9.9 C
London
October 22, 2026
TV3 BANGLA
মুক্তমত

বিশ্ব কি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে? ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি, অস্ত্র প্রতিযোগিতা ও নতুন বিশ্বব্যবস্থার বিপজ্জনক সমীকরণ

নাশীত রহমান              II      লন্ডন    II               ২১ অক্টোবর ২০২৬

 

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে বিশ্ব ছিল অর্থনৈতিকভাবে পরস্পর নির্ভরশীল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে দেখা দিয়েছিল অর্থনৈতিক সংকট, বাণিজ্যযুদ্ধ, উগ্র জাতীয়তাবাদ এবং সামরিক শক্তি প্রদর্শনের প্রতিযোগিতা। একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে সেই ঐতিহাসিক লক্ষণগুলোর অনেকগুলো আবার দৃশ্যমান। তবে এবার যুদ্ধের সমীকরণে যুক্ত হয়েছে পারমাণবিক অস্ত্র, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার যুদ্ধ, ড্রোন এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি। প্রশ্ন হচ্ছে—মানবসভ্যতা কি ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়েছে, নাকি নতুন প্রযুক্তি নিয়ে পুরোনো ভুলের পুনরাবৃত্তির দিকে এগোচ্ছে?

নরম্যান অ্যাঞ্জেলের ‘দ্য গ্রেট ইলিউশন’: যুদ্ধের অর্থনৈতিক অসারতা – ১৯১০ সালে ব্রিটিশ লেখক ও চিন্তাবিদ Norman Angell প্রকাশ করেন তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ The Great Illusion। গ্রন্থটি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, অর্থনৈতিক পারস্পরিক নির্ভরশীলতা এবং যুদ্ধের অর্থনৈতিক পরিণতি নিয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক বিতর্কের সূচনা করে। অ্যাঞ্জেলের মূল বক্তব্য ছিল, আধুনিক শিল্প ও বাণিজ্যনির্ভর বিশ্বে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র অন্য একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রকে সামরিকভাবে পরাজিত করলেও সেই বিজয় থেকে স্থায়ী অর্থনৈতিক লাভ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

কারণ আধুনিক রাষ্ট্রগুলোর অর্থনীতি পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত। এক দেশের শিল্প অন্য দেশের কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীল, ব্যাংকিং ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক ঋণ ও বিনিয়োগের সঙ্গে যুক্ত এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য রাষ্ট্রগুলোর সমৃদ্ধির অন্যতম ভিত্তি। ফলে দুটি অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী দেশের মধ্যে যুদ্ধ হলে বিজয়ী ও পরাজিত উভয় পক্ষই বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে। অ্যাঞ্জেলের যুক্তি ছিল না যে যুদ্ধ অসম্ভব; বরং আধুনিক অর্থনীতিতে সামরিক বিজয়কে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির নিশ্চয়তা মনে করা একটি বিপজ্জনক ভ্রান্ত ধারণা। ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে প্রমাণিত হয়, অর্থনৈতিক পারস্পরিক নির্ভরশীলতা যুদ্ধ ঠেকানোর জন্য যথেষ্ট নয়। যে ইউরোপ বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিল্পোৎপাদন ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নে বিশ্বকে নেতৃত্ব দিচ্ছিল, সেই ইউরোপই কয়েক বছরের মধ্যে ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়। এখানেই নরম্যান অ্যাঞ্জেলের তত্ত্ব আজও প্রাসঙ্গিক। অর্থনৈতিক যুক্তিতে যুদ্ধ ক্ষতিকর হলেও রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা, নিরাপত্তাহীনতা, জাতীয়তাবাদ ও সামরিক প্রতিযোগিতা রাষ্ট্রগুলোকে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ: অস্ত্র প্রতিযোগিতা, প্রতিদ্বন্দ্বী জোট এবং একটি ছোট ঘটনা – ১৯১৪ সালের প্রথম বিশ্বযুদ্ধ আকস্মিকভাবে সৃষ্টি হয়নি। তার পেছনে দীর্ঘদিন ধরে জমে ওঠা কয়েকটি কাঠামোগত সংকট কাজ করেছিল। প্রথমত, ইউরোপের প্রধান শক্তিগুলোর মধ্যে সামরিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা চলছিল। বিশেষ করে ব্রিটেন ও জার্মানির নৌবাহিনী সম্প্রসারণের প্রতিযোগিতা পারস্পরিক সন্দেহ এবং নিরাপত্তাহীনতা বাড়িয়ে দেয়। দ্বিতীয়ত, ইউরোপ ক্রমশ দুটি প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জোটে বিভক্ত হয়ে পড়ে। একদিকে জার্মানি ও অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির নেতৃত্বাধীন শক্তিগুলো, অন্যদিকে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও রাশিয়ার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা ট্রিপল আঁতাত।

