TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

ব্রিটেনে ‘অতিরিক্ত ওষুধ প্রেসক্রাইবের মহামারি’, প্রতিদিন জরুরি বিভাগে ছুটছেন ১,০০০ প্রবীণ

যুক্তরাজ্যে অতিরিক্ত ওষুধ প্রেসক্রাইব ও সেবন নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দেশটির প্রায় ৮০ লাখ মানুষ প্রতিদিন পাঁচ বা তার বেশি প্রেসক্রিপশন ওষুধ গ্রহণ করছেন। চিকিৎসকদের মতে, একাধিক ওষুধ একসঙ্গে ব্যবহারের এই প্রবণতা বিশেষ করে প্রবীণদের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করছে এবং প্রতিদিন প্রায় ১,০০০ বয়স্ক মানুষ ওষুধের বিরূপ প্রতিক্রিয়ার কারণে জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন নিয়ে হাসপাতালে যাচ্ছেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্যে প্রায় ২২ লাখ মানুষ প্রতিদিন ১০টি বা তার বেশি ওষুধ সেবন করছেন। একই সময়ে একাধিক ওষুধ ব্যবহারের এই অবস্থাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘পলিফার্মাসি’ বলা হয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে শরীরের ওষুধ প্রক্রিয়াজাত করার ক্ষমতা পরিবর্তিত হওয়ায় একাধিক ওষুধের পারস্পরিক প্রতিক্রিয়া থেকে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি আরও বেড়ে যেতে পারে।

গবেষণার বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, অতিরিক্ত ওষুধ ব্যবহারের কারণে ব্রিটেনের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা এনএইচএসের ওপর বছরে আনুমানিক ২২১ কোটি পাউন্ডের আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে। ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নালে প্রকাশিত গবেষণাগুলোতে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, ওষুধ-সম্পর্কিত হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের একটি বড় অংশ যথাযথ পর্যালোচনা ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে হাসপাতালে যাওয়া থেকে রক্ষা করা সম্ভব ছিল।

পরিস্থিতির একটি উদাহরণ হিসেবে উঠে এসেছে ইস্ট ইয়র্কশায়ারের ৯৬ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত মুদ্রণকর্মী পিটার ইউস্টেসের ঘটনা। প্রোস্টেট ক্যানসারের চিকিৎসায় ২০০১ সালে তার পুরো প্রোস্টেট অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে অপসারণ করা হলেও এরপরও দীর্ঘদিন তিনি প্রোস্টেট বড় হওয়ার উপসর্গের জন্য ট্যামসুলোসিন সেবন করে আসছিলেন।

গত জুলাইয়ে জেরিয়াট্রিশিয়ান বা প্রবীণ রোগীদের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ড্যানিয়েল হারম্যান তার ওষুধের তালিকা পর্যালোচনা করে চারটি অপ্রয়োজনীয় ওষুধ শনাক্ত করেন। এর মধ্যে ছিল স্ট্যাটিন এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের ওষুধ রামিপ্রিল। চিকিৎসকের আশঙ্কা ছিল, রামিপ্রিল তার বারবার পড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ হতে পারে।

ইউস্টেসের মেয়ে হিদার ক্রসবি জানান, তিনি তার বাবার প্রোস্টেটের ওষুধ নিয়ে জিপি সার্জারিতে প্রশ্ন তুলেছিলেন। কিন্তু তাকে জানানো হয়েছিল, ওষুধটি এখনও প্রয়োজনীয়। তার অভিযোগ, বছরের পর বছর একই প্রেসক্রিপশন অনুমোদন করা হলেও ওষুধগুলোর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কিংবা সেগুলো আদৌ প্রয়োজনীয় কি না, তা যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে পর্যালোচনা করা হয়নি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যাটির একটি বড় কারণ এনএইচএসের চিকিৎসাব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা। একজন রোগী একই সঙ্গে একাধিক শারীরিক সমস্যার চিকিৎসা নিলে হাসপাতাল, কেয়ার হোম ও জিপি সার্জারির মধ্যে যথেষ্ট সমন্বয় না থাকায় সময়ের সঙ্গে প্রেসক্রিপশনে নতুন নতুন ওষুধ যোগ হতে পারে।

আরেকটি উদ্বেগের বিষয় হলো, একটি ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াকে কখনো কখনো নতুন কোনো রোগের লক্ষণ হিসেবে ভুলভাবে চিহ্নিত করা হয়। এরপর সেই কথিত নতুন রোগের জন্য আরেকটি ওষুধ দেওয়া হয়। ফলে রোগীর ওষুধের সংখ্যা আরও বাড়তে থাকে এবং একটি জটিল চক্র তৈরি হয়।

