TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

ব্রেক্সিটের পর সুইডেন হতে প্রায় ২,৫০০ ব্রিটিশকে বহিষ্কারের নির্দেশ

ব্রেক্সিটের পর ইউরোপে ব্রিটিশ নাগরিকদের বসবাসের অধিকার নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে সুইডেনে। শৈশব থেকে প্রায় ২৪ বছর সুইডেনে বসবাস করা ৩৪ বছর বয়সী ব্রিটিশ নাগরিক জন সেলারকে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি একজন সুইডিশ নারীকে বিয়ে করলেও সুইডেনে তার থাকার অধিকার নিশ্চিত হয়নি। আগামী ৭ সেপ্টেম্বরের মধ্যে তাকে সুইডেন ছাড়তে বলা হয়েছে।

 

জন সেলার মাত্র ১০ বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে সুইডেনে চলে যান। তার বাবা-মা ইংল্যান্ডের এসেক্স থেকে সুইডেনে পাড়ি জমিয়েছিলেন। ব্রিটেন তখন ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য হওয়ায় ইউরোপের মধ্যে অবাধ চলাচলের অধিকার ব্যবহার করে তারা সুইডেনে বসবাসের সুযোগ পেয়েছিলেন। সেখানেই জনের পড়াশোনা ও জীবনের বড় অংশ কেটেছে।

জনের বয়স যখন ১৬ বছর, তখন তার বাবা মারা যান। পরে তার মা ইংল্যান্ডে ফিরে গেলেও জন সুইডেনেই থেকে যান। তিনি সেখানে পড়াশোনা চালিয়ে যান এবং শিক্ষক হওয়ার প্রস্তুতিও নেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সুইডেন তার কাছে বিদেশ নয়, বরং নিজের বাড়ি।

ব্রেক্সিটের পর সুইডেনে থাকার অধিকার নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে জন সুইডিশ নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করেন। তিনি ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আবেদনটি করেন, অর্থাৎ ব্রেক্সিট-পরবর্তী নির্ধারিত সময়সীমা ৩১ ডিসেম্বরের আগেই। কিন্তু তার নাগরিকত্বের আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়।

এরপর সুইডেনে থাকার জন্য পরিবার-সম্পর্কিত আইনি অধিকারের ভিত্তিতে তিনি আরও দুইবার আবেদন করেন। সেসব আবেদনও প্রত্যাখ্যাত হয়। সর্বশেষ সিদ্ধান্তে তার তৎকালীন সম্পর্কের ভিত্তিতে বসবাসের অধিকারও স্বীকৃত হয়নি। আদালতের যুক্তি ছিল, জন ও ক্যারোলিন তখন বিদেশে দীর্ঘ সময় একসঙ্গে বসবাস করেননি এবং তাদের সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার বিষয়ে উপস্থাপিত অন্যান্য প্রমাণও যথেষ্ট ছিল না।

পরবর্তীতে জন ক্যারোলিনকে বিয়ে করেন। কিন্তু বিয়ের পরও তার সুইডেনে থাকার বিষয়টি সমাধান হয়নি। চলতি বছরের জানুয়ারিতে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়। এখন তিনি নতুন প্রমাণ দিয়ে ওই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আবেদন করছেন।

জন বলেন, ব্রেক্সিটের কারণে তার মতো মানুষের জীবনে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তার ভাষায়, ইংল্যান্ডে গেলে নিজেকে পর্যটক মনে হয়, কারণ সুইডেনই তার বাড়ি। সাত বছর ধরে সুইডেনে থাকার অধিকার ধরে রাখতে আইনি লড়াই চালানোর কারণে তিনি বিপুল অর্থ ব্যয় করেছেন এবং কাজও করতে পারছেন না।

জনের স্ত্রী ক্যারোলিনও পরিস্থিতি নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। তিনি ফাইব্রোমায়ালজিয়ায় আক্রান্ত এবং দীর্ঘ কোভিডের উপসর্গ, বিশেষ করে দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তিতে ভুগছেন। আবার শিক্ষকতার কাজে ফেরার চেষ্টা করলেও স্বামীকে সুইডেনে রাখার আইনি লড়াই তার ওপর অতিরিক্ত মানসিক চাপ তৈরি করেছে।

ক্যারোলিনের ভাষ্য, তারা শুধু একসঙ্গে জীবন কাটাতে চান। অবশেষে এমন একজন জীবনসঙ্গী পেয়েছিলেন, যিনি তার পাশে থাকবেন এবং প্রয়োজনের সময় তাকে সাহায্য করবেন। কিন্তু এখন নিজেদের বৈবাহিক সম্পর্ক বজায় রাখার জন্যই সরকারের বিরুদ্ধে দীর্ঘ আইনি লড়াই করতে হচ্ছে।