তৃতীয়ত, বলকান অঞ্চলের জাতীয়তাবাদ, সাম্রাজ্যবাদী প্রতিযোগিতা এবং আঞ্চলিক সংঘাত বৃহৎ শক্তিগুলোর সম্পর্ককে জটিল করে তুলেছিল। ১৯১৪ সালের ২৮ জুন সারায়েভোতে অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির যুবরাজ আর্চডিউক ফ্রাঞ্জ ফার্ডিনান্ড হত্যাকাণ্ড সেই সংকটকে বিস্ফোরণের দিকে নিয়ে যায়। একটি আঞ্চলিক সংকট সামরিক জোট, যুদ্ধপরিকল্পনা, ভুল হিসাব এবং পরস্পরের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সন্দেহের কারণে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বিশ্বযুদ্ধে রূপ নেয়। এখান থেকে ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়—বড় যুদ্ধ সব সময় বড় কোনো ঘটনার মাধ্যমে শুরু হয় না। কখনো একটি সীমিত আঞ্চলিক সংঘাতও বৃহৎ শক্তিগুলোর সরাসরি যুদ্ধে পরিণত হতে পারে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ: অর্থনৈতিক বিপর্যয়, বাণিজ্যিক সুরক্ষাবাদ ও হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনার রাজনীতি – ১৯২৯ সালের মহামন্দা বিশ্ব অর্থনীতিকে গভীর সংকটে ফেলে। শিল্প উৎপাদন হ্রাস, ব্যাংক ব্যর্থতা, বেকারত্ব এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সংকোচন বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে দুর্বল করে দেয়। ১৯৩০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের স্মুট-হাওলি ট্যারিফ আইনসহ বিভিন্ন দেশের সুরক্ষাবাদী বাণিজ্যনীতি আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও জটিল করে তোলে। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণ শুধু শুল্কনীতি বা অর্থনৈতিক মন্দা ছিল না।

জার্মানিতে নাৎসিবাদের উত্থান, ইতালিতে ফ্যাসিবাদী সম্প্রসারণবাদ, জাপানের সাম্রাজ্যবাদী সামরিক অভিযান, ভার্সাই চুক্তি নিয়ে অসন্তোষ এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাব্যবস্থার ব্যর্থতা—সব মিলিয়ে যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। অ্যাডলফ হিটলার জার্মানির হারানো শক্তি, মর্যাদা ও ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারের প্রতিশ্রুতিকে রাজনৈতিক প্রচারের কেন্দ্রে নিয়ে আসেন। অন্যদিকে ইতালির বেনিতো মুসোলিনি প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যের গৌরবকে সম্প্রসারণবাদী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত করেন।

অর্থনৈতিক সংকট ও জাতীয় অপমানের অনুভূতি উগ্র জাতীয়তাবাদী প্রচারের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছিল। ১৯৩৯ সালের সেপ্টেম্বরে জার্মানির পোল্যান্ড আক্রমণের পর ব্রিটেন ও ফ্রান্স জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। ইতিহাসের এই অধ্যায় দেখায়, অর্থনৈতিক অসন্তোষ যখন আক্রমণাত্মক জাতীয়তাবাদ ও সামরিক সম্প্রসারণবাদের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন আন্তর্জাতিক শান্তি মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।

