18.6 C
London
August 16, 2026
TV3 BANGLA
আন্তর্জাতিকফিচার

সূর্যগ্রহণে সূর্যের রহস্য উন্মোচনে নতুন তথ্য পেলেন বিজ্ঞানীরা

সূর্যগ্রহণ শুধু আকাশে বিরল ও মনোমুগ্ধকর দৃশ্য তৈরিই করে না, বিজ্ঞানীদের জন্য এটি সূর্য ও পৃথিবীর নানা অজানা বিষয় বোঝারও গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করে। ২০২৬ সালের সূর্যগ্রহণকে কাজে লাগিয়ে বিজ্ঞানীরা সূর্যের বায়ুমণ্ডল, সৌরবায়ু এবং পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের ওপর সূর্যের প্রভাব সম্পর্কে নতুন তথ্য সংগ্রহ করেছেন।

যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন এলাকায় দেখা যাওয়া এবারের সূর্যগ্রহণের সময় লাখো মানুষ চাঁদের ধীরে ধীরে সূর্যের সামনে চলে আসার বিরল দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেন। চাঁদ সূর্যের একটি বড় অংশ ঢেকে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দিনের আলোও অনেকটা ম্লান হয়ে আসে। তবে সাধারণ দর্শকের পাশাপাশি এ সময় গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণে ব্যস্ত ছিলেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গবেষকেরা।

পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের সবচেয়ে বড় বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব হলো—এ সময় সূর্যের বাইরের বায়ুমণ্ডল, যাকে ‘করোনা’ বলা হয়, তুলনামূলকভাবে স্পষ্টভাবে পর্যবেক্ষণ করা যায়। সূর্যের উজ্জ্বল চাকতি চাঁদ ঢেকে দেওয়ায় করোনার সূক্ষ্ম গঠন ও আচরণ বিজ্ঞানীদের সামনে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।

সূর্যের করোনা নিয়ে গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সূর্যের বিপুল শক্তি কীভাবে উৎপন্ন ও ছড়িয়ে পড়ে এবং সৌরবায়ুর মাধ্যমে কীভাবে মহাকাশে প্রবাহিত হয়, তা বোঝার সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। সৌরবায়ুর পরিবর্তন পৃথিবীর যোগাযোগব্যবস্থা, উপগ্রহ এবং বিদ্যুৎ অবকাঠামোর ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই সূর্যগ্রহণকে মহাকাশ গবেষণার অন্যতম কার্যকর প্রাকৃতিক পরীক্ষাগার হিসেবে ব্যবহার করে আসছেন। এর ঐতিহাসিক উদাহরণ ১৯১৯ সালের পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ। ওই গ্রহণের সময় তোলা আলোকচিত্রের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করেছিলেন, শক্তিশালী মহাকর্ষ কীভাবে আলোর গতিপথ বাঁকিয়ে দেয়। সেই পর্যবেক্ষণ আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্বের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষামূলক সমর্থন হিসেবে বিবেচিত হয়।

আধুনিক প্রযুক্তির যুগেও প্রাকৃতিক পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের গুরুত্ব কমেনি। বিজ্ঞানীরা ‘করোনাগ্রাফ’ নামের বিশেষ যন্ত্র ব্যবহার করে সূর্যের উজ্জ্বল অংশ আড়াল করে কৃত্রিমভাবে গ্রহণের মতো পরিবেশ তৈরি করতে পারেন। তবে এসব যন্ত্রের কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ফলে সূর্যের একেবারে ভেতরের করোনা পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক পূর্ণগ্রাস গ্রহণ এখনো বিশেষ সুবিধা দেয়।

এবারের গ্রহণেও গবেষণার পরিধি ছিল ব্যাপক। নাসা ও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা বৈজ্ঞানিক বেলুন, বিশেষায়িত উড়োজাহাজ এবং বিভিন্ন ধরনের পর্যবেক্ষণ সরঞ্জাম ব্যবহার করে তথ্য সংগ্রহ করেছেন। আইসল্যান্ড ও স্পেনসহ গ্রহণ পর্যবেক্ষণের উপযোগী এলাকায় পরিচালিত এসব গবেষণার লক্ষ্য ছিল গ্রহণের সময় সূর্য ও পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে ঘটে যাওয়া পরিবর্তন আরও নিখুঁতভাবে বোঝা।

