18 C
London
June 7, 2026
TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

উচ্চ জ্বালানি ব্যয়ে সংকটে ব্রিটেনের রাসায়নিক শিল্পঃ বড় বিনিয়োগ ছাড়া টিকে থাকা কঠিন

যুক্তরাজ্যের রাসায়নিক শিল্প খাত গভীর সংকটের মুখোমুখি। শিল্প সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, বিশ্বের অন্যতম উচ্চ শিল্প জ্বালানি ব্যয়, প্রতিযোগিতাহীন উৎপাদন পরিবেশ এবং বর্তমান নেট জিরো নীতির কারণে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন খাতগুলো ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। এতে শুধু রাসায়নিক শিল্প নয়, কৃষি, ওষুধ, জ্বালানি ও উন্নত উৎপাদন শিল্পের ভবিষ্যৎও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

সম্প্রতি ব্রিটিশ চ্যান্সেলর র‍্যাচেল রিভস গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক সরবরাহ ব্যবস্থা সুরক্ষায় ৩৫০ মিলিয়ন পাউন্ডের ‘ক্রিটিক্যাল কেমিক্যালস রেজিলিয়েন্স ফান্ড’ ঘোষণা করেছেন। একই সঙ্গে সংকটে থাকা সিরামিক শিল্পের জন্য আরও ১২০ মিলিয়ন পাউন্ড সহায়তার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। তবে শিল্প বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব পদক্ষেপ ইতিবাচক হলেও এগুলো কেবল সমস্যার সাময়িক সমাধান; প্রকৃত সংকট মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি শিল্প ও জ্বালানি কৌশল প্রয়োজন।

বিশ্লেষকদের মতে, রাসায়নিক শিল্প আধুনিক অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি। সার উৎপাদনে ব্যবহৃত অ্যামোনিয়া, প্লাস্টিক ও ওষুধ শিল্পের মূল উপাদান ইথিলিনসহ অসংখ্য মৌলিক রাসায়নিকের ওপর নির্ভর করে হাজারো পণ্য উৎপাদন। ফলে এই খাতের দুর্বলতা সরাসরি কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা, জ্বালানি ও উৎপাদন শিল্পে প্রভাব ফেলে।

শিল্প সংশ্লিষ্টদের দাবি, ৩৫০ মিলিয়ন পাউন্ডের তহবিল একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা হলেও খাতটিকে আগামী দুই দশকের জন্য প্রতিযোগিতামূলক রাখতে কয়েক বিলিয়ন পাউন্ডের বিনিয়োগ প্রয়োজন। তবে যুক্তরাজ্যে উৎপাদন ব্যয় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগীদের তুলনায় অনেক বেশি হওয়ায় বেসরকারি খাত বড় বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছে।

বিশেষ করে শিল্প জ্বালানির মূল্য বর্তমানে যুক্তরাজ্যের উৎপাদনকারীদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অ্যামোনিয়া ও ইথিলিনের মতো রাসায়নিক উৎপাদনে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি প্রয়োজন হয়। ফলে উচ্চ জ্বালানি ব্যয়ের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য দেশে উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া অলাভজনক হয়ে পড়ছে। এর পরিণতিতে কিছু কোম্পানি উৎপাদন কার্যক্রম বিদেশে সরিয়ে নিচ্ছে।

এর ফলে যুক্তরাজ্য ধীরে ধীরে গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল ও রাসায়নিক পণ্যের জন্য আমদানিনির্ভর হয়ে পড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি সরবরাহ ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা দুর্বল করছে এবং বৈশ্বিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব বাড়িয়ে দিচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা ও উপসাগরীয় অঞ্চলের অনিশ্চয়তা এই ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।

এদিকে বর্তমান নেট জিরো নীতির কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। সমালোচকদের মতে, কার্বন নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্যে নেওয়া কিছু নীতি শিল্প ও ভোক্তা উভয়ের ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু বাস্তবে দেশীয় উৎপাদন কমে যাওয়ায় আমদানি বৃদ্ধি পাচ্ছে, ফলে বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণ কমার পরিবর্তে অন্য দেশে স্থানান্তরিত হচ্ছে।

বর্তমানে যুক্তরাজ্য যে ‘টেরিটোরিয়াল এমিশন’ পদ্ধতিতে কার্বন নিঃসরণ হিসাব করে, সেখানে শুধুমাত্র দেশের ভেতরে উৎপাদিত পণ্যের নিঃসরণ অন্তর্ভুক্ত হয়। তবে আমদানিকৃত পণ্য উৎপাদনের সময় সৃষ্ট কার্বন নিঃসরণ, আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন ও বিমান পরিবহনের নিঃসরণ এতে বিবেচনায় নেওয়া হয় না। ফলে দেশীয় উৎপাদন কমে গেলেও সরকারি পরিসংখ্যানে কার্বন নিঃসরণ হ্রাস পেয়েছে বলে দেখা যেতে পারে।

শিল্প বিশ্লেষকদের মতে, এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে নেট জিরো অর্জনের জন্য আরও ভারসাম্যপূর্ণ ও বাস্তবসম্মত কৌশল প্রয়োজন। নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে যুক্তরাজ্য উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করলেও শিল্প প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বজায় রাখার বিষয়টি সমান গুরুত্ব পাওয়া উচিত।

তাদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে রাসায়নিক শিল্পের পাশাপাশি আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন খাত সক্ষমতা, দক্ষ জনশক্তি ও অর্থনৈতিক মূল্য হারাবে। ফলে কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ এবং জাতীয় অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারের সাম্প্রতিক আর্থিক সহায়তা সঠিক পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলেও এটিকে চূড়ান্ত সমাধান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। যুক্তরাজ্যের শিল্পখাতকে টেকসই ও প্রতিযোগিতামূলক রাখতে জ্বালানি মূল্য, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং নেট জিরো বাস্তবায়ন কৌশলের ব্যাপক পুনর্মূল্যায়ন জরুরি হয়ে পড়েছে।

সূত্রঃ সিটি এএম

এম.কে

আরো পড়ুন

ব্রিটিশ পার্লামেন্টে নিষিদ্ধ চীনা রাষ্ট্রদূত

হামাস–ইসরায়েল ইস্যুতে পদত্যাগের চাপে ব্রিটেনের লেবার পার্টির প্রধান

যুক্তরাজ্যে গ্রিন পার্টির ডেপুটি নেতা মতিন আলী ও তার পরিবারকে ঘিরে বর্ণবাদী উসকানি