বর্তমান বিশ্বে অস্ত্র প্রতিযোগিতা: ইতিহাসের সর্বোচ্চ সামরিক ব্যয় – বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকগুলোর একটি হচ্ছে সামরিক ব্যয়ের ধারাবাহিক বৃদ্ধি। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (SIPRI) এপ্রিল ২০২৬-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বের মোট সামরিক ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ দশমিক ৮৯ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে। এটি সংস্থাটির নথিভুক্ত ইতিহাসে সর্বোচ্চ। টানা ১১ বছর ধরে বিশ্বে সামরিক বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৫ সালে বিশ্বব্যাপী সামরিক ব্যয় – ২.৮৯ ট্রিলিয়ন ডলার, ২০১৬–২০২৫ সময়ে প্রকৃত হিসাবে বৃদ্ধি ৪১%।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, রাষ্ট্রগুলো কেন এত বিপুল অর্থ অস্ত্রের পেছনে ব্যয় করছে? আন্তর্জাতিক সম্পর্কের তত্ত্বে এর একটি ব্যাখ্যা হলো Security Dilemma বা নিরাপত্তাজনিত দ্বিধা। একটি দেশ নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করলে প্রতিবেশী বা প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্র সেটিকে সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে দেখতে পারে। ফলে সেই রাষ্ট্রও সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করে। এভাবে আত্মরক্ষার উদ্দেশ্যে শুরু হওয়া সামরিক প্রস্তুতি শেষ পর্যন্ত পারস্পরিক অবিশ্বাস ও অস্ত্র প্রতিযোগিতাকে তীব্র করে তুলতে পারে। তবে সব সামরিক ব্যয়কে আক্রমণাত্মক যুদ্ধপ্রস্তুতি বলা যায় না। প্রতিরক্ষা আধুনিকীকরণ, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং বিদ্যমান হুমকি মোকাবিলাও সামরিক ব্যয় বৃদ্ধির কারণ হতে পারে।

প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিবলয়: বিশ্ব কি আবার দুই ভাগে বিভক্ত হচ্ছে? প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে ইউরোপ বিভক্ত হয়েছিল প্রতিদ্বন্দ্বী সামরিক জোটে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় গড়ে উঠেছিল অক্ষশক্তি ও মিত্রশক্তি। পরবর্তী স্নায়ুযুদ্ধে বিশ্ব বিভক্ত হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বাধীন দুটি প্রধান শক্তিবলয়ে। বর্তমান বিশ্বেও শক্তির নতুন মেরুকরণ দেখা যাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও তার ন্যাটো মিত্ররা ইউরোপীয় নিরাপত্তা, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে কৌশলগত উপস্থিতি এবং সামরিক সহযোগিতা জোরদার করছে। অন্যদিকে চীন ও রাশিয়ার মধ্যে কৌশলগত সহযোগিতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ইরান ও উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্কও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এ ছাড়া BRICS-এর মতো অর্থনৈতিক সহযোগিতা কাঠামোর সম্প্রসারণ পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের বিকল্প বা পরিপূরক ব্যবস্থার আলোচনা বাড়িয়েছে।

তবে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা প্রয়োজন: BRICS কোনো সামরিক জোট নয়, এবং বর্তমান বিশ্ব ১৯১৪ বা স্নায়ুযুদ্ধের মতো দুটি সুস্পষ্ট ও স্থায়ী শিবিরে বিভক্ত নয়। ভারতসহ বহু দেশ একই সঙ্গে বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বজায় রাখছে। তাই বর্তমান পরিস্থিতিকে দ্বিমেরু বিশ্বব্যবস্থার সরল প্রত্যাবর্তন না বলে প্রতিযোগিতামূলক বহুমেরুকরণ হিসেবে বিশ্লেষণ করা অধিক যথাযথ।

