যুক্তরাজ্যে সরকার পরিবর্তনের প্রাক্কালে লেবার পার্টির নতুন নেতা ও আগামী প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম বিতর্কিত জাতীয় ডিজিটাল পরিচয়পত্র (ডিজিটাল আইডি) প্রকল্প বাতিলের ঘোষণা দিয়ে নতুন রাজনৈতিক বার্তা দিয়েছেন। সোমবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের আগেই তিনি স্পষ্ট করেছেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমারের সময়ে প্রস্তাবিত এই প্রকল্পে আর এগোনো হবে না। বরং এ খাতে বরাদ্দ সময়, অর্থ ও জনবল জনগণের জন্য অধিক গুরুত্বপূর্ণ খাতে, বিশেষ করে জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর উদ্যোগে ব্যয় করা হবে।
আসন্ন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, নতুন সরকারের প্রথম অগ্রাধিকার হবে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আনা। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, হোয়াইটহলে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত না রেখে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে আরও ক্ষমতায়ন করা হবে এবং দেশের প্রতিটি অঞ্চলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও নতুন আশার পরিবেশ তৈরি করাই হবে সরকারের মূল লক্ষ্য।
স্যার কিয়ার স্টারমার অবৈধভাবে কাজ করা রোধ এবং সরকারি সেবায় পরিচয় যাচাই সহজ করতে জাতীয় ডিজিটাল আইডি চালুর পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে শুরু থেকেই এই পরিকল্পনা লেবার পার্টির ভেতর এবং বাইরে ব্যাপক বিরোধিতার মুখে পড়ে। দলের শীর্ষ নেতাদের আপত্তি, কনজারভেটিভ ও রিফর্ম ইউকের সমালোচনা এবং নাগরিক স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগের কারণে সরকার পরে নীতিতে পরিবর্তন আনতে বাধ্য হয়। বাধ্যতামূলক ডিজিটাল আইডির পরিবর্তে কর্মীদের পাসপোর্ট বা ই-ভিসার মতো প্রচলিত নথি ব্যবহার করে কাজের অধিকার প্রমাণের সুযোগ দেওয়া হয়।
তবে অ্যান্ডি বার্নহ্যামের নতুন ঘোষণার পরও কনজারভেটিভ পার্টি প্রশ্ন তুলেছে, প্রকল্পটি আদৌ পুরোপুরি বাতিল করা হচ্ছে, নাকি এটি শুধুই রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তনের ঘোষণা। দলটির ছায়া প্রযুক্তিমন্ত্রী জুলিয়া লোপেজ অভিযোগ করেছেন, জনগণের অপছন্দের একটি প্রকল্পে ইতোমধ্যেই বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। তার দাবি, বাধ্যতামূলক ডিজিটাল আইডি থেকে সরকার আগেই সরে এসেছিল এবং এখন বার্নহ্যাম এমন একটি সিদ্ধান্তের কৃতিত্ব নেওয়ার চেষ্টা করছেন, যা পূর্বেই নেওয়া হয়েছিল। তিনি নতুন প্রধানমন্ত্রীর প্রতি প্রকল্পের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়ার আহ্বান জানান।
এদিকে সাম্প্রতিক জনমত জরিপে দেখা গেছে, ডিজিটাল আইডি ব্যবস্থা চালু হলে নাগরিকদের ওপর সরকারি নজরদারি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা নিয়ে ব্রিটিশদের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ রয়েছে। ডেল্টাপোল পরিচালিত এক জরিপে অংশ নেওয়া প্রতি ১০ জনের প্রায় ৬ জনই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, এ ধরনের ব্যবস্থা সরকারের নজরদারির হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। একই জরিপে ৭৪ শতাংশ উত্তরদাতা সম্ভাব্য সাইবার হামলা ও ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
এই পরিস্থিতিতে নাগরিক স্বাধীনতা বিষয়ক সংগঠন লিবার্টি নতুন সরকারের প্রতি ডিজিটাল আইডি প্রকল্পের পাশাপাশি মুখাবয়ব শনাক্তকরণ প্রযুক্তির ব্যবহার থেকেও সরে আসার আহ্বান জানিয়েছে। সংগঠনটির মতে, নাগরিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও স্বাধীনতা রক্ষায় এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহারের আগে আরও কঠোর নিরাপত্তা ও জবাবদিহির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
অ্যান্ডি বার্নহ্যামের এই সিদ্ধান্তকে তার নেতৃত্বের প্রথম বড় নীতিগত পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে প্রকল্পটি সম্পূর্ণভাবে বাতিল হবে, নাকি সংশোধিত আকারে ভবিষ্যতে আবারও ফিরিয়ে আনা হবে—সে বিষয়ে সরকারের আনুষ্ঠানিক নীতিপত্র প্রকাশের পরই চূড়ান্ত চিত্র স্পষ্ট হবে।
সূত্রঃ জিবি নিউজ
এম.কে

