TV3 BANGLA
বাংলাদেশ

আমেরিকার সঙ্গে বাংলাদেশের নতুন দিগন্তঃ বিশ্বমঞ্চে ঢাকার জন্য অপেক্ষা করছে বড় সুযোগ

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া সাম্প্রতিক চিঠিকে ঘিরে ঢাকা-ওয়াশিংটন সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপথ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। চিঠির তাৎক্ষণিক বিষয় বাংলাদেশের বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত হলেও এর ভাষা ও সময়ে দুই দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হওয়ার সম্ভাবনার ইঙ্গিত রয়েছে।

চিঠিতে বোয়িং কেনার সিদ্ধান্তের জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন ট্রাম্প। একই সঙ্গে বাংলাদেশের জনগণের প্রতি শুভেচ্ছা জানিয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন তিনি। ভবিষ্যতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের প্রত্যাশার কথাও জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

বোয়িংয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্ভাব্য সম্পর্ক শুধু উড়োজাহাজ কেনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। উড়োজাহাজ কেনার পর রক্ষণাবেক্ষণ, যন্ত্রাংশ সরবরাহ, কারিগরি প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি ও দীর্ঘমেয়াদি সেবা চুক্তির মতো বিষয় যুক্ত থাকে। ফলে এই ক্রয়াদেশকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের বিমান চলাচল খাতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আরও বিস্তৃত সহযোগিতার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

বাংলাদেশ চাইলে বিমান রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত ও ওভারহল বা এমআরও খাতের উন্নয়নেও এ সম্পর্ক কাজে লাগাতে পারে। পাশাপাশি দক্ষ প্রকৌশলী ও কারিগরি জনশক্তি তৈরি, প্রশিক্ষণ এবং উড়োজাহাজ-সংশ্লিষ্ট সরবরাহব্যবস্থায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। তবে এসব সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ দিতে হলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও পৃথক সহযোগিতা কাঠামো প্রয়োজন হবে।

বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক অবস্থানও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরের কাছাকাছি অবস্থান, আঞ্চলিক বাণিজ্যপথ এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তার কারণে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে বাংলাদেশের গুরুত্ব বাড়ছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে এই অঞ্চলে কৌশলগত প্রতিযোগিতাও তীব্র হচ্ছে।

চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের অবকাঠামো, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। বাংলাদেশের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পেও চীনের বড় ধরনের অংশগ্রহণ রয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি বাজার এবং বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা সহযোগিতার সম্ভাব্য অংশীদার। ফলে দুই দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রে ঢাকার জন্য ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে বহুমুখী অংশীদারত্বের কৌশল আরও গুরুত্ব পেতে পারে। অর্থাৎ কোনো একটি শক্তির বলয়ে আবদ্ধ না হয়ে প্রয়োজন ও জাতীয় স্বার্থ অনুযায়ী বিভিন্ন দেশের সঙ্গে পৃথক ক্ষেত্রে সহযোগিতা করা। চীনের কাছ থেকে অবকাঠামো ও শিল্প সহযোগিতার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও বাজার সুবিধা নেওয়া এমন কৌশলের অংশ হতে পারে।

তবে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিযোগিতার মধ্যে ভারসাম্য রাখা বাংলাদেশের জন্য সহজ হবে না। ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর উদ্যোগ যেন চীনের বিরুদ্ধে অবস্থান হিসেবে বিবেচিত না হয়, আবার বেইজিংয়ের সঙ্গে অতিরিক্ত কৌশলগত ঘনিষ্ঠতাও যেন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগের কারণ না হয়—এ বিষয়টি ঢাকার কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

ট্রাম্প ও তারেক রহমানের মধ্যে ভবিষ্যতে সরাসরি বৈঠক হলে আলোচনার পরিধি বোয়িং কেনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পাশাপাশি প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং রোহিঙ্গা সংকটের মতো বিষয়ও আলোচনায় আসতে পারে।

বাংলাদেশের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক সম্প্রসারণেরও বড় সুযোগ রয়েছে। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি ওষুধ, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষিপণ্য, চামড়া এবং উচ্চমূল্যের শিল্পপণ্যের বাজার সম্প্রসারণ করা গেলে দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হতে পারে। একই সঙ্গে মার্কিন প্রযুক্তি ও বিনিয়োগকে দেশের শিল্পায়ন ও দক্ষতা উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ রয়েছে।

প্রতিরক্ষা খাতেও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সংগ্রহে বহুমুখী অংশীদারত্ব বাংলাদেশের সক্ষমতা বাড়াতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে কোনো একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি না করে কৌশলগত স্বাধীনতা বজায় রাখাকে গুরুত্ব দিতে হবে।

ট্রাম্পের চিঠিতে তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রশংসাও রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। নতুন সরকারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিবাচক যোগাযোগের ইঙ্গিত হিসেবে এটিকে দেখা যেতে পারে। তবে চিঠির বক্তব্যকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কোনো নির্দিষ্ট পক্ষের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক সমর্থন হিসেবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ নেই।

দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত যোগাযোগের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন পরিবর্তিত হলেও যাতে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সহযোগিতা অব্যাহত থাকে, সে জন্য কংগ্রেস, পররাষ্ট্র দপ্তর, ব্যবসায়ী মহল, বিনিয়োগকারী ও নীতিনির্ধারণী বিভিন্ন স্তরে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজন রয়েছে।

একইভাবে চীনের সঙ্গেও রাজনৈতিক যোগাযোগের বাইরে অর্থনীতি, বাণিজ্য, প্রযুক্তি, শিক্ষা ও অবকাঠামো খাতে দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক জোরদার করা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এতে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি পরিবর্তিত হলেও বিভিন্ন অংশীদারের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ভিত্তি স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হবে।

সব মিলিয়ে ট্রাম্পের চিঠিকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মৌলিক পরিবর্তনের ঘোষণা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। একইভাবে বোয়িং কেনার সিদ্ধান্তও এককভাবে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে বাংলাদেশের কৌশলগত ঝুঁকে পড়ার প্রমাণ নয়। তবে চিঠিটি দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইতিবাচক রাজনৈতিক বার্তা এবং ভবিষ্যৎ উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগের সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছে।

বাংলাদেশের সামনে এখন বড় সুযোগ হলো যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, জাপান ও ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ককে পরস্পরের বিকল্প হিসেবে না দেখে জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে কাজে লাগানো। বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার মধ্যে কোনো পক্ষের অনুসারী না হয়ে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, নিরাপত্তা ও উন্নয়নের জন্য প্রতিটি অংশীদারের কাছ থেকে সর্বোচ্চ সুবিধা আদায় করাই ঢাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

বোয়িং কেনাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে নতুন যোগাযোগ তৈরি হয়েছে, সেটি ভবিষ্যতে বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদারত্বে রূপ নেয় কি না, এখন সেটিই দেখার বিষয়। শেষ পর্যন্ত এই সম্পর্কের সাফল্য নির্ভর করবে বাংলাদেশ কতটা দক্ষতার সঙ্গে নিজের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থকে সামনে রেখে ওয়াশিংটনের সঙ্গে নতুন সুযোগগুলো কাজে লাগাতে পারে তার ওপর।

সূত্রঃ নিউ এজ, বাসস

এম.কে

আরো পড়ুন

দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে ব্যস্ত হাসিনা সরকারের কূটনীতিকরা!

আসছে ‘নাগরিক সেবা বাংলাদেশ’, -এক ঠিকানায় সব সেবা

কুখ্যাত এপস্টেইন ফাইলে হাসিনার নাম, গোপন সমঝোতার চাঞ্চল্যকর তথ্য