বাণিজ্যযুদ্ধ: অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা থেকে ভূরাজনৈতিক সংঘাত – একবিংশ শতাব্দীতে বাণিজ্য শুধু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নয়; এটি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা প্রয়োগের গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে শুল্ক, প্রযুক্তি রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ, সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন, গুরুত্বপূর্ণ খনিজসম্পদ এবং সরবরাহব্যবস্থা নিয়ে প্রতিযোগিতা তার অন্যতম উদাহরণ। বর্তমানে একটি রাষ্ট্র প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে পারে আমদানি শুল্ক, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, ব্যাংকিং ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার সীমিত করা কিংবা প্রযুক্তি সরবরাহ বন্ধ করার মাধ্যমে।

এর ফলে সামরিক যুদ্ধ শুরু না হলেও অর্থনৈতিক সংঘাতের মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ক গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তবে বাণিজ্যযুদ্ধ অনিবার্যভাবে সামরিক যুদ্ধে পরিণত হয়—এমন ঐতিহাসিক নিয়ম নেই। অর্থনৈতিক পারস্পরিক নির্ভরশীলতা কখনো সংঘাত কমানোর প্রণোদনা তৈরি করে, আবার গুরুত্বপূর্ণ পণ্য ও প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগও বাড়াতে পারে। নরম্যান অ্যাঞ্জেলের শতবর্ষ পুরোনো প্রশ্নটি তাই আবার সামনে এসেছে: অর্থনৈতিকভাবে পরস্পর নির্ভরশীল দুটি শক্তিশালী রাষ্ট্র কি রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে এমন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে, যাতে উভয়েরই বিপুল ক্ষতি হবে?

ছোট যুদ্ধ থেকে বড় যুদ্ধ: সবচেয়ে বিপজ্জনক সম্ভাবনা – ইতিহাসে বড় যুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো সংঘাতের বিস্তার বা Escalation। একটি স্থানীয় যুদ্ধের সঙ্গে যখন শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর সামরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ যুক্ত হয়, তখন সংঘাতের পরিধি বৃদ্ধি পাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ইউরোপীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা, ন্যাটোর প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা এবং রাশিয়া-পশ্চিমা সম্পর্ককে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।

তাইওয়ান প্রণালিতে উত্তেজনা যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের অন্যতম সংবেদনশীল বিষয়। সেখানে সংঘাত হলে বিশ্ব বাণিজ্য, সেমিকন্ডাক্টর সরবরাহ এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে আঞ্চলিক সংঘাতের বিস্তার জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন এবং বৃহৎ শক্তিগুলোর কৌশলগত স্বার্থের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। এসব সংঘাতের প্রত্যেকটির ইতিহাস, কারণ ও রাজনৈতিক বাস্তবতা আলাদা। তবু একটি সাধারণ ঝুঁকি রয়েছে: কোনো পক্ষ সংঘাতকে সীমিত রাখতে চাইলেও ভুল হিসাব, দুর্ঘটনা কিংবা মিত্ররাষ্ট্রের প্রতি অঙ্গীকারের কারণে তা বৃহত্তর যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। বিশেষত একটি পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রের সঙ্গে অন্য পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রের সরাসরি সংঘর্ষ শুরু হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

পারমাণবিক অস্ত্র: যুদ্ধ প্রতিরোধের নিশ্চয়তা, নাকি মানবসভ্যতার অস্তিত্বের হুমকি? ১৯১৪ ও ১৯৩৯ সালের তুলনায় বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় পার্থক্য পারমাণবিক অস্ত্রের উপস্থিতি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সরাসরি পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ এড়ানোর ক্ষেত্রে পারমাণবিক প্রতিরোধনীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে অনেক নিরাপত্তা বিশ্লেষক মনে করেন। এর ভিত্তি হচ্ছে Mutually Assured Destruction বা পারস্পরিক নিশ্চিত ধ্বংসের ধারণা।

