TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

যুক্তরাজ্যে এনএইচএসের সাড়ে ৫ লাখ পাউন্ড লুটে বিলাসী জীবন, তবুও জেল এড়ালেন প্রতারক ব্যবস্থাপক!

দক্ষিণ লন্ডনের একটি সরকারি স্বাস্থ্যসেবা চিকিৎসাকেন্দ্র থেকে পাঁচ লাখ ১৭ হাজার ২৬০ পাউন্ডের বেশি অর্থ আত্মসাৎ করে বিলাসবহুল জীবনযাপন করা এক চিকিৎসাকেন্দ্রের ব্যবস্থাপককে তাৎক্ষণিকভাবে কারাগারে পাঠানো হয়নি। তবে আদালতে বিচারক সতর্ক করে বলেছেন, কারাগারে যাওয়ার মাত্র চুলচেরা ব্যবধান থেকে বেঁচে গেছেন তিনি।

৩৩ বছর বয়সী হেলেনা পাইভা দক্ষিণ লন্ডনের সাউথওয়ার্ক এলাকার অ্যালবিয়ন স্ট্রিট চিকিৎসাকেন্দ্র থেকে ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের জুলাইয়ের মধ্যে মোট পাঁচ লাখ ১৭ হাজার ২৬০ পাউন্ড ২৯ পেনি আত্মসাৎ করার কথা স্বীকার করেছেন।

আদালতে শুনানিতে উঠে আসে, চাকরিতে যোগ দেওয়ার মাত্র কয়েক মাস পর থেকেই পাইভা প্রতিষ্ঠানের অর্থ নিজের কাছে সরিয়ে নিতে শুরু করেন। হিসাবের নথি ও ব্যাংক লেনদেনের তথ্য পরিবর্তন করে তিনি নিজের হিসাবে অর্থ পাঠানোর বিষয়টি আড়াল করার চেষ্টা করেন।

প্রসিকিউশন পক্ষের আইনজীবী হান্না উইলিয়ামস আদালতকে জানান, পাইভা প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত খরচের নাম সামান্য পরিবর্তন করে লেনদেনগুলোকে বৈধ খরচ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করতেন। এমনকি একটি হিসাবের ক্ষেত্রে কর কর্তৃপক্ষের নামের বানান পরিবর্তন করে দেওয়া হয়েছিল। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাব নম্বর ও অর্থ স্থানান্তরের পরিচিতি অপরিবর্তিত থাকায় পরে বিষয়টি শনাক্ত করা সম্ভব হয়।

চুরি করা অর্থ দিয়ে পাইভা নিজের জীবনযাপনকে ব্যাপকভাবে বিলাসবহুল করে তোলেন। তিনি একটি টেসলা গাড়ি, দামি পোশাক, বিলাসবহুল হাতব্যাগ, গয়না এবং বিভিন্ন পণ্য কেনেন। শুধু অ্যামাজন থেকেই তিনি প্রায় ১০ হাজার পাউন্ডের পণ্য কেনাকাটা করেন। এসবের মধ্যে ছিল ভ্যাপ ও গাড়ির বিভিন্ন সামগ্রী।

কেন্টের বক্সলিতে তার বাড়িতে পুলিশ তল্লাশি চালিয়ে হার্মেস, ক্রিশ্চিয়ান ডিওর ও সেলফরিজের মতো বিলাসবহুল ব্র্যান্ডের পণ্য, গয়না ও দামি হাতব্যাগের বাক্স উদ্ধার করে। এমনকি পুলিশ তল্লাশি চালানোর সময়ও একটি নতুন হাতব্যাগ তার বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল।

আদালতে পাইভার সাবেক সহকর্মীরা তার কর্মকাণ্ডে গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তারা বলেন, যাকে তারা বিশ্বাস করেছিলেন, সেই ব্যক্তিই পরিকল্পিতভাবে তাদের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন। চিকিৎসক লুইসা ডোভে তাকে সরাসরি ‘মিথ্যাবাদী ও চোর’ বলে আখ্যা দেন।

