ব্রিটেনে কোভিড-১৯ মহামারির সময় বৃদ্ধাশ্রমের বাসিন্দাদের হাসপাতাল থেকে করোনা পরীক্ষার ফল ছাড়াই ফিরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তের কারণে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল। একই সময়ে স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়ার নীতিতে বয়স্ক ও অসুস্থ বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র মানসিক যন্ত্রণা, নিঃসঙ্গতা ও ভয়ের সৃষ্টি হয়। মহামারি মোকাবিলায় সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রকাশিত জনস্বাস্থ্য তদন্তের সর্বশেষ প্রতিবেদনে এসব ব্যর্থতার কথা উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মহামারির পরিকল্পনায় পুরো পরিচর্যা খাতকে কার্যত উপেক্ষা করা হয়েছিল। তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী ম্যাট হ্যানককের বৃদ্ধাশ্রমের বাসিন্দাদের সুরক্ষায় ‘সুরক্ষাবলয়’ গড়ে তোলার দাবি বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। বরং করোনা পরীক্ষা ছাড়াই হাসপাতাল থেকে রোগীদের বৃদ্ধাশ্রমে পাঠানোর ফলে সেখানে সংক্রমণ দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। পাশাপাশি বাইরের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের ওপর ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা বাসিন্দাদের মধ্যে গভীর বিচ্ছিন্নতা ও মানসিক ক্ষতির কারণ হয়।
মিল্টন কেইনসে বসবাসকারী ৩৯ বছর বয়সী অ্যামি জানিয়েছেন, তার মাতামহী ইভা ও মাতামহ এরিক ৬০ বছরেরও বেশি সময় বিবাহিত জীবন কাটিয়েছিলেন। কিন্তু ইভার ডিমেনশিয়া এবং এরিকের শারীরিক দুর্বলতা বেড়ে যাওয়ায় তাদের আলাদা দুটি বৃদ্ধাশ্রমে থাকতে হয়। ২০২০ সালের মার্চে প্রথম লকডাউন ঘোষণার পর তারা কার্যত একে অপরের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। নানার সঙ্গে ফোনে কথা বলার সুযোগও নিয়মিত পাওয়া যেত না, কারণ কর্মীদের পক্ষে সব সময় তার কাছে ফোন পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হতো না।
অ্যামি বলেন, তার নানা ঘরের মধ্যে একাকী থাকতেন এবং করোনা সংক্রমণের আশঙ্কায় অন্যদের সঙ্গে কথা বলতে পারতেন না। শুরুতে তিনি মনে করেছিলেন, প্রিয়জনদের নিরাপদ রাখার জন্য এই বিচ্ছিন্নতা প্রয়োজনীয়। কিন্তু তার নানা দীর্ঘদিন বিষণ্নতা ও ভয়ের মধ্যে ছিলেন। ২০২২ সালে করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় অ্যামি প্রথমবার তার সঙ্গে দেখা করতে পারেন। নানাকে দেখতে হাসপাতালে প্রবেশের অনুমতি পেতে তাকে বারবার অনুরোধ করতে হয়েছিল। এর কিছুদিন পরই এরিক মারা যান।
সর্বশেষ তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পর অ্যামি মনে করেন, বৃদ্ধাশ্রমের বাসিন্দাদের এভাবে বিচ্ছিন্ন করে রাখা ছিল নিষ্ঠুর ও অর্থহীন। তিনি বলেন, সেই সময়ের হারানো মুহূর্তগুলো আর কখনো ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়। তখন তার ধারণা ছিল, সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। কিন্তু তদন্তের তথ্য থেকে তার মনে হয়েছে, সরকার বাস্তব পরিস্থিতির ভয়াবহতা যথাযথভাবে বুঝতে পারেনি।
রজার ডেনিসনের বাবা লুসিয়াসও মহামারির প্রথম দিকে বৃদ্ধাশ্রমে থাকতেন। তখন তার বয়স ছিল ৯০ বছর। করোনার খবর তারা একসঙ্গে দেখতেন এবং আশা করতেন, পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে আসবে। কিন্তু কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বৃদ্ধাশ্রমে কঠোর বিধিনিষেধ চালু হয়। বাবার সঙ্গে কথা বলার জন্য রজারকে জানালার সামান্য খোলা অংশ দিয়ে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে কথা বলতে হতো। অভিজ্ঞতাটি এতটাই কষ্টদায়ক ছিল যে তারা একবারের পর আর এভাবে কথা বলার চেষ্টা করেননি।
