যুক্তরাজ্যের জলসীমার আশপাশে রাশিয়ার নৌ তৎপরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে সতর্ক করেছে ব্রিটিশ রাজকীয় নৌবাহিনী। রুশ জাহাজের গতিবিধি পর্যবেক্ষণে গত জুলাই মাসে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৫ শতাংশ বেশি সময় ব্যয় করেছে ব্রিটিশ নৌবাহিনী। পুরো মাসে মোট ২১ দিন রুশ জাহাজগুলোর গতিবিধি নজরদারিতে রাখা হয়েছে।
ব্রিটিশ নৌবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, জুলাইজুড়ে ডোভার প্রণালি ও উত্তর সাগরে রুশ জাহাজগুলোর গতিবিধি পর্যবেক্ষণে একাধিক যুদ্ধ ও টহল জাহাজ মোতায়েন করা হয়। এসব অভিযানে উপকূলীয় টহল জাহাজ এইচএমএস টাইন, এইচএমএস মার্সি ও এইচএমএস সেভার্নের পাশাপাশি ওয়াইল্ডক্যাট হেলিকপ্টার এবং ডুবোজাহাজ শনাক্তে সক্ষম মার্লিন বিমান অংশ নেয়।
নজরদারির আওতায় থাকা রুশ যুদ্ধজাহাজগুলোর মধ্যে ছিল নিউশত্রাশিমি ও অ্যাডমিরাল গ্রিগোরোভিচ। এসব জাহাজ রাশিয়ার তথাকথিত ‘ছায়া বহর’-এর তেলবাহী জাহাজগুলোকে পাহারা দেওয়ার কাজে নিয়োজিত বলে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত এক বছরে যুক্তরাজ্যের আশপাশের জলসীমায় রুশ নৌযান পর্যবেক্ষণে ব্রিটিশ নৌবাহিনীর জাহাজগুলোকে ১১৬ বার সক্রিয় করা হয়েছে। ওই সময় ৬১টি রুশ যুদ্ধজাহাজ এবং ২৮টি বাণিজ্যিক জাহাজের গতিবিধি অনুসরণ করা হয়।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, গত দুই বছরের তুলনায় যুক্তরাজ্যের আশপাশে রাশিয়ার নৌ তৎপরতা প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে। এই বাড়তি তৎপরতার মধ্যে রুশ গুপ্তচর জাহাজ ইয়ানতারকে পর্যবেক্ষণ ও প্রতিরোধের অভিযানও রয়েছে। গত বছরের নভেম্বরে স্কটল্যান্ডের কাছে সমুদ্রের নিচে থাকা গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ কেবলের আশপাশে ওই জাহাজটির উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছিল।
রাশিয়ার তথাকথিত ‘ছায়া বহর’ নিয়েও পশ্চিমা দেশগুলোর উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বিরুদ্ধে পুরোনো ও বিভিন্ন দেশের পতাকাবাহী জাহাজের এই বহর ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে তেল পরিবহন এবং ইউক্রেনে চলমান যুদ্ধের অর্থ জোগানোর অভিযোগ রয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে জুন মাসে ব্রিটিশ রয়্যাল মেরিন সেনারা ‘স্মির্টোস’ নামের একটি তেলবাহী জাহাজ জব্দ করে। এটি ছিল প্রথম ঘটনা, যখন ব্রিটিশ সেনারা সরাসরি ছায়া বহরের একটি জাহাজে উঠে অভিযান চালায়। এরপর রাশিয়ার নৌবাহিনীর কয়েকটি জাহাজকে ওই বহরের জাহাজ পাহারায় ব্যবহারের বিষয়টিও ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের নজরে এসেছে।
ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মতে, ছায়া বহরের জাহাজ পাহারায় রুশ যুদ্ধজাহাজ ব্যবহারের কারণে রাশিয়াকে নিজেদের মূল্যবান সামরিক সক্ষমতার একটি অংশ নিয়মিতভাবে বাণিজ্যিক জাহাজ পাহারায় ব্যয় করতে হচ্ছে।
এদিকে যুক্তরাজ্য ইতোমধ্যে ৫০০টির বেশি জাহাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। একই সময়ে ২০২৫ সালে রাশিয়ার তেল ও গ্যাস থেকে অর্জিত আয় আগের বছরের তুলনায় ২৪ শতাংশ কমেছে বলে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
রুশ সামরিক তৎপরতার আরেকটি উদাহরণ হিসেবে ২০ জুলাইয়ের একটি ঘটনা সামনে এসেছে। ওই দিন ব্রিটিশ যুদ্ধজাহাজ এইচএমএস টাইনকে রুশ যুদ্ধজাহাজ নিউশত্রাশিমির গতিবিধি পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব দেওয়া হয়। রুশ যুদ্ধজাহাজটি ব্রিটিশ ও ফরাসি জলসীমার বাইরে সরাসরি গোলাবর্ষণের একটি সামরিক মহড়া চালায়।
অন্যদিকে ব্রিটিশ যুদ্ধজাহাজ এইচএমএস সামারসেট উত্তর আটলান্টিকে রুশ তৎপরতা পর্যবেক্ষণে নিয়োজিত রয়েছে। চার মাসের ন্যাটো অভিযানের অংশ হিসেবে জাহাজটি ওই অঞ্চলে ডুবোজাহাজ অনুসন্ধানের কাজে অংশ নিচ্ছে। এ অভিযানে ব্রিটিশ নৌবাহিনীর বিমান শাখার হেলিকপ্টারও ব্যবহার করা হচ্ছে।
এইচএমএস সামারসেটের অধিনায়ক কমান্ডার ম্যাট মিলিয়ার্ড বলেন, এ ধরনের অভিযান ব্রিটিশ রাজকীয় নৌবাহিনীর মূল দায়িত্বেরই প্রতিফলন। তাঁর ভাষায়, যুক্তরাজ্য ও তার মিত্রদের স্বার্থ যেখান থেকেই হুমকির মুখে পড়ুক, সেখান থেকেই তাদের সুরক্ষা দেওয়া নৌবাহিনীর অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
তিনি আরও বলেন, গত চার মাসের অভিযানে জাহাজের সদস্যরা যে কাজ করেছেন, তাতে তিনি প্রত্যেক সদস্যের জন্য অত্যন্ত গর্বিত।
রাশিয়ার নৌ তৎপরতা বৃদ্ধির মধ্যে যুক্তরাজ্যের জলসীমায় ব্রিটিশ নৌবাহিনীর নজরদারি জোরদার করার ঘটনা ইউরোপের সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে রাশিয়ার ছায়া বহর, সমুদ্রের নিচে থাকা গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ অবকাঠামো এবং উত্তর সাগর ও উত্তর আটলান্টিকে সামরিক তৎপরতার ওপর ব্রিটেন ও তার মিত্রদের নজরদারি আরও বাড়ানো হচ্ছে।
ব্রিটিশ নৌবাহিনীর এই বাড়তি তৎপরতা থেকে স্পষ্ট, রাশিয়ার নৌ কর্মকাণ্ডকে এখন শুধু সামরিক বিষয় হিসেবে নয়, বরং জ্বালানি পরিবহন, নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর চেষ্টা এবং সমুদ্রের নিচে থাকা গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তার সঙ্গেও যুক্ত একটি বড় নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করছে যুক্তরাজ্য।
সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান
এম.কে

