আবির অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিপার্টমেন্ট অব ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্টে পিএইচডি গবেষণা করছেন। আর সিনায়াত অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত থেকে দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগের একটি আন্তর্জাতিক ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল ব্যবস্থাপনার কাজে যুক্ত আছেন।
দুজনের গবেষণার বিষয় একেবারেই আলাদা হলেও নিজেদের অভিজ্ঞতা তারা বাংলাদেশের শিক্ষার্থী ও তরুণ গবেষকদের কাজে লাগাতে চান। তাদের মতে, অক্সফোর্ড বা কেমব্রিজে পড়াশোনা অবশ্যই বড় অর্জন; কিন্তু এই পথচলার সবচেয়ে বড় শিক্ষা শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম নয়।
তরুণদের প্রতি তাদের বার্তা হলো—নিজের স্বপ্নকে গুরুত্ব দিতে হবে এবং তা বাস্তবায়নে ধৈর্য ও পরিশ্রম করতে হবে। প্রত্যাখ্যান এলে আবার চেষ্টা করতে হবে, নিজের সীমাবদ্ধতা মেনে নিয়েও নতুন কিছু শেখার চেষ্টা করতে হবে এবং নিজের পথকে অন্যের পথের সঙ্গে তুলনা করা উচিত নয়।
তাদের দৃষ্টিতে সাফল্য শুধু কোথায় পৌঁছানো হয়েছে, তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং সেই পথে কী শেখা হয়েছে এবং পরবর্তী সময়ে সেই শিক্ষা অন্যদের জন্য কীভাবে কাজে লাগানো যায়—সাফল্যের প্রকৃত মূল্য সেখানেই।
সূত্রঃ প্রথম আলো প্রতিবেদন
এম.কে