আগে রজার প্রায় এক দিন পরপর বাবাকে দেখতে যেতেন। বিধিনিষেধের কারণে পরে তাকে কর্মীদের মাধ্যমে বার্তা পাঠাতে হতো। লুসিয়াস বেশির ভাগ সময় নিজের ঘরে একা থাকতেন। বৃদ্ধাশ্রমে করোনা সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার পর তিনি আক্রান্ত হন এবং ২০২০ সালের এপ্রিলে হাসপাতালে মারা যান।
ওয়েস্ট ইয়র্কশায়ারের একটি বৃদ্ধাশ্রমে কর্মরত সাবেক জ্যেষ্ঠ পরিচর্যাকর্মী নিক—যার প্রকৃত নাম প্রকাশ করা হয়নি—জানিয়েছেন, ওই সময় কর্মীরাও চরম আতঙ্ক ও মানসিক চাপের মধ্যে ছিলেন। তার কর্মস্থলের একটি বাসিন্দাকে করোনা রোগীদের সঙ্গে একই ওয়ার্ডে থাকার পর হাসপাতাল থেকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সংক্রমণের ঝুঁকির কথা জানিয়ে বৃদ্ধাশ্রম কর্তৃপক্ষ তাকে ফিরিয়ে নিতে আপত্তি করলেও হাসপাতাল থেকে জানানো হয়, তাদের তা প্রত্যাখ্যান করার সুযোগ নেই।
নিকের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই ঘটনার প্রায় এক সপ্তাহ পর বৃদ্ধাশ্রমে প্রথম করোনা সংক্রমণ শনাক্ত হয়। তত দিনে ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রীর মজুতও শেষ হয়ে গিয়েছিল। অল্প সময়ের মধ্যে একের পর এক বাসিন্দার মৃত্যু প্রত্যক্ষ করা, প্রিয় হয়ে ওঠা মানুষদের বিদায় জানানো এবং নিজেদের পরিবারের কাছে সংক্রমণ নিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা কর্মীদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে।
ইস্ট সাসেক্সের লুইস এলাকার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ক্যাথরিন বেনেট জানিয়েছেন, তার বাবা ২০১৮ সাল থেকে বৃদ্ধাশ্রমে থাকতেন। মহামারির সময় কাউকে দেখতে না পেয়ে তিনি নিজেকে পরিত্যক্ত মনে করতেন এবং করোনা আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। একসময় তিনি খাবার খেতে নিচে যাওয়া ও বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশ নেওয়া বন্ধ করে দেন, যাতে অন্য কারও সংস্পর্শে আসতে না হয়।
কয়েক মাস পর বৃদ্ধাশ্রম কর্তৃপক্ষ কাচের দেয়াল ও স্পিকারের মাধ্যমে স্বজনদের সঙ্গে কথা বলার ব্যবস্থা করে। কিন্তু ক্যাথরিনের মতে, কাচের ওপাশে স্বজনদের দেখতে পাওয়া সত্ত্বেও তাদের স্পর্শ করতে না পারা বা স্বাভাবিকভাবে মেলামেশা করতে না পারা তার বাবার জন্য ছিল অত্যন্ত কষ্টদায়ক। ২০২২ সালে বৃদ্ধাশ্রমেই তার বাবা মারা যান।
ডার্বির অবসরপ্রাপ্ত সমাজকর্মী ডায়ানার বোন হেলেন মানসিক স্বাস্থ্যগত প্রয়োজনের কারণে কার্লাইলের একটি বৃদ্ধাশ্রমে থাকতেন। মহামারি শুরু হলে তিনিও দীর্ঘ সময় স্বজনদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। প্রায় এক বছর পর হেলেন গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে ডায়ানা প্রথমবার তার পাশে বসার সুযোগ পান। সেদিনই হেলেন মারা যান।
ডায়ানা বলেন, মহামারির সময় বৃদ্ধাশ্রমগুলোকে কার্যত অসহায় অবস্থায় ফেলে রাখা হয়েছিল। তার মতে, এটি ব্রিটেনের জন্য একটি বড় ধরনের জাতীয় ট্রমা, যা কখনো ভুলে যাওয়া উচিত নয়।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত প্রতিবেদনে কোভিড মহামারির সময় বৃদ্ধাশ্রমের বাসিন্দা, তাদের স্বজন ও পরিচর্যাকর্মীদের এসব অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছে। এর আগে প্রকাশিত তদন্তের ফলাফলেও সরকারি পরিকল্পনার ব্যর্থতা, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে ঘাটতি এবং বাসিন্দাদের ওপর কঠোর বিচ্ছিন্নতার মানসিক প্রভাবের বিষয়গুলো উঠে আসে।
সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান
এমকে

