ব্রিটেনে মুসলিম উপাসনালয় ও সংশ্লিষ্ট কমিউনিটি স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তায় সরকারি অর্থায়ন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সাউথপোর্টে তিন শিশু নিহত হওয়ার ছুরি হামলার পর দেশজুড়ে সহিংস বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ার প্রেক্ষাপটে মসজিদগুলোর নিরাপত্তায় জরুরি তহবিল হিসেবে রেকর্ড ৬ কোটি ৬০ লাখ পাউন্ড দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান।
দ্য গার্ডিয়ানের হাতে পাওয়া সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে সহিংস বিশৃঙ্খলার সময় হোম অফিসের জরুরি নিরাপত্তা প্রকল্প থেকে যুক্তরাজ্যের মসজিদ ও সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোকে প্রায় ৬ কোটি ৬০ লাখ পাউন্ড দেওয়া হয়। একই প্রকল্পের আওতায় দেশটির বিভিন্ন উপাসনালয়ের জন্য মোট বরাদ্দ ছিল প্রায় ৬ কোটি ৯০ লাখ পাউন্ড।
এদিকে ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত এক বছরে মসজিদ, ইসলামি স্কুল ও সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তার জন্য আরও প্রায় ৪ কোটি ১০ লাখ পাউন্ড দেওয়া হয়েছে। এটিও সরকারি নিরাপত্তা তহবিলের আওতায় রেকর্ড পরিমাণ অর্থায়ন।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে মসজিদ, ইসলামি স্কুল ও সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তায় বরাদ্দ ছিল মাত্র ৭৩ হাজার ১৪৭ পাউন্ড। ২০২২-২৩ সালে তা বেড়ে প্রায় ৩০ লাখ পাউন্ড হয়। ২০২৪-২৫ সালে বরাদ্দ দাঁড়ায় প্রায় ২ কোটি ৯০ লাখ পাউন্ড এবং ২০২৫-২৬ সালে তা বেড়ে প্রায় ৪ কোটি ১০ লাখ পাউন্ডে পৌঁছায়।
ব্রিটিশ মুসলিম ট্রাস্টের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আকিলা আহমেদ বলেন, এই পরিসংখ্যান ব্রিটেনে মুসলিমদের মধ্যে বাড়তে থাকা শত্রুতার একটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরছে।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, মসজিদগুলোর ওপর হামলা বাড়ার সরাসরি প্রতিক্রিয়া হিসেবে নিরাপত্তার প্রয়োজনও বাড়ছে। মুসলিম সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যয় কমাতে হলে নিরাপত্তার প্রয়োজন কমানো এবং মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঘৃণার মূল কারণগুলো মোকাবিলা করা প্রয়োজন।
জুলাইয়ে ব্রিটিশ মুসলিম ট্রাস্ট প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে ব্রিটেনে গড়ে প্রতি পাঁচ দিনে একটি করে মসজিদ হামলার শিকার হয়েছে।
মসজিদ ও অন্যান্য উপাসনালয়ের নিরাপত্তার জন্য ব্রিটেন সরকার ২০১৬ সালে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে একটি নিরাপত্তা প্রকল্প চালু করে। পরে ২০২৩ সালে মসজিদ ও ইসলামি স্কুলগুলোর জন্য আলাদা নিরাপত্তা প্রকল্প চালু করা হয়, যার মূল্য ছিল ২ কোটি ৯৪ লাখ পাউন্ড।
২০২৪ সালের সাউথপোর্টের হামলার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। তিন শিশু একটি নাচের ক্লাসে ছুরি হামলায় নিহত হওয়ার পর বিভিন্ন শহরে সহিংস বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ে। সেই সময় অনলাইনে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া হয় যে হামলাকারী একজন মুসলিম আশ্রয়প্রার্থী।
এরপর মসজিদ এবং আশ্রয়প্রার্থীদের থাকার হোটেলসহ বিভিন্ন স্থাপনা হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। এই পরিস্থিতিতে উপাসনালয়গুলোর জন্য হোম অফিস আলাদা জরুরি নিরাপত্তা প্রকল্প চালু করে।
মুসলিম উইমেনস নেটওয়ার্ক ইউকের প্রধান নির্বাহী শায়েস্তা গহির বলেন, সরকারি অর্থায়নের পরিসংখ্যান থেকে মনে হতে পারে যে মুসলিমবিদ্বেষ মোকাবিলায় বড় ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। তবে তার বক্তব্য, সমস্যার ব্যাপ্তির তুলনায় সরকারের পদক্ষেপ এখনো সীমিত।
