বিশ্বের শীর্ষ ধনী উদ্যোক্তা ইলন মাস্ক সাম্প্রতিক সময়ে নিজের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের তুলনায় যুক্তরাজ্যের রাজনীতি, অভিবাসন এবং জাতিগত ইস্যু নিয়েই বেশি সক্রিয় ছিলেন বলে এক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান-এর প্রকাশিত ওই বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে, মহাকাশ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির প্রস্তুতির গুরুত্বপূর্ণ সময়েও তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মূলত যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক ঘটনাবলি নিয়েই ধারাবাহিকভাবে মন্তব্য করেছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ৩১ মে থেকে ১২ জুন পর্যন্ত সময়ে ইলন মাস্ক জাতিগত সম্পর্ক ও অভিবাসনসংক্রান্ত বিষয়ে মোট ৩০৩টি পোস্ট, মন্তব্য ও পুনঃপ্রচার করেছেন। এর মধ্যে প্রায় তিন-চতুর্থাংশই ছিল যুক্তরাজ্যের রাজনীতি ও অভিবাসন ইস্যুকে কেন্দ্র করে। একই সময়ে নিজের মহাকাশ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে তার পোস্টের সংখ্যা ছিল মাত্র ১১৪টি।
বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে, ওই সময় যুক্তরাজ্যে একাধিক আলোচিত ঘটনা ঘটে। এক কিশোর হত্যাকাণ্ডের রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। একই সময়ে উত্তর আয়ারল্যান্ডের বেলফাস্টে ছুরিকাঘাতের একটি ঘটনাকে ঘিরে বিক্ষোভ ও সহিংসতা দেখা দেয়। এমন পরিস্থিতিতে দেশটির সরকার শান্ত থাকার আহ্বান জানালেও ইলন মাস্ক ধারাবাহিকভাবে এসব ঘটনা নিয়ে নিজের মতামত প্রকাশ এবং বিভিন্ন পোস্ট পুনঃপ্রচার করতে থাকেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঠিক একই সময়ে তার মহাকাশ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের জন্য ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যবসায়িক অধ্যায়। প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তিকে কেন্দ্র করে বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর প্রধান মনোযোগ ছিল যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক বিতর্কে।
বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির আগের রাতেও তিনি যুক্তরাজ্যের কট্টর ডানপন্থী রাজনৈতিক নেতা রুপার্ট লোর একটি বক্তব্য পুনঃপ্রচার করেন। সেখানে অভিবাসন নীতি কঠোর করার আহ্বান জানানো হয়। একই দিনে তিনি বহুসংস্কৃতিবাদ, পশ্চিমা সমাজের ভবিষ্যৎ এবং অভিবাসন নীতিসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে একাধিক মন্তব্য করেন।
এক পর্যায়ে এক ব্যবহারকারী প্রশ্ন তুলেছিলেন, বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি কেন ব্যক্তিগত জীবন উপভোগ না করে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিতর্কে এত সময় ব্যয় করছেন। এর জবাবে ইলন মাস্ক লিখেছিলেন, ‘সভ্যতা ধ্বংস হয়ে গেলে আর কিছুই গুরুত্বপূর্ণ থাকবে না।’
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, আলোচিত হত্যাকাণ্ড নিয়ে তিনি অল্প সময়ের ব্যবধানে একাধিক পোস্ট করেন এবং বিভিন্ন দেশের ব্যবহারকারীদের প্রকাশিত বিষয়বস্তুও পুনঃপ্রচার করেন। এসব পোস্টের অনেকগুলোই কোটি কোটি মানুষের কাছে পৌঁছায়।
এছাড়া কট্টর ডানপন্থী কর্মী টমি রবিনসনের প্রতিও ইলন মাস্কের প্রকাশ্য সমর্থনের বিষয়টি প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। গত বছর লন্ডনে অনুষ্ঠিত এক সমাবেশে ভার্চুয়ালি অংশ নিয়ে তার দেওয়া বক্তব্য নিয়ে ব্রিটিশ সরকারের সমালোচনার মুখেও পড়তে হয়েছিল তাকে।
বিশ্লেষণে আরও দেখা গেছে, গত দুই বছরে যুক্তরাজ্যের রাজনীতি, জাতিগত সম্পর্ক ও অভিবাসন ইস্যুতে ইলন মাস্কের আগ্রহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৪ সালের গ্রীষ্মে সংঘটিত দাঙ্গার সময় তার পোস্টের খুব অল্প অংশ এসব বিষয় নিয়ে হলেও চলতি বছরের পর্যবেক্ষণকালে সেই হার কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের আন্তর্জাতিক বৈষম্যবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষক মাইকেল ভনের মতে, বিপুল অর্থনৈতিক প্রভাব ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক অনুসারী থাকার কারণে ইলন মাস্কের বক্তব্য ইউরোপের গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলছে। তার ভাষ্য, আগে প্রান্তিক হিসেবে বিবেচিত কিছু গোষ্ঠী ও ব্যক্তি মাস্কের সমর্থনের ফলে নতুন ধরনের গ্রহণযোগ্যতা ও প্রচারের সুযোগ পাচ্ছেন।
এদিকে ডিজিটাল ঘৃণাবিরোধী একটি গবেষণা সংস্থার প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, বেলফাস্টের ঘটনার পর ইলন মাস্কের পোস্টের জবাবে শত শত সহিংসতামূলক মন্তব্য প্রকাশিত হয়। একই সঙ্গে তার পুনঃপ্রচার ও সমর্থনের কারণে কট্টর ডানপন্থী নেতাদের পোস্ট কোটি কোটি অতিরিক্ত মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।
সব মিলিয়ে দ্য গার্ডিয়ান-এর এই বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে, বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী ধনী ব্যক্তি ইলন মাস্ক ক্রমেই যুক্তরাজ্যের রাজনীতি, অভিবাসন ও জাতিগত বিতর্কে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন। তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কার্যক্রম শুধু অনলাইন আলোচনাকেই প্রভাবিত করছে না, বরং জনমত ও রাজনৈতিক পরিবেশেও উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলছে বলে প্রতিবেদনে অভিমত প্রকাশ করা হয়েছে।
সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান
এম.কে