সূর্যগ্রহণের সময় পৃথিবীর নির্দিষ্ট অঞ্চলে সূর্যালোকের পরিমাণ দ্রুত পরিবর্তিত হয়। এই পরিবর্তন বিজ্ঞানীদের পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে সূর্যের প্রভাব বিশ্লেষণের সুযোগ দেয়। বিশেষ করে বায়ুমণ্ডলের ওপরের স্তরে সূর্যের শক্তির প্রভাবে আধানযুক্ত কণার যে স্তর তৈরি হয়, তার আচরণ পর্যবেক্ষণেও গ্রহণের তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

গবেষকদের কাছে এর আরেকটি বড় গুরুত্ব হলো ‘মহাকাশের আবহাওয়া’ সম্পর্কে পূর্বাভাস আরও নির্ভুল করা। সূর্যের কার্যকলাপের কারণে সৃষ্ট ঝড় বা বিকিরণ পৃথিবীর উপগ্রহ যোগাযোগ, নেভিগেশন ব্যবস্থা এবং বিদ্যুৎ অবকাঠামোতে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটাতে পারে। সূর্যের আচরণ সম্পর্কে উন্নত জ্ঞান এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ বাড়াতে পারে।

২০২৪ সালে উত্তর আমেরিকায় পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের সময়ও নাসা ব্যাপক গবেষণা চালিয়েছিল। বায়ুমণ্ডল পর্যবেক্ষণে বৈজ্ঞানিক বেলুন ব্যবহার থেকে শুরু করে গ্রহণের গতিপথজুড়ে বিশেষ পর্যবেক্ষণ দল মোতায়েন—বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ তথ্য সংগ্রহ করা হয়।

এবারের গবেষণার তথ্য আগের গ্রহণগুলোর সংগৃহীত তথ্যের সঙ্গে তুলনা করে সূর্যের আচরণ সম্পর্কে আরও দীর্ঘমেয়াদি ধারণা তৈরি করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, একাধিক সূর্যগ্রহণের তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করলে সূর্যের করোনা ও সৌর কার্যকলাপের পরিবর্তন আরও ভালোভাবে বোঝা সম্ভব হবে।

শুধু ২০২৬ সালের গ্রহণেই গবেষণা শেষ হচ্ছে না। আগামী ২০২৭ সালের সূর্যগ্রহণকে ঘিরেও বিজ্ঞানীরা আরও বড় পরিসরে পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ধারাবাহিকভাবে সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে সূর্যের রহস্য, সৌরবায়ুর আচরণ এবং পৃথিবীর ওপর সূর্যের প্রভাব সম্পর্কে আরও নির্ভুল বৈজ্ঞানিক ধারণা পাওয়ার আশা করছেন তারা।

ফলে আকাশে কয়েক মিনিটের একটি বিরল অন্ধকারের দৃশ্যের আড়ালে যে বৈজ্ঞানিক সম্ভাবনা লুকিয়ে থাকে, তা কেবল সৌন্দর্য উপভোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সূর্যগ্রহণ এখন বিজ্ঞানীদের কাছে মহাবিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক গবেষণাগার—যেখান থেকে সূর্য, পৃথিবী এবং মহাকাশের পারস্পরিক সম্পর্ক সম্পর্কে নতুন জ্ঞান অর্জনের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

সূত্রঃ দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট

এম.কে

আরো পড়ুন

ম্যাক্রোঁর দল হারলে কী ঘটবে ফ্রান্সের ভাগ্যে?

মদিনায় ২১ লাখ বৃক্ষরোপণ করল সৌদি সরকার

নিউজ ডেস্ক

নেপালে উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত: নিহত ৬৮