তিনি বলেন, মুসলিম নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে দৃশ্যমান পদক্ষেপ খুব কম। তার দাবি, অনেক ক্ষেত্রে মসজিদ ও কমিউনিটি স্থাপনাগুলো প্রয়োজনীয় অর্থও পাচ্ছে না।
শায়েস্তা গহির জানান, সম্প্রতি এক মসজিদ নেতার সঙ্গে কথা বলে তিনি জানতে পেরেছেন যে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য কয়েকবার আবেদন করার পরও ওই মসজিদ তাদের চাওয়া সব ব্যবস্থার জন্য অর্থ পায়নি। অনেক প্রতিষ্ঠান এখনো সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে।
বার্মিংহামের জামি কমিউনিটি সেন্টারও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কথা জানিয়েছে। ওয়েস্ট মিডল্যান্ডস পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ থেকে জুলাইয়ের মধ্যে ওই কেন্দ্রে ঘৃণাজনিত অপরাধ এবং বর্ণবিদ্বেষমূলক ক্ষয়ক্ষতির অন্তত পাঁচটি ঘটনা ঘটেছে।
নিরাপত্তা তহবিলের আবেদন প্রক্রিয়া চলার মধ্যেই কেন্দ্রটি নিজস্ব উদ্যোগে গেট ও জানালায় আলো আটকানোর বোর্ডসহ বিভিন্ন নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে।
কেন্দ্রটির মুসল্লিরা জানিয়েছেন, কিছু ঘটনা পুলিশকে জানানো হয়নি। এসব ঘটনার মধ্যে রয়েছে জানালার কাচ ভাঙচুর এবং ইসলামবিদ্বেষী গ্রাফিতি।
কেন্দ্রটির স্বেচ্ছাসেবক খালিদ স্থানীয় এমপি, কাউন্সিলর ও পুলিশের সঙ্গে একটি জরুরি বৈঠকের আয়োজন করেন। তিনি কেন্দ্রটিতে ঘটে যাওয়া একাধিক ঘটনার পর পুলিশের ভূমিকা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
খালিদ বলেন, কেন্দ্রটিতে কাউন্সিলের প্রিভেন্ট টিম এসেছে, ইমামকে মৌখিকভাবে অপমান করা হয়েছে এবং মানুষকে গালাগাল করা হয়েছে। তার প্রশ্ন ছিল, পরিস্থিতি আরও গুরুতর হওয়ার আগে আর কী ঘটার অপেক্ষা করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, কেন্দ্রটি মনে করছে তারা যথেষ্ট সহায়তা পাচ্ছে না। তার ভাষায়, নামাজ পড়তে আসা কারও যেন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে না হয়। কিন্তু বর্তমানে অনেকে নিজেদের বাড়ি এবং উপাসনালয়—দুই জায়গাতেই নিরাপত্তাহীন বোধ করছেন।
কেন্দ্রটির ৪১ বছর বয়সী মুসল্লি ইসলাম জানান, চলতি বছরের শুরুতে একজন ব্যক্তি মুসল্লিদের উদ্দেশে গালাগাল করার একটি ঘটনা তিনি পুলিশকে জানিয়েছিলেন।
তার দাবি, এসব ঘটনার কারণে অনেক নারী ও শিশু নিরাপত্তার আশঙ্কায় কাছের অন্য একটি মসজিদে যাওয়া শুরু করেছেন। তিনি বলেন, কোনো হিজাব পরা মুসলিম নারী একা এই কেন্দ্রে হেঁটে আসতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবেন না।
বার্মিংহাম আরডিংটনের এমপি পলেট হ্যামিলটন জামি কমিউনিটি সেন্টারের ঘটনাগুলো নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি এসব হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেন, তার নির্বাচনী এলাকায় এ ধরনের কর্মকাণ্ডের কোনো স্থান নেই।
ওয়েস্ট মিডল্যান্ডস পুলিশ জানিয়েছে, তারা জামি কমিউনিটি সেন্টারের নেতা ও মুসল্লিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখছে। পুলিশের এক মুখপাত্র বলেন, সব ধরনের ঘৃণাজনিত অপরাধকে গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া হয় এবং পুলিশের কাছে করা প্রতিটি অভিযোগ তদন্ত করা হয়। অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনতে পুলিশ কাজ করছে।
হোম অফিস জানিয়েছে, নিরাপত্তা তহবিলের জন্য পাওয়া আবেদনগুলো যত দ্রুত সম্ভব প্রক্রিয়া করার চেষ্টা চলছে।
হোম অফিসের এক মুখপাত্র বলেন, মুসলিম সম্প্রদায় যে মাত্রার ঘৃণাজনিত অপরাধের মুখোমুখি হচ্ছে, তা থেকে তাদের সুরক্ষা দিতে সরকার নিরাপত্তা প্রকল্পের মাধ্যমে ৪ কোটি পাউন্ড বরাদ্দ করেছে।
হোম অফিস আরও জানিয়েছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ব্রিটেনের ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলোর নিরাপত্তায় সরকারের মোট বিনিয়োগ রেকর্ড ৭ কোটি ৭৪ লাখ পাউন্ডে পৌঁছেছে।
সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান
এমকে

