আফগানিস্তানের দক্ষিণাঞ্চলের কান্দাহার শহরতলীর একটি সাধারণ বাড়ি এখন অসংখ্য অসুস্থ মানুষের শেষ আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে। প্রাণঘাতী রোগ থেকে মুক্তির আশায় প্রতিদিন সেখানে ভিড় করছেন শত শত মানুষ—যাদের অনেকেই আধুনিক চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত।
বাড়িটির একটি কক্ষে দেখা যায় অসুস্থ নারী, পুরুষ ও শিশুদের ভিড়। কেউ বসে, কেউ শুয়ে অপেক্ষা করছেন এক ব্যক্তির জন্য—নেদা মোহাম্মদ কাদরি। নিজেকে ‘পীর’ বা কবিরাজ পরিচয় দেওয়া এই ব্যক্তি দাবি করেন, তার আধ্যাত্মিক ক্ষমতার মাধ্যমে ক্যান্সার ও থ্যালাসেমিয়ার মতো জটিল রোগের উপশম সম্ভব।
তার চিকিৎসা পদ্ধতি বিতর্কিত। একটি বোতল থেকে পানি পান করে তা রোগীদের ওপর ছিটিয়ে দেন তিনি। তার দাবি, ঈশ্বরের কৃপায় এই প্রক্রিয়াতেই রোগীরা সুস্থ হয়ে ওঠেন। তবে তার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মীয় বা চিকিৎসা শিক্ষা নেই।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা-এর তথ্য অনুযায়ী, আফগানিস্তানে প্রতি বছর ২৪ হাজারের বেশি মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হন এবং প্রায় ১৭ হাজার মানুষ মারা যান। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি, কারণ দেশে পর্যাপ্ত হাসপাতাল, চিকিৎসক ও নির্ণয় সুবিধার অভাব রয়েছে।
এই সংকটের সুযোগেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে আধ্যাত্মিক চিকিৎসা। চিকিৎসা ব্যয়ের উচ্চতা, হাসপাতালের অভাব এবং সীমিত স্বাস্থ্যসেবা মানুষকে ঠেলে দিচ্ছে এসব বিকল্প পদ্ধতির দিকে।
একসময় কান্দাহারের বাসিন্দারা সহজেই পাকিস্তান-এ গিয়ে উন্নত চিকিৎসা নিতে পারতেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সংঘর্ষের কারণে চামান–স্পিন বোলদাক সীমান্তে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। ভিসা ছাড়া যাতায়াত বন্ধ হওয়ায় রোগীদের জন্য চিকিৎসা পাওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
এছাড়া পাকিস্তান থেকে ওষুধ আমদানির ওপরও নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে, যা স্থানীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।
নাজির আহমদ মাইওয়ান্দওয়ালের স্ত্রী শুকরিয়ার গল্প এই সংকটের প্রতিচ্ছবি। ব্রেন টিউমারের অপারেশনের পর কিছুটা সুস্থ হলেও পুনরায় চিকিৎসার জন্য পাকিস্তানে যেতে পারেননি ভিসা জটিলতার কারণে। শেষ পর্যন্ত চিকিৎসার অভাবে ২৪ বছর বয়সেই তার মৃত্যু হয়।
অন্যদিকে, হাবিবুল্লাহ তার ক্যান্সার আক্রান্ত ছেলে আসাদকে নিয়ে কাদরির কাছে যান শেষ আশায়। কিন্তু কোনো উন্নতি না হয়ে পথেই মৃত্যু হয় আসাদের। পরিবারের অভিযোগ, মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে তাদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হয়েছে।
কিছু রোগী অভিযোগ করেছেন, কাদরি তাদের সেফট্রিয়াক্সনসহ অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ দিয়েছেন, যা ক্যান্সারের চিকিৎসায় কার্যকর নয়। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এসব ওষুধ ব্যবহার করলে ড্রাগ রেজিস্ট্যান্সসহ গুরুতর জটিলতা দেখা দিতে পারে।
তবে কাদরি দাবি করেন, তিনি কাউকে চিকিৎসা নিতে বাধা দেন না এবং রোগীরা স্বেচ্ছায় তাকে অর্থ দেন।
চিকিৎসাবিদদের মতে, আধ্যাত্মিক বা ঝাড়ফুঁক চিকিৎসা মানসিক স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু এটি কখনোই বৈজ্ঞানিক চিকিৎসার বিকল্প নয়। দেরিতে সঠিক চিকিৎসা নেওয়ার কারণে অনেক রোগীর অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যায়।
২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতায় আসার পর আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটি-এর মতো সংস্থাও অর্থসংকটের কারণে কিছু সহায়তা স্থগিত করেছে।
ফলে হাসপাতালগুলোতে ওষুধ ও সরঞ্জামের ঘাটতি দেখা দিয়েছে, এবং রোগীদের নিজেদের খরচে চিকিৎসা চালাতে হচ্ছে।
আফগানিস্তানের বাস্তবতায় চিকিৎসা সংকট, দারিদ্র্য এবং সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ মিলিয়ে সাধারণ মানুষ এক কঠিন অবস্থার মুখোমুখি। অনেকেই শেষ আশ্রয় হিসেবে ঝুঁকছেন আধ্যাত্মিক চিকিৎসার দিকে—যেখানে আশার চেয়ে প্রতারণার অভিযোগই বেশি।
তবুও কান্দাহারের সেই বাড়ির সামনে প্রতিদিন ভিড় বাড়ছে—কারণ তাদের কাছে হারানোর মতো আর কিছু নেই, শুধু ক্ষীণ একটুখানি আশা ছাড়া।
সূত্রঃ বিবিসি বাংলা
এম.কে

