17.1 C
London
October 5, 2026
TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

যুক্তরাজ্যে তাপপ্রবাহে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকছে প্রাণঘাতী ভাইরাসবাহী হায়ালোমা টিক

যুক্তরাজ্যে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঘন ঘন তাপপ্রবাহ ও তুলনামূলক উষ্ণ আবহাওয়ার কারণে রোগজীবাণু বহনকারী হায়ালোমা টিক আগের তুলনায় দীর্ঘসময় টিকে থাকতে পারছে বলে সতর্ক করেছেন দেশটির স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে উষ্ণ বছরগুলোতে এসব টিক প্রাপ্তবয়স্ক পর্যায়ে পৌঁছাতে পারছে, যা যুক্তরাজ্যের টিক নজরদারিতে ধরা পড়ছে।

স্কাই নিউজের প্রতিবেদনে যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য সুরক্ষা সংস্থার মেডিক্যাল এনটোমোলজির প্রধান ড. জলিয়ন মেডলকের বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। তিনি জানান, তাপপ্রবাহের বছরগুলোতে হায়ালোমা টিকের নিম্ফ পর্যায় থেকে প্রাপ্তবয়স্ক পর্যায়ে যাওয়ার ঘটনা দেখা যাচ্ছে। গত প্রায় ১০ বছরে এমন ঘটনা পাঁচবারেরও কম ঘটেছে। তবে উত্তর ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও এ ধরনের ঘটনা তুলনামূলকভাবে বেশি নজরে আসছে।

টিক কোনো সাধারণ পোকা নয়; এটি একটি ক্ষুদ্র পরজীবী আর্থ্রোপড। মাকড়সা ও মাইটের সঙ্গে এর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। টিক সাধারণত কোনো প্রাণী বা মানুষের শরীরে আটকে রক্ত পান করে। এ সময় কোনো সংক্রমিত টিকের শরীরে থাকা রোগজীবাণু মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। ফলে টিক নিজে রোগ নয়, বরং নির্দিষ্ট কিছু রোগজীবাণুর বাহক হিসেবে কাজ করতে পারে।

হায়ালোমা টিকের কিছু প্রজাতি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এগুলো ক্রাইমিয়ান-কঙ্গো হেমোরেজিক জ্বরের ভাইরাসের প্রধান বাহক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এই রোগের মৃত্যুহার প্রায় ১০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। রোগটি আফ্রিকা, বলকান অঞ্চল, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার বিভিন্ন অংশে বেশি দেখা যায়।

হায়ালোমা টিকের ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্যের জন্য উদ্বেগের একটি কারণ হলো অভিবাসী পাখি। ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল ও আফ্রিকা থেকে যুক্তরাজ্যে আসা কিছু পাখির শরীরে নিম্ফ অবস্থায় এসব টিক ভেসে আসতে পারে। নিম্ফ হলো টিকের জীবনচক্রের মধ্যবর্তী একটি পর্যায়। পরে উপযুক্ত পরিবেশ পেলে টিকটি মোল্টিং বা খোলস পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রাপ্তবয়স্ক পর্যায়ে যেতে পারে।

আগে যুক্তরাজ্যের তুলনামূলক ঠান্ডা আবহাওয়ায় এসব টিক প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর দীর্ঘসময় টিকে থাকা কঠিন ছিল। কিন্তু উষ্ণ গ্রীষ্ম ও মৃদু শীতের কারণে পরিস্থিতি বদলাতে পারে। ড. মেডলক বলেছেন, সাধারণভাবে প্রায় ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাকে টিকের সক্রিয়তার গুরুত্বপূর্ণ সীমা হিসেবে ধরা হলেও তিনি ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাতেও টিক সক্রিয় থাকতে দেখেছেন। তার মতে, মৃদু শীত হলে টিক শীতকালেও সক্রিয় থাকতে পারে এবং উষ্ণ গ্রীষ্ম তাদের মৌসুমি আচরণে পরিবর্তন আনতে পারে।

সরকারি ঝুঁকি মূল্যায়নে অভিবাসী পাখির মাধ্যমে হায়ালোমা টিক যুক্তরাজ্যে প্রবেশের সম্ভাবনাকে সম্ভাব্য একটি পথ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। জলবায়ু উষ্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উত্তর ইউরোপের যেসব এলাকা আগে এই টিকের জন্য তুলনামূলকভাবে অনুপযোগী ছিল, সেসব এলাকায় টিকের টিকে থাকার সুযোগ বাড়তে পারে।

ক্রাইমিয়ান-কঙ্গো হেমোরেজিক জ্বরের সংক্রমণ সাধারণত আক্রান্ত টিকের কামড়ের মাধ্যমে হয়। সংক্রমিত প্রাণীর রক্ত বা টিস্যুর সংস্পর্শ থেকেও মানুষ আক্রান্ত হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, টিকের কামড়ের পর রোগটির ইনকিউবেশন সময় সাধারণত এক থেকে তিন দিন, তবে সর্বোচ্চ নয় দিন পর্যন্ত হতে পারে।

রোগের শুরুতে হঠাৎ জ্বর, পেশিতে ব্যথা, মাথাব্যথা, মাথা ঘোরা, ঘাড় ও পিঠে ব্যথা, চোখে ব্যথা বা আলো সহ্য করতে না পারা, বমি বমি ভাব ও বমি হতে পারে। গুরুতর অবস্থায় রক্তক্ষরণ, লিভারের সমস্যা এবং দ্রুত কিডনির অবনতি দেখা দিতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, গুরুতর রোগীদের ক্ষেত্রে হঠাৎ লিভার বা ফুসফুসের কার্যকারিতাও ব্যাহত হতে পারে।

হায়ালোমা টিক নিয়ে উদ্বেগের পেছনে তাই মূল বিষয় হলো জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে টিকের পরিবেশগত উপযোগিতা পরিবর্তনের সম্ভাবনা। ২০২৩ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় যুক্তরাজ্যের তাপমাত্রার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা হয়েছিল, অভিবাসী পাখির মাধ্যমে আসা হায়ালোমা টিকের নিম্ফ পর্যায় প্রাপ্তবয়স্ক পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে কি না এবং ভবিষ্যৎ উষ্ণ আবহাওয়ায় তাদের টিকে থাকার সুযোগ কীভাবে বদলাতে পারে।

গবেষণায় দেখা যায়, বসন্তের তাপমাত্রা মোল্টিংয়ের জন্য যথেষ্ট উষ্ণ হতে পারে, যদিও দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাজ্যে স্থায়ীভাবে এই টিকের জনসংখ্যা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার মতো পরিস্থিতি এখনো নিশ্চিত নয়।

ফলে উষ্ণ আবহাওয়ার কারণে একটি বিদেশি রোগবাহক পরজীবী টিকের যুক্তরাজ্যে সাময়িকভাবে বেঁচে থাকা ও প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ছে, যা ভবিষ্যতের জলবায়ু পরিবর্তনজনিত রোগঝুঁকি পর্যবেক্ষণের প্রয়োজনীয়তা বাড়িয়ে দিচ্ছে।

সূত্রঃ স্কাই নিউজ

এমকে

আরো পড়ুন

লেবার রাজনীতিবিদদের সরকারের নেয়া অভিবাসন ও আশ্রয় নীতির সমালোচনা

যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশিদের ৯০–৯৫ শতাংশই সিলেটি বংশোদ্ভূত

যুক্তরাজ্য লুটন কাউন্সিলে দেখা দিয়েছে ছাড়পোকা আতঙ্ক