TV3 BANGLA
আন্তর্জাতিক

সিআইএ প্রধানের মস্কো সফরের পরই রাশিয়ার আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ

ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে রাশিয়া ও পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর পরিচালক জন র‍্যাটক্লিফের আকস্মিক মস্কো সফরের কয়েক দিনের মধ্যেই রাশিয়া পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম একটি আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাজ্যকে ‘বিপর্যয়কর পরিণতি’র হুমকি দিয়েছে মস্কো।

রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, উত্তর-পশ্চিম রাশিয়ার প্লেসেতস্ক কসমোড্রোম থেকে পরীক্ষামূলকভাবে একটি পারমাণবিক সক্ষম আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য, ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাটির কৌশলগত, কারিগরি ও উড্ডয়ন বৈশিষ্ট্য যাচাই করাই ছিল পরীক্ষার উদ্দেশ্য। তবে সিআইএ প্রধানের মস্কো সফরের পরপরই এই পরীক্ষা হওয়ায় পশ্চিমা বিশ্লেষকদের কাছে এটি রাশিয়ার একটি কৌশলগত বার্তা হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।

র‍্যাটক্লিফ মঙ্গলবার মস্কো সফর করে রুশ গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। রাশিয়ার বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান সের্গেই নারিশকিন বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। ক্রেমলিন জানিয়েছে, বৈঠকের ফলাফল সম্পর্কে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে অবহিত করা হয়েছে। তবে আলোচনার বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি।

সফরটি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, র‍্যাটক্লিফ রাশিয়াকে ন্যাটোর সদস্যদেশগুলোর বিরুদ্ধে সংঘাত বাড়ানো থেকে বিরত থাকার সতর্কবার্তা দিয়েছেন। পলিটিকোর প্রতিবেদনে বিশেষভাবে এস্তোনিয়া, লাটভিয়া ও লিথুয়ানিয়ার প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। অন্যদিকে নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, র‍্যাটক্লিফ রাশিয়াকে যুদ্ধ শেষ করার জন্য সমঝোতায় যাওয়ার আহ্বান জানানোর পাশাপাশি দেশটির সামরিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আগেই পদক্ষেপ নিতে বলেছেন।

তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প র‍্যাটক্লিফের সফরের গুরুত্ব কমিয়ে দেখিয়েছেন। তার দাবি, র‍্যাটক্লিফ রুশ সমকক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন এবং সফরটি অস্বাভাবিক কোনো বার্তা দেওয়ার উদ্দেশ্যে ছিল না। ট্রাম্প একই সঙ্গে বলেছেন, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ন্যাটোর কোনো ভূখণ্ডে হামলা করবেন না।

এর মধ্যেই যুক্তরাজ্যকে সরাসরি সতর্ক করেছে মস্কো। রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা বলেছেন, লন্ডন যদি ইউক্রেনকে রাশিয়ার ভেতরে হামলার জন্য ব্রিটিশ অস্ত্র ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া বন্ধ না করে, তাহলে এর ‘বিপর্যয়কর পরিণতি’ হতে পারে। এর আগে রুশ পক্ষ যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সকে ইউক্রেনের প্রতি সমর্থনের বিষয়ে ‘আগুন নিয়ে খেলা’র অভিযোগে সতর্ক করেছিল।

পশ্চিমা কর্মকর্তারা অবশ্য রাশিয়ার এই হুমকিকে নতুন কিছু হিসেবে দেখছেন না। তাদের মূল্যায়ন, মস্কো ন্যাটোর সঙ্গে সরাসরি সামরিক সংঘাতে জড়াতে চায় না। তবে ইউক্রেনকে পশ্চিমা সামরিক সহায়তা এবং রাশিয়ার অভ্যন্তরে দূরপাল্লার হামলা নিয়ে মস্কোর কঠোর অবস্থান পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।

যুদ্ধক্ষেত্রেও দুই পক্ষের হামলা ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। ইউক্রেনের বিমানবাহিনীর দাবি অনুযায়ী, রাশিয়া এক রাতে ইউক্রেনের দিকে ১৬৪টি ড্রোন ছুড়েছে। সুমি অঞ্চলে রুশ গ্লাইড বোমা হামলায় ৬১ বছর বয়সী এক ব্যক্তি নিহত এবং সাতজন আহত হয়েছেন বলে স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। পাল্টা হিসেবে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রাতভর ৫১২টি ইউক্রেনীয় ড্রোন ধ্বংস করেছে।

ইউক্রেনীয় বাহিনী রাশিয়ার ইয়ারোস্লাভল অঞ্চলের একটি তেল শোধনাগারেও হামলা চালিয়েছে বলে কিয়েভ জানিয়েছে। ইউক্রেনের দাবি, স্থাপনাটি সম্মুখসারির যুদ্ধক্ষেত্র থেকে প্রায় এক হাজার কিলোমিটার দূরে। একই সময়ে ইউক্রেনীয় বাহিনী রাশিয়ার এঙ্গেলস বিমানঘাঁটিতে একটি তু-৯৫এমএস কৌশলগত বোমারু বিমানেও আঘাত হেনেছে বলে প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন।

