বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সাম্প্রতিক কূটনৈতিক টানাপোড়েন কমিয়ে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগের মধ্যেই দিল্লির অভ্যন্তরীণ ভূমিকা নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠেছে। সম্পর্কের বরফ গলানোর কিছু উদ্যোগ ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভেতরে থাকা একটি শক্তিশালী গোষ্ঠীর বিরোধিতার কারণে বাধাগ্রস্ত হয়েছে—এমন ইঙ্গিত উঠে এসেছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর একটি প্রতিবেদনে।
দিল্লি ও ঢাকার কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের দূরত্ব কমাতে ভারতের নিযুক্ত হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী সক্রিয়ভাবে কাজ করছিলেন। এমনকি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের সম্ভাব্য তারিখ নির্ধারণের বিষয়েও অগ্রগতি হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়।
তবে সফরের সম্ভাব্য তারিখ প্রকাশ্যে আসার পর পরিস্থিতি বদলে যায় বলে দাবি করা হয়েছে। প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি অংশ এই উদ্যোগে অসন্তুষ্ট ছিল এবং পরবর্তী সময়ে সফর আয়োজনের প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা ছিল বলে কূটনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে।
প্রতিবেদনটিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সিদ্ধান্তে পেশাদার পররাষ্ট্রসেবা ক্যাডারের বাইরে গিয়ে দিনেশ ত্রিবেদীকে বাংলাদেশে হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। এ নিয়োগ ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কিছু কর্মকর্তার মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করেছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
এর মধ্যেই ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে হাইকমিশনারের সক্রিয়তার বিষয়টি আলোচনায় আসে। কূটনৈতিক পর্যায়ে দুই দেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের সফর ও যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা চলছিল বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের টানাপোড়েনের আরেকটি দিক হিসেবে শেখ হাসিনার দিল্লিতে ভার্চ্যুয়াল সংবাদ সম্মেলনের সুযোগ পাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবে আয়োজিত ওই ভার্চ্যুয়াল সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের কঠোর সমালোচনা করেন। বিষয়টি নিয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা ও অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
কারণ, এর আগে দিল্লি প্রেস ক্লাবে শেখ হাসিনার একটি নির্ধারিত সংবাদ সম্মেলন বাতিল করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে দুই ঘটনায় ভারতের নীতিগত অবস্থানের পার্থক্য নিয়েও কূটনৈতিক মহলে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
এরপর ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক একটি সেমিনারের আয়োজন করলে ভারত সরকার সেটি বাতিল করে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এমনকি সেমিনার ঠেকাতে পুলিশ দিয়ে ক্লাব এলাকা ঘিরে ফেলার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
একদিকে শেখ হাসিনাকে ভার্চ্যুয়াল অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ এবং অন্যদিকে আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট একটি সেমিনার বাতিল—এই দুই ঘটনায় ভারতের অভ্যন্তরে বাংলাদেশ নীতি নিয়ে মতপার্থক্যের সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের এই টানাপোড়েনের প্রভাব আঞ্চলিক ও বহুপক্ষীয় কূটনীতিতেও পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে দিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অংশগ্রহণের সম্ভাবনা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে সফর বা সম্মেলনে অংশগ্রহণের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কী হবে, তা নির্ভর করবে দুই দেশের কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর।
বাংলাদেশ প্রসঙ্গের পাশাপাশি দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর প্রতিবেদনে ভারতের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির বেশ কিছু দিক তুলে ধরা হয়েছে।
দিল্লিতে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ মোকাবিলায় পুলিশের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সমালোচনার মুখে পড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। জন্তর মন্তরে বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপের বিরোধিতা এবং প্রশাসনের ভেতরের মতপার্থক্যের বিষয়টিও এতে উঠে এসেছে।
মন্ত্রিসভা সচিব টি ভি সোমনাথন এবং স্বরাষ্ট্র সচিব গোবিন্দ মোহনের মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়টিকেও এই প্রশাসনিক পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত করে দেখানো হয়েছে প্রতিবেদনে।
দিল্লির অভিজাত ‘জিমখানা ক্লাব’ ঘিরে সরকারের পদক্ষেপও ভারতের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার কাঠামো নিয়ে বিতর্ক তৈরি করেছে। ঐতিহ্যবাহী এই ক্লাব খালি করার নোটিশকে কেন্দ্র করে বিজেপির আমলা ও সংসদ সদস্যদের মধ্যেও ভিন্নমত দেখা দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
ভারতের ক্ষমতাকেন্দ্রিক অভিজাত সংস্কৃতির প্রতীক হিসেবে পরিচিত ‘লুটিয়েন্স দিল্লি’ নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্কের সঙ্গে বিষয়টি নতুন করে যুক্ত হয়েছে।
প্রতিবেদনে ভারতের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী টাটা ট্রাস্টের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ভারসাম্য ও উত্তরসূরি প্রশ্নও উঠে এসেছে। ট্রাস্টিদের পার্সি ঐতিহ্য ও পরিচয় রক্ষার পুরোনো রীতিনীতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশেষ করে নোয়েল টাটার পারিবারিক পটভূমি এবং বিয়ের আগে পার্সি ধর্মীয় রীতি ‘নভজোত’ পালনের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।
সব মিলিয়ে, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের সাম্প্রতিক টানাপোড়েনকে শুধু দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় মতবিরোধ হিসেবে না দেখে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক সমীকরণের আলোতেও দেখার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী ইচ্ছাকৃতভাবে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করেছে—এমন দাবিকে এখনো অভিযোগ ও কূটনৈতিক সূত্রনির্ভর তথ্য হিসেবেই দেখা হচ্ছে; এ বিষয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
সূত্রঃ দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস
এম.কে