কিছু ক্ষেত্রে একাধিক ওষুধের পারস্পরিক প্রতিক্রিয়ার ফলে বিভ্রান্তি, অকারণে পড়ে যাওয়া, হাঁটাচলায় সমস্যা কিংবা ডিমেনশিয়ার মতো উপসর্গও দেখা দিতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রবীণ ও শারীরিকভাবে দুর্বল ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এ ধরনের প্রতিক্রিয়া বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ।

ইংল্যান্ডে প্রবীণ রোগীদের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ঘাটতিও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। দেশটিতে বর্তমানে প্রায় ১,৬০০ জন জেরিয়াট্রিশিয়ান রয়েছেন, যা প্রয়োজনের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। ফলে জটিল ওষুধ ব্যবস্থাপনার বড় দায়িত্ব জিপি চিকিৎসকদের ওপর পড়ছে।

চিকিৎসা শিক্ষাতেও এ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। মেডিকেল শিক্ষার্থীরা পাঁচ বছরের ডিগ্রি চলাকালে বার্ধক্যজনিত চিকিৎসা বিষয়ে তুলনামূলকভাবে অল্প সময় প্রশিক্ষণ পান। ফলে প্রবীণ রোগীদের একাধিক ওষুধের প্রয়োজনীয়তা ও ঝুঁকি মূল্যায়নে আরও বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

এদিকে অপ্রয়োজনীয় ওষুধ প্রেসক্রাইব কমানোর লক্ষ্যে এনএইচএসের একটি ৭ লাখ ৫০ হাজার পাউন্ডের প্রশিক্ষণ কর্মসূচি বাতিল হওয়ায়ও প্রশ্ন উঠেছে। একই সময়ে চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা প্রবীণ রোগীদের নিয়মিত ওষুধ পর্যালোচনা আরও জোরদার করার দাবি জানিয়েছেন।

ব্রিটিশ জেরিয়াট্রিক্স সোসাইটির সভাপতি জাগদীপ ধেসিসহ একাধিক জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক রোগীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, অতিরিক্ত ওষুধ ব্যবহারের ঝুঁকি নিয়ে পর্যাপ্ত তথ্য ও প্রমাণ থাকার পরও স্বাস্থ্যব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন যথেষ্ট দ্রুত হচ্ছে না।

ধেসি চিকিৎসা শিক্ষা ও প্রবীণদের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়েছেন। তার মতে, ব্রিটেনের ক্রমবর্ধমান বয়স্ক জনগোষ্ঠীর প্রয়োজন মেটাতে চিকিৎসা ও সামাজিক সেবা ব্যবস্থাকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে।

তবে এনএইচএস কর্তৃপক্ষ বলছে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইতোমধ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এনএইচএসের একজন মুখপাত্র জানান, অনুপযুক্ত ওষুধ প্রেসক্রাইব কমানোর বিষয়ে ১,৪০০-এর বেশি জিপি ও ফার্মাসিস্টকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে এবং প্রতিটি স্থানীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থায় এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ ও নির্দেশনা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।

এনএইচএস আরও জানিয়েছে, প্রবীণ ও শারীরিকভাবে দুর্বল রোগীদের জন্য নিয়মিত ওষুধ পর্যালোচনা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে, যাতে চিকিৎসাগতভাবে প্রয়োজনীয় ও উপযুক্ত ওষুধই কেবল চালু রাখা হয়।

আগামী জানুয়ারিতে প্রবীণ ও শারীরিকভাবে দুর্বল রোগীদের চিকিৎসা নিয়ে একটি নতুন জাতীয় পরিকল্পনা প্রকাশের প্রত্যাশা করা হচ্ছে। এতে প্রেসক্রিপশন ওষুধ ব্যবস্থাপনার মানদণ্ডসহ বিভিন্ন বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকার কথা রয়েছে।

সূত্রঃ জিবি নিউজ

এম.কে

আরো পড়ুন

ব্রিটেনে স্কুলপথে নিরাপত্তা বাড়াতে নতুন উদ্যোগ, ২৫০ প্রতিষ্ঠানে কার্যক্রম শুরু

জেনে নিন যুক্তরাজ্যের মেরিট স্কলারশিপ সম্পর্কে

নিউজ ডেস্ক

বরিস জনসনের ব্যক্তিগত ফোন নাম্বার ১৫ বছর ধরে অনলাইনে