ভারতের হিন্দুত্ববাদী সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য যুক্তরাষ্ট্র সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা কমিশন। সংগঠনটির বিরুদ্ধে মুসলিম, খ্রিস্টানসহ ভারতের বিভিন্ন ধর্মীয় সংখ্যালঘুর ওপর নিপীড়নের অভিযোগ তুলে এ আহ্বান জানানো হয়েছে।
সম্প্রতি আরএসএসের প্রধান মোহন ভাগবতের সম্ভাব্য যুক্তরাষ্ট্র সফরকে কেন্দ্র করে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ধর্মীয় স্বাধীনতা কমিশন বলেছে, আরএসএস নেতাদের উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক সম্মান দেওয়ার পরিবর্তে ধর্মীয় স্বাধীনতা লঙ্ঘনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে লক্ষ্যভিত্তিক নিষেধাজ্ঞা বিবেচনা করা উচিত।
যুক্তরাষ্ট্রের মুসলিম নাগরিক অধিকার ও অ্যাডভোকেসি সংগঠন কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনসও কমিশনের এই আহ্বানের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। সংগঠনটির অভিযোগ, ভারতের ক্ষমতাসীন হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক পরিবেশ আরএসএসের মতো সংগঠনকে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে নিপীড়নের সুযোগ করে দিয়েছে।
১৯২৫ সালে প্রতিষ্ঠিত আরএসএসকে ভারতীয় হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শের অন্যতম প্রধান সংগঠন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সংগঠনটির সঙ্গে ভারতের ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির ঐতিহাসিক ও সাংগঠনিক সম্পর্ক রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ধর্মীয় স্বাধীনতা কমিশন ভারতের ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতা, হয়রানি এবং বৈষম্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে।
২০২৬ সালের প্রতিবেদনে কমিশন ভারতের ধর্মীয় স্বাধীনতার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করার পাশাপাশি আরএসএসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে লক্ষ্যভিত্তিক নিষেধাজ্ঞার সুপারিশ করেছে। এসব পদক্ষেপের মধ্যে সম্পদ জব্দ এবং যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার মতো ব্যবস্থা বিবেচনার কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের এই অবস্থানের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে ভারত। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা কমিশনের অবস্থানকে পক্ষপাতদুষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্যতাহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। ভারতের দাবি, কমিশন দেশটির অভ্যন্তরীণ বিষয়ে একপাক্ষিক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মন্তব্য করছে।
ভারত আরও বলেছে, আরএসএস ভারতে আইনসম্মতভাবে পরিচালিত একটি সংগঠন এবং দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ে বাইরের কোনো প্রতিষ্ঠানের হস্তক্ষেপ গ্রহণযোগ্য নয়। ফলে আরএসএসকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক অবস্থানকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে ধর্মীয় স্বাধীনতা, মানবাধিকার ও ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আরএসএসের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আহ্বান বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে মার্কিন প্রশাসনের পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা কমিশন একটি স্বাধীন ও দ্বিদলীয় পরামর্শদাতা সংস্থা; এর সুপারিশ নিজে থেকে মার্কিন সরকারের বাধ্যতামূলক সিদ্ধান্তে পরিণত হয় না।
এদিকে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবতের যুক্তরাষ্ট্র সফরকে সামনে রেখে বিষয়টি আরও রাজনৈতিক গুরুত্ব পেয়েছে। একদিকে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বাড়ছে, অন্যদিকে ভারত সরকার এসব অভিযোগকে পক্ষপাতদুষ্ট বলে প্রত্যাখ্যান করছে। ফলে আরএসএসকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ভারত কূটনৈতিক সম্পর্কে নতুন করে বিতর্কের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
সূত্রঃ সি.এ.আই.আর
এম.কে

