যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে দ্রুত উত্থান ঘটানো রিফর্ম ইউকে এখন একই সঙ্গে রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা, অভিবাসনবিরোধী প্রচারণা এবং দলীয় অর্থায়ন নিয়ে একাধিক বিতর্কের মুখে পড়েছে। দলের নেতা নাইজেল ফারাজের নেতৃত্ব নিয়েও তৈরি হয়েছে নতুন অনিশ্চয়তা। এমন পরিস্থিতিতে দলটি ভবিষ্যতে ক্ষমতায় যাওয়ার যে উচ্চাকাঙ্ক্ষা দেখাচ্ছে, তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে বাড়ছে প্রশ্ন।
সম্প্রতি চ্যানেল ফোর নিউজের একটি গোপন ক্যামেরা তদন্তে রিফর্ম ইউকের দুই শীর্ষ কর্মকর্তা ড্যান জুকস ও জেমস অরকে বিদেশি অর্থায়ন সংক্রান্ত নিয়ম এড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাব্য উপায় নিয়ে আলোচনা করতে দেখা যায় বলে অভিযোগ ওঠে। প্রতিবেদনের পর দুজনই তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিজেদের দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ান।
তদন্তে অভিযোগ করা হয়, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে রিফর্ম ইউকের জন্য প্রায় ৩২ হাজার ৫০০ পাউন্ডের তিনটি জনমত জরিপের অর্থ দেওয়া হয়েছিল। ব্রিটিশ নির্বাচনী আইনে বিদেশি উৎস থেকে রাজনৈতিক দলকে অর্থ দেওয়া নিষিদ্ধ। বিষয়টি এখন রিফর্ম ইউকের অভ্যন্তরীণ তদন্তের পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনের নজরেও রয়েছে।
আরও গুরুতর অভিযোগ উঠে আসে সম্ভাব্য ৫ লাখ পাউন্ডের একটি বিদেশি অনুদান নিয়ে। গোপন ক্যামেরার ফুটেজে দলীয় কর্মকর্তাদের কথোপকথন ঘিরে অভিযোগ করা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের একজন কথিত ধনকুবেরের অর্থ যুক্তরাজ্যভিত্তিক মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে নেওয়ার পথ নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। তবে রিফর্ম ইউকে কোনো বেআইনি অর্থ গ্রহণের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ফারাজ এটিকে ‘এনট্র্যাপমেন্ট’ বা পরিকল্পিত ফাঁদ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
এর মধ্যেই ফারাজ নিজেও ৫ মিলিয়ন পাউন্ডের একটি উপহারের বিষয় নিয়ে পার্লামেন্টারি তদন্তের মুখে রয়েছেন। অভিযোগটি হলো, অর্থটি এমপিদের স্বার্থ-নিবন্ধনে ঘোষণা করা প্রয়োজন ছিল কি না। ফারাজ অবশ্য কোনো অনিয়মের কথা অস্বীকার করেছেন।
রিফর্ম ইউকের রাজনৈতিক কৌশলের অন্যতম প্রধান অস্ত্র অভিবাসন ইস্যু। ছোট নৌকায় ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেওয়া অভিবাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান, আশ্রয়প্রার্থীদের ফেরত পাঠানোর দাবি এবং সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ জোরদারের প্রতিশ্রুতিকে কেন্দ্র করে দলটি জনসমর্থন বাড়ানোর চেষ্টা করছে। সমালোচকদের অভিযোগ, অভিবাসন নিয়ে মানুষের উদ্বেগ ও ক্ষোভকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগিয়ে দলটি ভোটব্যাংক শক্তিশালী করছে। সাম্প্রতিক সময়ে ফারাজ ফ্রান্সের ন্যাশনাল র্যালির সঙ্গে অভিবাসনবিরোধী একটি অঙ্গীকারেও যুক্ত হয়েছেন, যা রাজনৈতিক বিতর্ক আরও বাড়িয়েছে।
তবে অভিবাসন নিয়ে কঠোর অবস্থান এবং ক্ষমতায় যাওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষার পাশাপাশি দলটির ভেতরের আর্থিক বিতর্ক এখন রিফর্ম ইউকের জন্য বড় রাজনৈতিক বোঝা হয়ে উঠছে। বিদেশি অর্থের অভিযোগ, অর্থের উৎস গোপন করার সম্ভাব্য কৌশল নিয়ে আলোচনা এবং দলীয় কর্মকর্তাদের পদত্যাগ—সব মিলিয়ে দলটির স্বচ্ছতা ও রাজনৈতিক নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই ফারাজের নিজের ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, রিফর্ম ইউকের কর্মী-সমর্থকদের বড় একটি অংশ যদি মনে করে জিয়া ইউসুফ তার চেয়ে ভালোভাবে দলকে নেতৃত্ব দিতে পারবেন, তাহলে তিনি সেই মতামতকে গুরুত্ব দেবেন। যদিও একইসঙ্গে ফারাজ বলেছেন, আগামী সাধারণ নির্বাচনে দলটির নেতৃত্ব দেওয়ার বিষয়ে তার কোনো সন্দেহ নেই।
জিয়া ইউসুফকে ফারাজ একজন অত্যন্ত প্রতিভাবান যোগাযোগকারী হিসেবে প্রশংসা করেছেন। ফলে রিফর্ম ইউকের ভেতরে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনা এখন আরও প্রকাশ্য হয়ে উঠেছে। তবে জিয়া ইউসুফকে দলটির নিশ্চিত উত্তরসূরি হিসেবে ঘোষণা করা হয়নি।
অন্যদিকে, জিয়া ইউসুফ নিজেও সম্প্রতি অভিবাসন ও পরিচয় নিয়ে বিতর্কিত বক্তব্যের কারণে সমালোচনার মুখে পড়েছেন। একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টে তিনি সোমালি বংশোদ্ভূত লেবার কাউন্সিল নেতা সাগাল আবদি-ওয়ালির ব্রিটিশ পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তোলার পর তার বিরুদ্ধে বর্ণবাদের অভিযোগ ওঠে। একজন মন্ত্রী ওই মন্তব্যকে সরাসরি বর্ণবাদ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
সব মিলিয়ে রিফর্ম ইউকের সামনে এখন দ্বিমুখী লড়াই—একদিকে অভিবাসনবিরোধী কঠোর রাজনীতিকে কাজে লাগিয়ে ক্ষমতার দিকে এগিয়ে যাওয়া, অন্যদিকে দলটির অর্থায়ন ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ঘিরে ওঠা বিতর্ক সামাল দেওয়া। গোপন ক্যামেরার তদন্তের পর দুই শীর্ষ কর্মকর্তার সরে দাঁড়ানো এবং ফারাজের নিজের নেতৃত্ব নিয়েও প্রশ্ন ওঠায় দলটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে।
রিফর্ম ইউকে কোনো আইন ভঙ্গের কথা অস্বীকার করছে এবং ফারাজ দাবি করছেন, দল কোনো অবৈধ অর্থ নেয়নি। তবে অভিযোগগুলোর তদন্ত এখনো চলমান। ফলে দলটি সত্যিই ব্রিটিশ রাজনীতিতে বিকল্প ক্ষমতাকেন্দ্র হিসেবে উঠে আসবে, নাকি একের পর এক বিতর্ক তার রাজনৈতিক উত্থানকে বাধাগ্রস্ত করবে—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
সূত্রঃ ডেইলি মেইল
এম.কে

