21.8 C
London
September 19, 2026
TV3 BANGLA
ফিচারবিনোদনযুক্তরাজ্য (UK)

‘ইউকেবিসি ২০২৬’: শিকড়, সংস্কৃতি ও একাত্মতার অনন্য মিলনমেলা কেমব্রিজ, যুক্তরাজ্য।

যুক্তরাজ্যের ঐতিহাসিক ও বিদ্যাপীঠের শহর কেমব্রিজে বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হলো দুই দিনব্যাপী ‘ইউকে বেঙ্গলি কনভেনশন (ইউকেবিসি) ২০২৬’। বিগত ছয় বছর ধরে UKBC এই আয়োজন করে আসছে ব্রিটেনের বিভিন্ন প্রান্তে, শুরুটা হয়েছিলো কেমব্রিজেই, আবার ৬ বছর পর এই উৎসব আবারো ফিরে এলো কেমব্রিজে।

গত শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) শুরু হয়ে রোববার পর্যন্ত চলা এই সম্মেলন যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন প্রান্তে বসবাসরত প্রবাসী বাঙালিদের এক প্রাণের মেলায় পরিণত হয়েছিল। কেমব্রিজের ক্যামবর্ন সিক্সথ ফর্ম ভিলেজ কলেজে আয়োজিত এই মহা-সম্মেলনে সুর, ছন্দ, শিল্পকলা এবং ঐতিহ্যের অপূর্ব সংমিশ্রণ ঘটে।

‘ইউকে বেঙ্গলি ডায়াসপোরা ফোর নেশনস প্লাস ইউরোপ’-এর উদ্যোগে আয়োজিত এই কনভেনশনটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিক সাংস্কৃতিক উৎসব ছিল না; বরং এটি হয়ে উঠেছিল প্রবাসে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের সঙ্গে বাঙালির ঐতিহ্য, ভাষা, সাহিত্য ও শিকড়ের মেলবন্ধন রচনার এক শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম।

বহুমাত্রিক সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের উদযাপন:
দুই দিনব্যাপী এ আয়োজনে ছিল বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। বিভিন্ন অডিটোরিয়াম ও মঞ্চে একযোগে পরিবেশিত হয় সংগীত, নৃত্য, নাটক, সাহিত্য আড্ডা, কবিতা আবৃত্তি এবং বিতর্ক ও প্যানেল ডিসকাশন। শিশুদের সৃজনশীল বিকাশ ও শিকড়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে ছিল বিশেষ কর্মশালা ও আয়োজন। পাশাপাশি মেলায় আগত দর্শনার্থীদের জন্য ছিল ঐতিহ্যবাহী বাঙালি খাবার, পোশাক, অলংকার ও লোকশিল্পের বর্ণিল স্টল।

সম্মেলনের অন্যতম বড় আকর্ষণ ছিল ‘ইউকেবিসি আর্ট অ্যান্ড স্কাল্পচার এক্সিবিশন ২০২৬’। শিল্পী মিলি বসু রায়ের তত্ত্বাবধানে শিল্পী ঊর্মি রায়ের কিউরেশনে যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা বাঙালি শিল্পীদের চিত্রকর্ম, ভাস্কর্য ও কারুশিল্প এ প্রদর্শনীতে স্থান পায়। শিল্পকর্ম প্রদর্শনের পাশাপাশি নিজেদের সৃষ্টিশীল চিন্তাভাবনা ও গল্প বিনিময়ের মধ্য দিয়ে শিল্পীদের মাঝে এক চমৎকার মেলবন্ধন গড়ে ওঠে।

উৎসবের ফ্যাশন ও ভিজ্যুয়াল অংশে দর্শকদের মুগ্ধ করেছে ‘তরঙ্গ: আ মিস্টিক রানওয়ে ফ্যান্টাসি’ (TARANGA: A Mystic Runway Fantasy) শীর্ষক ফ্যাশন শো, যা প্রযোজনা করেছে ‘ফোর কুইনস প্রোডাকশন’ (4Queens Production)। বাংলার আবহমান ঐতিহ্যের তেরো পার্বণকে তেরোটি গল্পের মতো করে রানওয়েতে তুলে ধরা হয়।

“ইউকেবিসি-র মানুষই ইউকেবিসি”: একতার অনন্য দর্শন
ইউকেবিসি-র মূল চালিকাশক্তি কোনো বাণিজ্যিক স্বার্থ বা নিছক পেশাদার ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট নয়; বরং এর শক্তি নিহিত রয়েছে প্রবাসী বাঙালি সম্প্রদায়ের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে। আয়োজক ও ট্রাস্টিদের মতে, এটি কেবল টিকিট কেটে অনুষ্ঠান দেখে বাড়ি ফেরার মতো কোনো বাণিজ্যিক আয়োজন নয়—এটি সম্পূর্ণ কমিউনিটির নিজস্ব একটি ‘শেয়ার্ড স্পেস’।

সম্মেলনের প্রাণ ছিলেন শত শত নিঃস্বার্থ ভলান্টিয়ার, শিল্পী, কোঅর্ডিনেটর ও সাধারণ মানুষ, যাঁরা কোনো আর্থিক পারিশ্রমিক ছাড়াই শত শত ঘণ্টার স্বেচ্ছাশ্রম ও ভালোবাসা দিয়ে এ মহাযজ্ঞকে সফল করেছেন। কলকাতা ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের শিল্পীদের পাশাপাশি যুক্তরাজ্যের স্থানীয় প্রতিভাদের জাতীয় স্তরে একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম প্রদান করাই ছিল এই আয়োজনের মূল লক্ষ্য।

সম্মেলনে অংশ নেওয়া এক স্বেচ্ছাসেবক অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, “এখানে এসে কিছুক্ষণ পরই মনে হয়—‘এটা তো আমাদেরই কনভেনশন।’ এই আন্তরিক টান আর আত্মিক ভালোবাসাই ইউকেবিসি-র আসল শক্তি।”

এই সম্মেলনে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি প্রবাসী বাংলাদেশি শিল্পীদের প্রতিষ্ঠান ‘আলয়’ অন্যতম সহ-আয়োজক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।

কেমব্রিজের মনোরম পরিবেশে আনন্দ, অনুভূতি আর স্মৃতির আদান-প্রদানের মধ্য দিয়ে পর্দা নামল ইউকেবিসি ২০২৬-এর। প্রবাসের মাটিতে নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এই মহোৎসব প্রমাণ করল—দূরত্ব যতই হোক না কেন, বাঙালির হৃদয় সবসময়ই তার শিকড়ের টানে এক সুতোয় বাঁধা।

ডা. অমিয় আহসান

কেমব্রিজ, যুক্তরাজ্য
১৯/০৯/২৬

আরো পড়ুন

রুয়ান্ডা বিল এবং বিভিন্ন ইস্যুতে চাপে পড়েছে কনজারভেটিভ সরকার

ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর টুইটার-ইউটিউব হ্যাকিংয়ের কবলে

যুক্তরাজ্যে খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়ার আশঙ্কাঃ জাঙ্ক ফুড নীতিতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত