TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

ব্রিটেনের প্রথম দিকের মসজিদ প্রতিষ্ঠাতা খ্রিস্টান পরিবারের এক আইনজীবী

ব্রিটেনে ইসলামের প্রচার ও মুসলিম সম্প্রদায়ের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন উইলিয়াম হেনরি কুইলিয়াম, যিনি পরবর্তী সময়ে শেখ আবদুল্লাহ কুইলিয়াম নামে পরিচিতি লাভ করেন। একজন ব্রিটিশ আইনজীবী, লেখক ও ইসলামি পণ্ডিত হিসেবে তিনি উনিশ শতকে ব্রিটিশ সমাজে ইসলাম পরিচিত করার পাশাপাশি দেশটিতে প্রাতিষ্ঠানিক মুসলিম সম্প্রদায় গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।

 

১৮৫৬ সালের ১০ এপ্রিল ইংল্যান্ডের লিভারপুলে জন্মগ্রহণ করেন কুইলিয়াম। খ্রিস্টান মেথডিস্ট পরিবারে বেড়ে ওঠা কুইলিয়াম ১৮৮০-এর দশকে মরক্কো ভ্রমণের সময় ইসলামের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। পরবর্তী সময়ে ইসলাম সম্পর্কে বিস্তারিত পড়াশোনা ও ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণের পর ১৮৮৭ সালে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং আবদুল্লাহ নাম ধারণ করেন।

ইসলাম গ্রহণের পর লিভারপুলে ফিরে তিনি ব্রিটিশ সমাজে ইসলাম সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির উদ্যোগ নেন। বিভিন্ন স্থানে প্রকাশ্য বক্তৃতা, শিক্ষামূলক কার্যক্রম এবং ধর্মীয় প্রকাশনার মাধ্যমে ইসলাম প্রচার শুরু করেন। তার প্রচেষ্টায় ব্রিটেনজুড়ে প্রায় ৬০০ মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। তবে গবেষকদের মতে, ইসলাম গ্রহণকারীর প্রকৃত সংখ্যা নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা কঠিন।

১৮৮৯ সালে লিভারপুলের ৮ ব্রোগাম টেরেসে তিনি ব্রিটেনের প্রাচীনতম নথিভুক্ত মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন। এটি দেশটির ক্রমবর্ধমান মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য স্থায়ী উপাসনালয়ে পরিণত হয়। মসজিদটি পরবর্তী সময়ে লিভারপুল মুসলিম ইনস্টিটিউটের অংশ হয়ে ওঠে।

ইনস্টিটিউটটি কেবল ধর্মীয় কার্যক্রমের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। সেখানে একটি স্কুল, এতিমখানা, পাঠাগার, বক্তৃতা কেন্দ্র, ছাপাখানা এবং বিজ্ঞান গবেষণাগারও প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। মুসলিমদের পাশাপাশি অমুসলিমদের জন্যও প্রতিষ্ঠানটির দরজা খোলা ছিল। ভিক্টোরীয় যুগে শিক্ষা ও সামাজিক সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রেও প্রতিষ্ঠানটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

কুইলিয়াম ‘দ্য ক্রিসেন্ট’ নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করতেন। এতে বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম সম্প্রদায়, ইসলামি ধর্মীয় বিষয় এবং মুসলিম বিশ্বের নানা ঘটনা তুলে ধরা হতো। এর মাধ্যমে ব্রিটেনের পাঠকদের কাছে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিসরেও মুসলিম বিষয়াবলি তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়।

ইসলামের প্রচার ও মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য তার অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৮৯৪ সালে উসমানীয় সাম্রাজ্যের সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদ তাকে ‘ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জের শেখ-উল-ইসলাম’ উপাধিতে ভূষিত করেন।

তবে ভিক্টোরীয় ব্রিটিশ সমাজে তার কর্মকাণ্ড নানা বিরোধিতা ও প্রতিকূলতার মুখে পড়ে। ১৯০৮ সালে তিনি লিভারপুল ছেড়ে চলে যান। পরবর্তী সময়ে হারুন মুস্তাফা লিওন নাম ব্যবহার করে আবার ব্রিটেনে ফিরে আসেন। ১৯৩২ সালের ২৩ এপ্রিল লন্ডনে তার মৃত্যু হয়।

বর্তমানে লিভারপুলে পুনরুদ্ধার করা আবদুল্লাহ কুইলিয়াম মসজিদ ও ন্যাশনাল হেরিটেজ সেন্টারের মাধ্যমে তার ঐতিহাসিক অবদান স্মরণ করা হয়। ব্রিটেনে ইসলামের প্রাথমিক বিকাশ, মুসলিমদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং ধর্মীয় ও সামাজিক শিক্ষার প্রসারে তার ভূমিকা দেশটির মুসলিম ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত।

সূত্রঃ ব্রিটিশ লাইব্রেরি, হিস্টোরিক ইংল্যান্ড, ইউনিভার্সিটি অব ম্যানচেস্টারের গবেষণা এবং আবদুল্লাহ কুইলিয়াম সোসাইটির প্রকাশিত তথ্য।

এমকে

আরো পড়ুন

যুক্তরাজ্যে একা বাড়িতে হার্ট অ্যাটাকে বাবার মৃত্যু, ক্ষুধায় মারা গেল ২ বছরের শিশু

ব্রিটেনের এসাইলাম সেন্টারে উপচে পড়া ভীড়ঃ মিথ্যা পরিচয়ে ব্রিটেনে ঢুকছে হাজারো মানুষ

অবৈধভাবে প্রবেশকারীদের আটক ও ব্যান করার কথা ভাবছে যুক্তরাজ্য