চীনে মাত্র ৪৭ ডলার বা প্রায় ৬ হাজার টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি স্বল্প বাজেটের অ্যানিমেশন সিনেমা এখন রীতিমতো বক্স অফিসে চমক সৃষ্টি করেছে। ‘নিউ লাই’ নামের সিনেমাটি মুক্তির পর প্রথম দিকে তেমন দর্শক না পেলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এর নিম্নমানের অ্যানিমেশন ও অদ্ভুত গল্প নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। আর সেই সমালোচনাই শেষ পর্যন্ত ছবিটিকে এনে দিয়েছে অভাবনীয় সাফল্য।
সিনেমাটির গল্প একটি গরুর স্বপ্নকে ঘিরে তৈরি। তবে গল্পের চেয়েও বেশি আলোচনায় এসেছে ছবিটির অত্যন্ত সাধারণ গ্রাফিক্স ও অ্যানিমেশন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবিটির বিভিন্ন দৃশ্য ছড়িয়ে পড়ার পর অনেকে এটিকে নিয়ে হাস্যরস ও ব্যঙ্গ শুরু করেন। কিন্তু সেই নেতিবাচক প্রচারণাই ধীরে ধীরে দর্শকদের মধ্যে কৌতূহল তৈরি করে।
চলচ্চিত্রের আয়-ব্যয়ের তথ্য সংরক্ষণকারী চীনা ওয়েবসাইট মাও ইয়ানের তথ্য অনুযায়ী, মুক্তির প্রথম ১০ দিনে ‘নিউ লাই’ মাত্র ৭ হাজার ৭০৫ ইউয়ান আয় করেছিল, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার টাকা। সে সময় সিনেমাটির ভবিষ্যৎ নিয়ে বিশেষ কোনো প্রত্যাশাও ছিল না।
পরিস্থিতি বদলে যায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সিনেমাটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হওয়ার পর। এরপর দ্রুত বাড়তে থাকে টিকিট বিক্রি। এরই মধ্যে সিনেমাটির মোট আয় ১৪ দশমিক ৯ মিলিয়ন ইউয়ান ছাড়িয়ে গেছে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২৬ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ মাত্র কয়েক হাজার টাকা ব্যয়ে তৈরি সিনেমাটি এখন কোটি কোটি টাকার ব্যবসা করছে।
বর্তমানে চীনের প্রেক্ষাগৃহে ‘নিউ লাই’ বড় বাজেটের হলিউড সিনেমার সঙ্গেও প্রতিযোগিতা করছে। ‘দ্য ওডিসি’ কিংবা ‘স্পাইডার-ম্যান: ব্র্যান্ড নিউ ডে’-এর মতো আলোচিত সিনেমার পাশে জায়গা করে নিয়েছে এই অতি স্বল্প বাজেটের অ্যানিমেশন।
চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সিনেমাটি নিয়ে নানা ধরনের মজার মন্তব্যও ছড়িয়ে পড়েছে। কেউ কেউ বলছেন, সিনেমাটি দেখলে ৮০ মিনিটের জন্য আফসোস হতে পারে, কিন্তু না দেখলে সেই আফসোস নাকি সারাজীবন থেকে যাবে। ফলে কৌতূহল থেকেই অনেকে সিনেমা হলে ছুটছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি ঝকঝকে কনটেন্টের যুগে ‘নিউ লাই’-এর অতি সাধারণ অ্যানিমেশনও দর্শকদের কাছে আলাদা আকর্ষণ তৈরি করেছে। অনেকে ছবিটির নিম্নমানের গ্রাফিক্সকে মজা করে ‘হস্তশিল্প’ হিসেবে অভিহিত করছেন। একই সঙ্গে এটিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তৈরি নয়, বরং মানুষের হাতে তৈরি কাজ হিসেবে তুলে ধরেও অনেকে প্রচার করছেন।
সিনেমাটির জনপ্রিয়তার পেছনে চীনা ভাষার একটি শব্দগত বিষয়ও ভূমিকা রাখছে। চীনে ‘ষাঁড়’ ও ‘গরু’ একই চীনা অক্ষর দিয়ে প্রকাশ করা হয়। অন্যদিকে শেয়ারবাজারের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতাকে বোঝাতে ‘বুলিশ’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়। ফলে শেয়ারবাজার আরও চাঙা হবে—এমন প্রত্যাশা থেকে কেউ কেউ সিনেমাটির নামকেও প্রতীকীভাবে দেখছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ওয়েইবোতে একজন ব্যবহারকারী মন্তব্য করেছেন, সূচক ৪ হাজার পয়েন্টে পৌঁছালে তিনি সিনেমা হলে গিয়ে ছবিটিকে সমর্থন করবেন। আরেকজনের মন্তব্য, সিনেমাটি হয়তো ভালো নয়, কিন্তু এর নামটি চমৎকার।
আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, সিনেমাটির মুক্তির আগে বড় কোনো প্রচারণা ছিল না। এমনকি এর কোনো আনুষ্ঠানিক পোস্টারও প্রকাশ করা হয়নি। কিন্তু দর্শকদের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় প্রেক্ষাগৃহগুলো ছবিটির প্রদর্শনী বাড়াতে বাধ্য হয়েছে।
পোস্টার না থাকায় কিছু সিনেমা হলের কর্মীরা নিজেরাই হাতে ছবি এঁকে পোস্টার তৈরি করেছেন। সেই ব্যতিক্রমী পোস্টারও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
তবে সিনেমাটির এই সাফল্য নিয়ে সবাই ইতিবাচক নন। চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যম বেইজিং নিউজের এক সম্পাদকীয়তে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, নিম্নমানের সিনেমাকে এভাবে অতিরিক্ত প্রদর্শনীর সুযোগ দেওয়া হলে দর্শকদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, ‘নিউ লাই’-এর মতো সিনেমার সাফল্য দর্শকদের নিম্নমানের চলচ্চিত্রের প্রতি প্রত্যাশার মান আরও কমিয়ে দিতে পারে। একই সঙ্গে সিনেমা হলগুলোকে দর্শকদের জন্য দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানানো হয়েছে।
তবে সমালোচনা সত্ত্বেও ‘নিউ লাই’-এর অভাবনীয় বক্স অফিস সাফল্য চলচ্চিত্রাঙ্গনে নতুন এক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। মাত্র ৪৭ ডলারের বাজেটে নির্মিত একটি সিনেমা কীভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের হাসি-ঠাট্টা, কৌতূহল ও ভাইরাল প্রচারণার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার ব্যবসায় পরিণত হতে পারে—‘নিউ লাই’ এখন তারই এক ব্যতিক্রমী উদাহরণ।
সূত্রঃ সে অলওয়েজ ট্রুথ
এম.কে