ডোভে আদালতে বলেন, প্রতিষ্ঠানটি কোনো বিশাল অচেনা সংস্থা নয়; সেখানে মাত্র আটজন মানুষ কাজ করেন এবং তাদের পরিবারগুলোর জীবিকা ওই চিকিৎসাকেন্দ্রের আয়ের ওপর নির্ভরশীল। পাইভার চুরির কারণে চিকিৎসাকেন্দ্রটি অতিরিক্ত স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার সুযোগ হারিয়েছে এবং প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতেও পড়েছিল বলে তিনি জানান।

আদালতে আরও জানানো হয়, আত্মসাৎ করা অর্থের একটি অংশ চিকিৎসকদের অতিরিক্ত কাজের পারিশ্রমিক হিসেবে ব্যবহারের কথা ছিল। ফলে অর্থ চুরির কারণে শুধু প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ক্ষতিই হয়নি, চিকিৎসাসেবার ওপরও এর প্রভাব পড়েছিল।

তবে বিচারক ক্রিস্টোফার হেহির তাৎক্ষণিক কারাদণ্ড না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। পাইভার দুই সন্তান—১২ ও চার বছর বয়সী—এবং তার ব্যক্তিগত পরিস্থিতিও সাজা নির্ধারণের সময় বিবেচনায় নেওয়া হয়।

বিচারক তার কর্মকাণ্ডের কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, পাইভা একজন সক্ষম ও বুদ্ধিমান নারী ছিলেন এবং অতীতে জীবনে যথেষ্ট সাফল্যও অর্জন করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার অপরাধের পেছনে মূল কারণ ছিল লোভ।

পাইভাকে তিন বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে, তবে সেই সাজা তিন বছরের জন্য স্থগিত রাখা হয়েছে। পাশাপাশি তাকে ২০ দিনের পুনর্বাসনমূলক কার্যক্রম সম্পন্ন করতে এবং ১৬০ ঘণ্টা বিনা পারিশ্রমিকে সামাজিক সেবা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

আদালতে সাজা ঘোষণার সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন পাইভা। তখন বিচারক তাকে সতর্ক করে বলেন, তিনি কারাগারের সেলে যাওয়ার ‘একেবারে চুলের ব্যবধানের’ মধ্যে চলে এসেছিলেন।

বিচারক একই সঙ্গে ব্রিটেনের কারাগারগুলোর ওপর প্রচণ্ড চাপের কথাও উল্লেখ করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, দেশের কারাগারগুলো বর্তমানে বন্দিতে প্রায় উপচে পড়ছে।

এদিকে আত্মসাৎ করা বিপুল অর্থের খুব সামান্য অংশই এখন পর্যন্ত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। মোট পাঁচ লাখ ১৭ হাজার পাউন্ডের বেশি চুরি হলেও প্রায় সাত হাজার পাউন্ড ফেরত পাওয়া গেছে।

চুরি করা অর্থ ও সম্পদ উদ্ধারের বিষয়ে আগামী বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি আদালতে পৃথক শুনানি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

আদালতে আরও জানানো হয়, পাইভার আগে কোনো অপরাধের রেকর্ড ছিল না। তিনি পদমর্যাদা ও দায়িত্বের সুযোগ ব্যবহার করে যে অর্থ আত্মসাৎ করেছিলেন, তা দিয়ে নিজের জন্য বিলাসবহুল জীবন গড়ে তুললেও তার কর্মকাণ্ডে একটি ছোট স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের কর্মী ও চিকিৎসকদের মধ্যে গভীর ক্ষোভ ও বিশ্বাসভঙ্গের সৃষ্টি হয়েছে।

সূত্রঃ জিবি নিউজ

এম.কে

আরো পড়ুন

টিউব স্ট্রাইক: ১০ নভেম্বর ভয়াবহ পরিবহন সংকটের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে লন্ডন

লন্ডন পুলিশের বিরুদ্ধে বর্ণবাদী, নারী ও সমকামীতা বিদ্বেষীর তকমা

‘রিফর্ম ইউকের ঘৃণাত্মক রাজনীতি সমাজকে ভেঙে দিচ্ছে’:জেরেমি করবিন