অর্থাৎ দুটি পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র পূর্ণমাত্রার পারমাণবিক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে উভয় পক্ষই এমন বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে পারে, যেখানে সামরিক বিজয়ের প্রচলিত ধারণা অর্থহীন হয়ে পড়ে। কিন্তু পারমাণবিক অস্ত্রের উপস্থিতি সব ধরনের যুদ্ধ প্রতিরোধ করতে পারেনি। বরং সীমিত যুদ্ধ, পরোক্ষ যুদ্ধ এবং পারমাণবিক হুমকি ব্যবহার করে প্রতিপক্ষকে চাপ দেওয়ার ঘটনাও দেখা গেছে।

সাইবার যুদ্ধ, ড্রোন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: নতুন যুগের অদৃশ্য যুদ্ধক্ষেত্র – আগের বিশ্বযুদ্ধগুলোতে ট্যাংক, যুদ্ধজাহাজ, কামান ও যুদ্ধবিমান ছিল প্রধান সামরিক প্রযুক্তি। আধুনিক যুদ্ধে এসব অস্ত্রের পাশাপাশি নতুন মাত্রা যোগ করেছে ড্রোন, সাইবার সক্ষমতা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মহাকাশভিত্তিক প্রযুক্তি। ড্রোন যুদ্ধ: অপেক্ষাকৃত কম খরচে নজরদারি, লক্ষ্য শনাক্তকরণ এবং আক্রমণ পরিচালনার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। ফলে ছোট রাষ্ট্র বা অরাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীও নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের জন্য গুরুতর হুমকি তৈরি করতে পারে।

সাইবার যুদ্ধ: বিদ্যুৎ সরবরাহ, যোগাযোগব্যবস্থা, ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক, হাসপাতাল, পরিবহন এবং রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করা সম্ভব। অনেক ক্ষেত্রে আক্রমণের উৎস নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করাও কঠিন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: সামরিক গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ, লক্ষ্য শনাক্তকরণ, যুদ্ধক্ষেত্র পর্যবেক্ষণ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করতে পারে। তবে ভুল তথ্য, অ্যালগরিদমিক ত্রুটি ও অতিরিক্ত স্বয়ংক্রিয়তার কারণে সংঘাত অনিচ্ছাকৃতভাবে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

মহাকাশ ও স্যাটেলাইট: আধুনিক যোগাযোগ, জিপিএস, আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ এবং সামরিক নজরদারি উপগ্রহের ওপর নির্ভরশীল। স্যাটেলাইট ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হলে সামরিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি বেসামরিক জীবনও বিপর্যস্ত হতে পারে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটেছে। অতীতে যুদ্ধক্ষেত্র ছিল প্রধানত স্থল, সমুদ্র ও আকাশ। এখন যুদ্ধের প্রভাব একই সঙ্গে ডিজিটাল নেটওয়ার্ক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, তথ্যপ্রবাহ এবং মহাকাশেও বিস্তৃত হতে পারে।

আধুনিক বাণিজ্য ও প্রযুক্তি: যুদ্ধের বিরুদ্ধে নতুন প্রতিরোধব্যবস্থা – আধুনিক বিশ্বে যুদ্ধের ঝুঁকি বাড়ানোর উপাদান যেমন রয়েছে, তেমনি যুদ্ধ প্রতিরোধের কিছু শক্তিশালী ব্যবস্থাও বিদ্যমান। একটি স্মার্টফোন তৈরির জন্য বিভিন্ন দেশের প্রযুক্তি, খনিজ, সফটওয়্যার, উৎপাদন এবং পরিবহনব্যবস্থার প্রয়োজন হয়। একইভাবে গাড়ি, ওষুধ, খাদ্য, জ্বালানি ও যোগাযোগব্যবস্থা আন্তর্জাতিক সরবরাহশৃঙ্খলের ওপর নির্ভরশীল। বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যে যুদ্ধ শুরু হলে এসব ব্যবস্থায় ব্যাপক বিঘ্ন ঘটতে পারে।

