যুক্তরাজ্যের প্রতি রাশিয়ার হুমকি আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। ইউক্রেনকে দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির গোপন প্রযুক্তি দেওয়ার পর ব্রিটিশ গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা মহলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, মস্কো সরাসরি যুদ্ধের পথে না গিয়ে যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন সামরিক ও প্রতিরক্ষা-সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় গোপন নাশকতা বা ‘ছায়াযুদ্ধের’ মতো পদক্ষেপ নিতে পারে।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম গত ২৪ আগস্ট ইউক্রেনের স্বাধীনতা দিবসে কিয়েভ সফর করে ইউক্রেনের প্রতি লন্ডনের অটুট সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন। একই সফরে ব্রিটেন ঘোষণা করে, প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান এমবিডিএ ইউক্রেনকে দীর্ঘপাল্লার স্ক্যাল্প ক্ষেপণাস্ত্রে ব্যবহৃত ব্রিটিশ উপাদানের শ্রেণিবদ্ধ প্রযুক্তিগত তথ্য সরবরাহ করতে পারবে। এর মাধ্যমে ইউক্রেনে ক্ষেপণাস্ত্রের স্থানীয় সংযোজন লাইন প্রতিষ্ঠার পথ খুলবে।
এই সিদ্ধান্তকে মস্কো অত্যন্ত গুরুতর পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে। রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা ২৭ আগস্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ব্রিটিশ সরবরাহ করা ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ইউক্রেন রাশিয়ার ভূখণ্ডে হামলা চালালে ইউক্রেনের ভেতরে ও বাইরের ব্রিটিশ সামরিক স্থাপনাগুলো রুশ হামলার লক্ষ্য হতে পারে। রাশিয়া একই সঙ্গে ব্রিটেন ও ফ্রান্সকে সংঘাত আরও বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য দায়ী করেছে।
এর আগে ক্রেমলিনের সাবেক উপদেষ্টা আন্দ্রেই ফেদোরভ আরও সরাসরি হুমকির ইঙ্গিত দেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ইউক্রেনকে অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহকারী ব্রিটিশ কারখানাগুলো ভবিষ্যতে রাশিয়ার প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়তে পারে। বিশেষ করে যুক্তরাজ্যের ড্রোন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ও প্রতিরক্ষা শিল্পের সঙ্গে যুক্ত কারখানাগুলো নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ব্রিটিশ নিরাপত্তা মহলে আশঙ্কা, মস্কো যদি কোনো পদক্ষেপ নেয়, তা সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার বদলে নাশকতা, সাইবার হামলা, অগ্নিসংযোগ, গুপ্ত অভিযান কিংবা অন্য কোনো ‘অস্বীকারযোগ্য’ পদ্ধতিতে হতে পারে। এর লক্ষ্য হতে পারে যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা উৎপাদনব্যবস্থা দুর্বল করা এবং একই সঙ্গে ব্রিটিশ সরকারের রাজনৈতিক দৃঢ়তা পরীক্ষা করা। বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের কর্মকাণ্ড সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা না করেও একটি ন্যাটো সদস্য দেশের ওপর চাপ সৃষ্টি করার কৌশল হতে পারে।
বিশেষ করে ব্রিটেনের ড্রোন ও প্রতিরক্ষা শিল্পকে ঘিরে উদ্বেগ সামনে এসেছে। রুশ পক্ষ থেকে যুক্তরাজ্যে ইউক্রেনের জন্য ড্রোন উৎপাদনকারী কারখানাগুলোতে ‘অজ্ঞাত উৎসের’ হামলার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। এর মাধ্যমে মস্কো সরাসরি নিজেদের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করার সুযোগ রেখে প্রতিশোধ নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
তবে প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম রাশিয়ার হুমকির কাছে নতি স্বীকারের কোনো ইঙ্গিত দেননি। কিয়েভ সফরের সময় তিনি মস্কোর হুমকিকে ‘আপত্তিকর’ বলে আখ্যায়িত করেন এবং স্পষ্ট করেন যে ইউক্রেনের প্রতি ব্রিটেনের সমর্থন কমবে না। ব্রিটিশ সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, ইউক্রেনের নিরাপত্তাকে যুক্তরাজ্যের নিজের নিরাপত্তার সঙ্গেও সম্পৃক্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইউক্রেনকে দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্তটি অবশ্য তাৎক্ষণিকভাবে নতুন ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহের সমান নয়। ব্রিটিশ সরকার জানিয়েছে, এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ইউক্রেনে স্থানীয়ভাবে ক্ষেপণাস্ত্র সংযোজনের সক্ষমতা গড়ে তোলাই মূল লক্ষ্য। সংশ্লিষ্ট ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর কার্যকর উৎপাদন ও ব্যবহার শুরু হতে সময় লাগবে।
এদিকে রাশিয়ার সম্ভাব্য ‘ছায়াযুদ্ধ’ মোকাবিলায় ব্রিটেন ইতোমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তা জোরদার করছে। সমুদ্রের তলদেশে থাকা বিদ্যুৎ, গ্যাস ও টেলিযোগাযোগের তারসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে রুশ নাশকতা থেকে সুরক্ষায় সরকার কয়েক কোটি পাউন্ডের বিনিয়োগ পরিকল্পনা নিয়েছে। ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা গোয়েন্দারাও আগে সতর্ক করেছে যে রাশিয়া গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রতলদেশীয় অবকাঠামোকে লক্ষ্য করার সক্ষমতা বাড়াচ্ছে।
ফলে ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব এখন শুধু পূর্ব ইউরোপের যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। ব্রিটেন ও রাশিয়ার মধ্যে সামরিক প্রযুক্তি, গোয়েন্দা তৎপরতা, সাইবার হামলা এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে সংঘাতের নতুন মাত্রা তৈরি হচ্ছে।
পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো—কোনো গোপন নাশকতামূলক হামলার উৎস শনাক্ত করা কঠিন হলে তা দ্রুত কূটনৈতিক সংকট থেকে সামরিক উত্তেজনায় রূপ নিতে পারে। বিশেষ করে যুক্তরাজ্য ন্যাটোর সদস্য হওয়ায় ব্রিটিশ ভূখণ্ড বা সামরিক স্থাপনায় গুরুতর হামলার ঘটনা বৃহত্তর জোটের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকেও চাপে ফেলতে পারে।
তবে এখন পর্যন্ত ব্রিটেনে রাশিয়ার এমন কোনো হামলা সংঘটিত হয়েছে—এমন নিশ্চিত তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি। বর্তমান পরিস্থিতি মূলত রুশ হুমকি, গোয়েন্দা সতর্কতা এবং সম্ভাব্য ‘হাইব্রিড যুদ্ধের’ ঝুঁকি ঘিরে। ফলে লন্ডনের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে—ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি ব্রিটিশ ভূখণ্ড ও প্রতিরক্ষা অবকাঠামোকে সম্ভাব্য রুশ পাল্টা পদক্ষেপ থেকে সুরক্ষিত রাখা।
সূত্রঃ দ্য এক্সপ্রেস
এম.কে