ইউক্রেনের হামলার প্রভাব রাশিয়ার জ্বালানি খাতেও পড়ছে। রয়টার্সের উদ্ধৃত শিল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর হিসাবে, আগস্টের শেষ দিকে রাশিয়ার পেট্রোল উৎপাদন অভ্যন্তরীণ চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশে নেমে এসেছে। কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তেল শোধনাগারে ড্রোন হামলার পর কার্যক্রম বন্ধ বা ব্যাহত হওয়ায় দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে আবারও জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে।

পশ্চিমা কর্মকর্তাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মূল্যায়ন হলো, রাশিয়ার সেনাবাহিনীর ওপর জনবল সংকটের চাপ বাড়ছে। তাদের হিসাবে, ইউক্রেনে প্রতি মাসে প্রায় ৩৬ হাজার রুশ সেনা নিহত ও আহত হচ্ছে। বিপরীতে মস্কো প্রতিদিন প্রায় এক হাজার নতুন চুক্তিভিত্তিক সেনা নিয়োগ করতে পারছে। ফলে মাসিক হিসাবে রাশিয়ার সেনা ক্ষয় নতুন নিয়োগের চেয়ে প্রায় ছয় হাজার বেশি।

এই পরিস্থিতিতে রাশিয়া চলতি শরতে নতুন করে সেনা সমাবেশ বা মোবিলাইজেশন শুরু করতে পারে বলে জল্পনা তৈরি হয়েছে। তবে এমন পদক্ষেপ রুশ সরকারের জন্য রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে বলে পশ্চিমা কর্মকর্তারা মনে করছেন। যুদ্ধের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ইতোমধ্যে রাশিয়ার অর্থনীতি, জ্বালানি সরবরাহ ও জনজীবনে চাপ তৈরি করছে।

ইউক্রেনের দিকেও পরিস্থিতি ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে। দেশটির কৃষিমন্ত্রী তারাস ভিসোৎস্কির দাবি, রুশ হামলায় খাদ্য সংরক্ষণের গুদামগুলোর প্রায় ৯০ শতাংশ সক্ষমতা ধ্বংস হয়েছে এবং খুচরা খাদ্য সরবরাহব্যবস্থার বড় অংশ বিঘ্নিত হয়েছে। তবে বিকল্প সরবরাহব্যবস্থার মাধ্যমে খাদ্য সরবরাহ অব্যাহত রাখার চেষ্টা চলছে বলে তিনি জানিয়েছেন।

দক্ষিণাঞ্চলীয় খেরসনেও শীতের আগে উদ্বেগ বাড়ছে। স্থানীয় কর্মকর্তারা কয়েক হাজার বাসিন্দাকে অঞ্চলটি ছেড়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের আশঙ্কা, রুশ হামলায় বিদ্যুৎ ও তাপ সরবরাহ দীর্ঘ সময়ের জন্য বন্ধ হয়ে যেতে পারে। স্থানীয় প্রশাসনের দাবি, ১ জুলাই থেকে খেরসনে ১৭০টি গ্লাইড বোমা এবং গত দুই মাসে ১,৭০০টির বেশি আক্রমণাত্মক ড্রোন ব্যবহার করেছে রাশিয়া।

এদিকে ইউরোপের ন্যাটো দেশগুলোর প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। মার্কিন ও ন্যাটো কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ইউরোপে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ব্যবস্থার মজুত ‘গুরুতর সংকটজনক’ পর্যায়ে পৌঁছেছে। রাশিয়ার উচ্চগতির ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে গুরুত্বপূর্ণ এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ঘাটতি ইউরোপীয় নিরাপত্তার জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।

ইউক্রেনের শীর্ষ প্রেসিডেন্ট উপদেষ্টা কিরিলো বুদানভ অবশ্য জানিয়েছেন, যুদ্ধ নিয়ে নতুন করে প্রযুক্তিগত আলোচনা খুব শিগগিরই হতে পারে। তার ভাষ্য, আলোচনার পাশাপাশি ‘বড় কিছু’র প্রস্তুতি চলছে। তবে যুদ্ধ এখনই শেষ হবে—এমন প্রত্যাশাকে তিনি ‘অবাস্তব’ বলে উল্লেখ করেছেন।

রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে মূল বিরোধের জায়গাগুলো এখনো অমীমাংসিত। মস্কো পূর্বাঞ্চলীয় দনবাস থেকে ইউক্রেনীয় বাহিনী প্রত্যাহারের দাবি করছে। কিয়েভ তার নিয়ন্ত্রণে থাকা ভূখণ্ড ছেড়ে দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে। ফলে সম্ভাব্য আলোচনার পথ খোলা থাকলেও দ্রুত কোনো শান্তিচুক্তিতে পৌঁছানো এখনো কঠিন বলেই পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে।

সূত্রঃ স্কাই নিউজ

এম.কে

আরো পড়ুন

যুক্তরাষ্ট্রে ভয়ংকর মাদক ফেন্টানিলের কাঁচামাল পাঠাচ্ছে ভারতঃ তুলসী গ্যাবার্ডের দপ্তর

আমেরিকাতে উপস্থিতিকাল ৪ বছরের বেশি নয়ঃ বিদেশি শিক্ষার্থী, অধ্যাপকদের জন্য নয়া ভিসানীতি

কোনো পক্ষই হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা হুমকির মুখে ফেলতে পারে নাঃ কাতার