এ ছাড়া জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক কূটনীতি, সামরিক যোগাযোগের হটলাইন, অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আলোচনা এবং সংকট ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও পদ্ধতি রাষ্ট্রগুলোকে সংঘাত নিয়ন্ত্রণের সুযোগ দেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দীর্ঘ সময় ধরে বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যে সরাসরি সর্বাত্মক যুদ্ধ না হওয়ার পেছনে এসব ব্যবস্থার ভূমিকা রয়েছে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করেন। অবশ্য এসব প্রতিষ্ঠান সব যুদ্ধ ঠেকাতে পারেনি। কোরীয় যুদ্ধ, ভিয়েতনাম যুদ্ধ, আফগানিস্তান, ইরাক এবং অন্যান্য সংঘাতে বিপুল প্রাণহানি ঘটেছে। সুতরাং যুদ্ধ প্রতিরোধের ব্যবস্থা রয়েছে বলেই বিশ্ব নিরাপদ—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না।

১৯১৪, ১৯৩৯ ও ২০২৬: ইতিহাসের তিনটি সন্ধিক্ষণ

বিষয় ১৯১৪ ১৯৩৯ ২০২৬
অস্ত্র প্রতিযোগিতা তীব্র নৌ ও স্থল প্রতিযোগিতা ব্যাপক পুনঃসামরিকীকরণ রেকর্ড সামরিক ব্যয়
শক্তিবলয় প্রতিদ্বন্দ্বী ইউরোপীয় জোট অক্ষশক্তি ও মিত্রশক্তি জটিল বহুমেরু প্রতিযোগিতা
অর্থনৈতিক অবস্থা উচ্চ বাণিজ্যিক সংযোগ মহামন্দার পরবর্তী সংকট পারস্পরিক নির্ভরতা ও বাণিজ্যিক দ্বন্দ্ব
জাতীয়তাবাদ সাম্রাজ্যবাদী প্রতিদ্বন্দ্বিতা ফ্যাসিবাদী সম্প্রসারণবাদ বিভিন্ন দেশে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির উত্থান
আঞ্চলিক সংঘাত বলকান সংকট ইউরোপ ও এশিয়ায় আগ্রাসন একাধিক অঞ্চলে যুদ্ধ ও উত্তেজনা
প্রযুক্তি মেশিনগান, যুদ্ধজাহাজ ট্যাংক, বিমান ড্রোন, সাইবার, AI, পারমাণবিক অস্ত্র
সংঘাত নিয়ন্ত্রণ সীমিত আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান লীগ অব নেশনসের ব্যর্থতা জাতিসংঘ, কূটনীতি ও পারমাণবিক প্রতিরোধ

এই তুলনায় অনেক সাদৃশ্য থাকলেও বর্তমান বিশ্বকে সরাসরি ১৯১৪ বা ১৯৩৯ সালের পুনরাবৃত্তি বলা ঐতিহাসিকভাবে সঠিক হবে না। প্রতিটি যুগের আন্তর্জাতিক ক্ষমতার কাঠামো, রাজনৈতিক আদর্শ এবং যুদ্ধ প্রতিরোধের ব্যবস্থা ভিন্ন।

বিশ্ব এখন কোন পর্যায়ে? ইতিহাসের আলোকে বর্তমান পরিস্থিতিকে তিনটি পৃথক স্তরে বিবেচনা করা যায়।

প্রথম স্তর হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত প্রতিযোগিতা। এর মধ্যে রয়েছে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি, প্রতিদ্বন্দ্বী জোটের সহযোগিতা, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা এবং প্রযুক্তিগত আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা।

