যুক্তরাজ্যের লন্ডনে বায়ুদূষণ কমাতে মেয়র সাদিক খানের নেওয়া পদক্ষেপ শহরটির পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এনেছে বলে দাবি করেছে রাজনৈতিক সংবাদমাধ্যম লেবারলিস্টে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণ। নিবন্ধটির লেখক জন মরিসের মতে, দূষণ নিয়ন্ত্রণে আলট্রা লো এমিশন জোন (ইউলেজ), কম নির্গমন অঞ্চল এবং স্কুলকেন্দ্রিক বিভিন্ন উদ্যোগের ফলে বাতাসের মান উন্নত হয়েছে। একই সঙ্গে শিশুদের ফুসফুসের বিকাশেও ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
লন্ডনের মেয়র নির্বাচিত হওয়ার সময় সাদিক খান এমন একটি শহরের দায়িত্ব নেন, যেখানে নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা দীর্ঘদিন ধরে আইনি সীমা অতিক্রম করছিল। নিবন্ধে বলা হয়েছে, ২০১০ সালে দূষণের সীমা কার্যকর হওয়ার পরও লন্ডন প্রতি বছর নির্ধারিত মাত্রা অতিক্রম করেছিল। বায়ুদূষণের কারণে শহরটিতে বছরে আনুমানিক চার হাজার মানুষের অকালমৃত্যু হতো বলে লন্ডন মেয়রের কার্যালয়ের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
দূষণ কমাতে ২০১৭ সালে পুরোনো যানবাহনের ওপর অতিরিক্ত চার্জ বা ‘টি-চার্জ’ চালু করা হয়। এরপর ২০১৯ সালে মধ্য লন্ডনে প্রথম আলট্রা লো এমিশন জোন কার্যকর হয়। ২০২১ সালে এটি উত্তর ও দক্ষিণ সার্কুলার সড়ক পর্যন্ত সম্প্রসারিত করা হয়। ২০২৩ সালে পুরো বৃহত্তর লন্ডনকে এই ব্যবস্থার আওতায় আনা হয়। ইউলেজের আওতায় নির্ধারিত নির্গমন মান পূরণ না করা যানবাহনকে নির্দিষ্ট এলাকায় চলাচলের জন্য চার্জ দিতে হয়।
কিংস কলেজ লন্ডনের গবেষকেরা ২০১৯ সালে মডেলিংয়ের মাধ্যমে অনুমান করেছিলেন, অতিরিক্ত ব্যবস্থা না নিলে লন্ডনের নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা আইনি সীমায় নামতে ১৯৩ বছর লাগতে পারে। তবে যুক্তরাজ্যের পরিবেশ, খাদ্য ও গ্রামীণ বিষয়ক দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে লন্ডন নির্ধারিত আইনি সীমায় পৌঁছায়। ফলে আগের পূর্বাভাসের তুলনায় প্রায় ১৮৪ বছর আগেই লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে বলে নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের বিশ্লেষণের বরাত দিয়ে নিবন্ধে আরও বলা হয়েছে, ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বায়ুদূষণের সঙ্গে সম্পর্কিত মৃত্যুর সংখ্যা আনুমানিক ৪০ শতাংশ কমেছে এবং নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা কমেছে ৪১ শতাংশ। তবে বায়ুদূষণের কারণে মৃত্যুর হিসাব সাধারণত পরিসংখ্যানভিত্তিক অনুমান; এগুলোকে প্রতিটি মৃত্যুর সরাসরি কারণ নির্ধারণের সমতুল্য হিসেবে দেখা যায় না।
শিশুদের ফুসফুসের স্বাস্থ্যের ওপর ইউলেজের প্রভাব নিয়ে কুইন মেরি ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের নেতৃত্বে পরিচালিত একটি গবেষণাও নিবন্ধে তুলে ধরা হয়েছে। ২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত লন্ডন ও লুটনের ৮৪টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছয় থেকে নয় বছর বয়সী তিন হাজার চার শতাধিক শিশুর ফুসফুসের কার্যক্ষমতা পর্যবেক্ষণ করা হয়। গবেষণার শুরুতে লন্ডনের শিশুদের ফুসফুসের কার্যক্ষমতা লুটনের শিশুদের তুলনায় কম ছিল। পাঁচ বছরের পর্যবেক্ষণ শেষে দুই এলাকার শিশুদের ফুসফুসের কার্যক্ষমতার মধ্যে ব্যবধান আর দেখা যায়নি বলে গবেষণার ফলাফলে উল্লেখ করা হয়েছে।
লন্ডনে চিকিৎসাগতভাবে কম ফুসফুসের কার্যক্ষমতা থাকা শিশুর অনুপাত ১৪ শতাংশ থেকে কমে ৯ শতাংশে নেমেছে। অন্যদিকে লুটনে এ হার ৯ শতাংশ থেকে কমে ৭ শতাংশ হয়েছে। গবেষণার সঙ্গে যুক্ত অধ্যাপক ক্রিস গ্রিফিথসের মতে, বায়ুদূষণের কারণে সৃষ্ট স্বাস্থ্যঝুঁকি প্রতিরোধ করা সম্ভব—এ বিষয়ে গবেষণাটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ দিয়েছে। শৈশবে ফুসফুসের পূর্ণ বিকাশ বাধাগ্রস্ত হলে পরবর্তী জীবনে হাঁপানি, হৃদরোগ ও বিপাকীয় রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
