TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

যুক্তরাজ্যকে নিয়ে ট্রাম্পের বিতর্কিত আক্রমণঃ সাদিক খানকে ঘিরে ছড়ালেন শরিয়া আদালতের ভিত্তিহীন দাবি

যুক্তরাজ্যকে নিয়ে ফের বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এবার লন্ডনের মেয়র সাদিক খানকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করার পাশাপাশি ব্রিটিশ রাজধানীতে কথিত ‘নো-গো এলাকা’, আইনশৃঙ্খলার অবনতি এবং ‘শরিয়া আদালত’ নিয়ে একাধিক দাবি করেছেন তিনি। তবে তার এসব বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশের পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই এবং কয়েকটি দাবি সরাসরি বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

জিবি নিউজের উপস্থাপক বেভ টার্নারের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প দাবি করেন, লন্ডনের কিছু এলাকায় পুলিশ পর্যন্ত প্রবেশ করতে চায় না। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এসব এলাকায় আইনশৃঙ্খলা নেই এবং পুলিশ নিজেদের জীবন নিয়ে শঙ্কিত হওয়ায় সেখানে যেতে ভয় পায়।

ট্রাম্পের অভিযোগ, এসব এলাকায় নিজেদের মতো করে ব্যবস্থা চলে এবং সেখানে ‘শরিয়া আদালত’ও রয়েছে। এরপর তিনি সাদিক খানকে লন্ডনের “ভয়াবহ” মেয়র হিসেবে আক্রমণ করেন এবং শহরের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য তাকে দায়ী করার চেষ্টা করেন।

কিন্তু লন্ডনে রাষ্ট্রীয় আইনের বাইরে কোনো ‘শরিয়া আদালত’ কার্যকর নেই। যুক্তরাজ্যে কিছু শরিয়া কাউন্সিল রয়েছে, যারা মূলত ধর্মীয় ও পারিবারিক বিষয়ে পরামর্শ দেয় এবং কিছু ক্ষেত্রে স্বেচ্ছামূলক সালিশে ভূমিকা রাখে। তবে এগুলোর ব্রিটিশ আইনের অধীনে কোনো আদালতসুলভ আইনগত ক্ষমতা বা এখতিয়ার নেই। যুক্তরাজ্য সরকারের অবস্থানও হলো—শরিয়া আইন ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের আইনের অংশ নয়।

ট্রাম্প আরও দাবি করেন, প্রায় ২০ বছর আগে লন্ডনে অপরাধ ছিল না এবং শহরটি তখন অত্যন্ত নিরাপদ ছিল। তার অভিযোগ, বর্তমানে “একটি ভিন্ন সংস্কৃতি” লন্ডনে প্রবেশ করেছে এবং এ কারণেই শহরটি আগের তুলনায় আমূল বদলে গেছে।

সাদিক খান সম্পর্কে ট্রাম্প বলেন, তিনি লন্ডন ও যুক্তরাজ্যের প্রতিনিধিত্ব করার উপযুক্ত ব্যক্তি নন। এমনকি নতুন করে আসা অভিবাসীদের ভোটের কারণেই সাদিক খান নির্বাচনে টিকে আছেন—এমন ইঙ্গিতও দেন তিনি।

তবে সাক্ষাৎকারে উপস্থাপক বেভ টার্নারই উল্লেখ করেন যে গত পাঁচ বছরে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার সংখ্যা কমেছে এবং সাদিক খান ব্যাপক জনপ্রিয় হওয়ায় তিনবার পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন। এরপরও লন্ডনের কিছু এলাকায় ‘একক সংস্কৃতি’ তৈরি হয়েছে—এমন দাবি করা হয়, যার পক্ষে কোনো প্রমাণ দেওয়া হয়নি।

ট্রাম্পের সর্বশেষ মন্তব্যকে তার দীর্ঘদিনের সাদিক খানবিরোধী অবস্থানের ধারাবাহিকতা হিসেবেও দেখা হচ্ছে। ২০১৫ সাল থেকে দুজনের মধ্যে প্রকাশ্য রাজনৈতিক বিরোধ চলে আসছে। সে সময় মুসলিমদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ নিষিদ্ধ করার প্রস্তাবের সমালোচনা করেছিলেন সাদিক খান। এরপর থেকেই ট্রাম্প বিভিন্ন সময়ে লন্ডনের মেয়রকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করে আসছেন।

২০১৭ সালে লন্ডন ব্রিজে সন্ত্রাসী হামলার পরও ট্রাম্প সাদিক খানের বক্তব্য নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করেছিলেন। সে সময় সাদিক খান হামলার পর লন্ডনে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনের প্রেক্ষাপটে মানুষকে আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। ট্রাম্প সেই বক্তব্যকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করে মেয়রকে আক্রমণ করেন।

২০১৯ সালে দুই নেতার মধ্যে ফের প্রকাশ্য বাকযুদ্ধ হয়। সে সময় ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাদিক খানকে আক্রমণ করে তাকে লন্ডনের অপরাধ পরিস্থিতির দিকে মনোযোগ দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন।

এরপরও ট্রাম্পের লন্ডনবিষয়ক বক্তব্যে একই ধরনের অভিযোগ বারবার ফিরে এসেছে। ২০২৫ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেওয়া বক্তব্যেও তিনি লন্ডনকে ‘শরিয়া আইনের দিকে’ এগিয়ে যাওয়ার দাবি করেছিলেন। সেই বক্তব্যেরও কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীসহ বিভিন্ন ব্রিটিশ রাজনীতিক ওই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।

যুক্তরাজ্যকে নিয়ে ট্রাম্পের সর্বশেষ মন্তব্য এসেছে এমন এক সময়ে, যখন দেশটির অভিবাসন, অপরাধ, জ্বালানি মূল্য ও সামাজিক পরিবর্তন নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক তীব্র। মাত্র একদিন আগেও ট্রাম্প ব্রিটেনকে “বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে” বলে মন্তব্য করে দেশটির অভিবাসন ও জ্বালানি নীতির সমালোচনা করেছিলেন।

ট্রাম্পের সর্বশেষ বক্তব্য নতুন করে যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে একজন বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে ব্রিটেনের রাজধানী ও তার নির্বাচিত মেয়র সম্পর্কে প্রমাণহীন ও বিভ্রান্তিকর মন্তব্য করার কারণে তার বক্তব্য নিয়ে সমালোচনা আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

লন্ডন নিয়ে ট্রাম্পের ধারাবাহিক মন্তব্যের মধ্য দিয়ে শুধু সাদিক খানের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত রাজনৈতিক বিরোধই নয়, যুক্তরাজ্যের অভিবাসন, বহুসাংস্কৃতিক সমাজ ও নগর নিরাপত্তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্টের কঠোর রাজনৈতিক অবস্থানও আবার সামনে এসেছে।

সূত্রঃ মিরর

এম.কে

আরো পড়ুন

যুক্তরাজ্যের বাজার পরিস্থিতি নিয়ে সরকার বিপাকে

যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি এবং প্রপার্টি মার্কেট: ফিরে দেখা ২০২৪

অভিবাসীদের আশ্রয় ব্যয় নিয়ে রিভসের কড়া পরিকল্পনা, সন্দিহান বিশেষজ্ঞরা