দ্বিতীয় স্তর হচ্ছে আঞ্চলিক সংঘাতের আন্তর্জাতিকীকরণ। এখানে স্থানীয় যুদ্ধে বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি পায় এবং সংঘাত নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে ওঠে।

তৃতীয় স্তর হচ্ছে বৃহৎ শক্তিগুলোর সরাসরি সামরিক সংঘর্ষ, যা ব্যাপক আন্তর্জাতিক যুদ্ধে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করতে পারে।

বর্তমান বিশ্বে প্রথম স্তরের বহু বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক সংঘাতে দ্বিতীয় স্তরের ঝুঁকিও উপস্থিত। কিন্তু এসব লক্ষণ থেকে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ অনিবার্য—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ বজায় রাখা, ভুল বোঝাবুঝি প্রতিরোধ করা এবং আঞ্চলিক সংঘাতকে বৃহৎ শক্তিগুলোর সরাসরি যুদ্ধে পরিণত হতে না দেওয়া।

ইতিহাস কি আবার নিজেকে পুনরাবৃত্তি করবে? প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে ইউরোপের অনেক মানুষ বিশ্বাস করতেন, আধুনিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির যুগে দীর্ঘস্থায়ী বৃহৎ যুদ্ধ যুক্তিসংগত নয়। অথচ রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, সামরিক জোট এবং ভুল সিদ্ধান্ত সেই বিশ্বাসকে অকার্যকর করে দেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে অর্থনৈতিক বিপর্যয়, জাতীয়তাবাদী উন্মাদনা, সম্প্রসারণবাদ এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতা বিশ্বকে আরেকটি বিপর্যয়ের দিকে নিয়ে যায়।

বর্তমান বিশ্বেও অস্ত্র প্রতিযোগিতা, শক্তিবলয়ের মেরুকরণ, বাণিজ্যিক দ্বন্দ্ব এবং আঞ্চলিক যুদ্ধের বিস্তারের আশঙ্কা রয়েছে। তবে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি কোনো প্রাকৃতিক নিয়ম নয়। রাষ্ট্রনায়কদের সিদ্ধান্ত, কূটনৈতিক উদ্যোগ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং জনগণের রাজনৈতিক সচেতনতা সংঘাতের গতিপথ পরিবর্তন করতে পারে। নরম্যান অ্যাঞ্জেল এক শতাব্দীরও বেশি আগে যে অর্থনৈতিক সত্য তুলে ধরেছিলেন, তা আজ আরও গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক। আধুনিক বিশ্বে দুটি বৃহৎ শক্তির যুদ্ধ শুধু তাদের নিজেদের অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে না; এর অভিঘাত বিশ্বব্যাপী খাদ্য, জ্বালানি, অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও মানবনিরাপত্তায় ছড়িয়ে পড়তে পারে।

পারমাণবিক অস্ত্রের যুগে এই বিপর্যয়ের পরিণতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। মানবসভ্যতার সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই শুধু তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হবে কি না, তা নয়। বরং প্রশ্ন হচ্ছে—দুটি বিশ্বযুদ্ধের অভিজ্ঞতা, পারমাণবিক ধ্বংসের আশঙ্কা এবং আধুনিক অর্থনৈতিক পারস্পরিক নির্ভরশীলতা সত্ত্বেও রাষ্ট্রগুলো কি আবার এমন সিদ্ধান্ত নেবে, যার মূল্য দিতে হবে সমগ্র মানবজাতিকে? ইতিহাস আমাদের সতর্ক করতে পারে। কিন্তু ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে আজকের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে।

তথ্যসূত্র

 

আরো পড়ুন

ইসলামিক মর্গেজের মাধ্যমে প্রপার্টি ক্রয়

অনলাইন ডেস্ক

ল্যান্ডলর্ডদের জন্য লেভেলিং আপ

অনলাইন ডেস্ক

২০৩৫ সালের মধ্যে ওজন বেড়ে যাবে অর্ধেক বিশ্বের

নিউজ ডেস্ক