তবে ইউলেজ চালু ও সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধও ছিল। লন্ডনের বাইরের এলাকায় এই ব্যবস্থা সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে কনজারভেটিভ-নিয়ন্ত্রিত পাঁচটি স্থানীয় কর্তৃপক্ষ আইনি চ্যালেঞ্জ করেছিল। ইউলেজের বিরোধিতায় বিক্ষোভের পাশাপাশি নজরদারি ক্যামেরা ভাঙচুর ও চুরির ঘটনাও ঘটে। ২০২৩ সালের অক্সব্রিজ ও সাউথ রুইসলিপ উপনির্বাচনে কনজারভেটিভ পার্টি আসনটি ধরে রাখার পর লেবার নেতা কিয়ার স্টারমারও ইউলেজ নিয়ে রাজনৈতিক প্রভাব পর্যালোচনার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
শুধু ইউলেজ নয়, বিভিন্ন বরোতেও বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। লন্ডনের মেয়রের বায়ুমান তহবিল থেকে ২ কোটি ৭০ লাখ পাউন্ড বিতরণ করা হয়। এর সঙ্গে লেবার-নিয়ন্ত্রিত স্থানীয় কর্তৃপক্ষগুলোর প্রায় ২ কোটি পাউন্ডের অর্থায়ন যুক্ত হয়। ক্যামডেন, হ্যাকনি, ড্যাগেনহ্যাম ও সাউথওয়ার্কের মতো এলাকায় কম নির্গমন অঞ্চল, বৈদ্যুতিক গাড়ির চার্জিং পয়েন্ট, সাইকেল লেন এবং পথচারীবান্ধব অবকাঠামো উন্নয়নে অর্থ ব্যয় করা হয়।
ক্যামডেনের একটি এলাকায় এসব উদ্যোগের ফলে নাইট্রোজেন অক্সাইডের নির্গমন আনুমানিক ২৮ শতাংশ কমেছে বলে নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে। ল্যামবেথে স্কুলের আশপাশে যান চলাচল সীমিত করার ৪৫টি এলাকা, ২ দশমিক ৮ কিলোমিটার সুরক্ষিত সাইকেলপথ এবং শত শত বৈদ্যুতিক গাড়ির চার্জিং পয়েন্ট তৈরি করা হয়েছে। ওই বরোতে ২০১৬ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে আইনি সীমার বেশি নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইডের সংস্পর্শে থাকা স্কুলের সংখ্যা ১৯ থেকে কমে দুইয়ে দাঁড়ায়।
নিউহ্যাম বরোতেও দূষণ কমানোর বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়। ২০১৯ সালে পুরো এলাকাকে বায়ুমান ব্যবস্থাপনা অঞ্চল ঘোষণা করা হয়। যুক্তরাজ্যে প্রথমবারের মতো সেখানে সব প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বাইরে বায়ুমান পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল বলে নিবন্ধে বলা হয়েছে। ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ৬৭টি স্কুলকে ঘিরে ৪৯টি ‘স্কুল স্ট্রিট’ এলাকা গড়ে তোলা হয়। এসব স্কুলের আশপাশে নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা প্রকল্পের আওতাবহির্ভূত স্কুলগুলোর তুলনায় ৭ দশমিক ৪ শতাংশ কমেছে এবং হেঁটে স্কুলে যাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১০ শতাংশ বেড়েছে।
নিউহ্যামে ২০২১ সালের জানুয়ারিতে নির্গমনভিত্তিক পার্কিং চার্জও চালু করা হয়। নিবন্ধ অনুযায়ী, এই ব্যবস্থার পর বরোটিতে নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা ২ হাজার ৮৬০টি কমে যায়, যা লন্ডনের বরোগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ হ্রাস হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে নিবন্ধটির লেখক সতর্ক করেছেন, বায়ুদূষণের আইনি সীমা পূরণ করলেই বাতাস পুরোপুরি নিরাপদ হয়ে যায় না। যুক্তরাজ্যের বর্তমান আইনি সীমা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ করা বায়ুমানের নির্দেশিকার তুলনায় শিথিল। তাই শুধু লন্ডন নয়, যুক্তরাজ্যের অন্যান্য শহরেও বায়ুদূষণ কমাতে জাতীয় পর্যায়ে নতুন ‘ক্লিন এয়ার অ্যাক্ট’ প্রণয়নের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
সূত্রঃ লেবারলিস্টে জন মরিসের প্রকাশিত বিশ্লেষণ
এমকে