জনের ঘটনা অবশ্য একক কোনো ঘটনা নয় বলে দাবি করা হচ্ছে। ব্রিটেনে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার গণভোটের পর থেকে ২,৫০০-এর বেশি ব্রিটিশ নাগরিককে সুইডেন ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য দেশগুলোর মধ্যে ব্রেক্সিট-সম্পর্কিত কারণে ব্রিটিশ নাগরিকদের বহিষ্কারের সংখ্যা সুইডেনেই সবচেয়ে বেশি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সুইডেনের অভিবাসন কর্তৃপক্ষ এমন ব্রিটিশ নাগরিকদের দেরিতে করা আবেদন গ্রহণ না করার নীতি অনুসরণ করছে, যারা ব্রেক্সিটের পর আনুষ্ঠানিকভাবে সুইডেনে থাকার জন্য আবেদন করতে হবে—এ বিষয়টি জানতেন না। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের মাত্র আরও ১২টি দেশে একই ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে।

ব্রেক্সিটের আগে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নাগরিকদের এক সদস্য রাষ্ট্র থেকে অন্য সদস্য রাষ্ট্রে বহিষ্কার করা ছিল অত্যন্ত সীমিত। সাধারণত জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি বা ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি ছাড়া এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ ছিল না। ব্রিটেন ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছাড়ার পর ব্রিটিশ নাগরিকরা সেই বিশেষ অধিকার হারান এবং এখন অপরাধ না করলেও তাদের সুইডেন ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হতে পারে।

সুইডেনে বসবাসকারী ব্রিটিশ নাগরিকদের দেরিতে করা আবেদনের বিষয়ে দেশটির নীতির বিরুদ্ধে যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র দপ্তর একাধিকবার উদ্বেগ জানিয়েছে। ইউরোপীয় কমিশনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারাও বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছেন বলে জানা গেছে।

সুইডিশ সংসদ সদস্য হোকান সভেনেলিংও দেশটিতে বসবাসকারী ব্রিটিশ নাগরিকদের বিষয়ে সরকারের অবস্থান পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন। গত মাসে তিনি তার নির্বাচনী এলাকার ৭৮ বছর বয়সী ব্রিটিশ নাগরিক জয়েস থমাসের বিষয়টিও সামনে আনেন। ২১ বছর ধরে সুইডেনে বসবাসের পর তাকেও আগামী ৭ সেপ্টেম্বরের মধ্যে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া ৭৪ বছর বয়সী ব্রিটিশ নাগরিক জর্জ মেসনের ঘটনাও ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি করেছে। তিনি পূর্ণকালীন ডিমেনশিয়া পরিচর্যার মধ্যে রয়েছেন। তার সন্তানরা চিকিৎসা-সংক্রান্ত প্রমাণ দিয়ে জানিয়েছিলেন, বাবাকে যুক্তরাজ্যে ফিরিয়ে নেওয়ার যাত্রা তার জন্য প্রাণঘাতী হতে পারে। কিন্তু সুইডেনের অভিবাসন-সংক্রান্ত সর্বোচ্চ আপিল আদালত গত ২৩ জুলাই তার আবেদন প্রত্যাখ্যান করে।

‘ব্রিটস ইন সুইডেন’ সংগঠনের কর্মী ডেভিড মিলস্টেড বলেছেন, জন সেলারের ঘটনা সুইডেনে প্রত্যাহার চুক্তি বাস্তবায়নে “পদ্ধতিগত ব্যর্থতার” আরেকটি উদাহরণ। তার মতে, সুইডিশ সরকার সমস্যাগুলোকে এখন আগের তুলনায় বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখছে—এমন কিছু ইতিবাচক লক্ষণ থাকলেও দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন, কারণ অনেক মানুষ এরই মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

জন ও ক্যারোলিন এখন তাদের মামলাটি পুনর্বিবেচনার জন্য নতুন প্রমাণ উপস্থাপন করছেন। তাদের মূল দাবি—শৈশব থেকে যে দেশে জনের জীবন, শিক্ষা ও সামাজিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে, সেই দেশ থেকে তাকে বিচ্ছিন্ন করা হলে শুধু একজন ব্যক্তিই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না; একটি পরিবারও ভেঙে পড়বে।

জনের সামনে এখন সময়সীমা খুবই কম। ৭ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সুইডেন ছাড়ার নির্দেশ কার্যকর হলে ২৪ বছর ধরে বসবাস করা দেশ থেকে তাকে চলে যেতে হবে। আর সেই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে সুইডেনে জন্ম না হলেও যার কাছে দেশটি শৈশব, শিক্ষা, সম্পর্ক ও জীবনের স্মৃতিতে নিজের ঘরের মতো—সেই ব্রিটিশ নাগরিকের দীর্ঘ আইনি লড়াই নতুন এক অনিশ্চয়তায় গিয়ে ঠেকবে।

সূত্রঃ এলবিসি

এম.কে

আরো পড়ুন

রানির মৃত্যুর পর যেসব পরিবর্তন আসবে যুক্তরাজ্যে

সাত দণ্ড, তিনবার অবৈধ প্রত্যাবর্তনঃ ইরাকি নাগরিককে বহিষ্কারে হোম অফিসের পথে আইনি বাধা

যুক্তরাজ্যে নারীকে ইচ্ছাকৃতভাবে এইচআইভি(HIV) সংক্রমণ করায় ডেভিসকে ৪.৫ বছরের কারাদণ্ড