উত্তর আয়ারল্যান্ডের রাজধানী বেলফাস্টে ছুরিকাঘাতের একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। বিভিন্ন এলাকায় মুখোশধারী বিক্ষুব্ধ জনতা বাড়িঘর, যানবাহন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়েছে। আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে কয়েকটি বাড়ি, একটি বাস এবং একাধিক দোকানে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ও দমকল বাহিনীকে ব্যাপক তৎপরতা চালাতে হয়েছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমগুলোর খবরে বলা হয়েছে, উত্তর বেলফাস্টে সংঘটিত এক ছুরিকাঘাতের ঘটনায় এক সুদানি আশ্রয়প্রার্থীকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে অভিযুক্ত করার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনাটির ভিডিও দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে কট্টর ডানপন্থি কয়েকটি গোষ্ঠী প্রতিবাদের ডাক দেয়। এরপরই শহরের বিভিন্ন এলাকায় উত্তেজনা সহিংস রূপ নেয়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় জানা গেছে, বেলফাস্টের শ্যাঙ্কিল রোড এলাকায় মুখোশধারী কয়েকজন একটি বাড়ির দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করে। তারা ইট-পাটকেল ছুড়ে জানালা ভাঙচুর করে। ওই বাড়িতে জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের একটি পরিবার বসবাস করছিল বলে জানা গেছে। হামলাকারীদের কেউ কেউ বাড়িটি “মুক্ত” করার দাবি করে স্লোগান দিতে থাকে। আশপাশের দেয়ালে “স্থানীয় মানুষের জন্য স্থানীয় বাড়ি” ধরনের বর্ণবাদী বার্তাও দেখা যায়।
একই সময়ে পূর্ব বেলফাস্টের নিউটাউনআর্ডস রোড এলাকায় একটি বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। ঘটনাস্থলে পৌঁছে দমকল কর্মীরা আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালালেও আগুনের শিখা রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ে। এছাড়া একটি যাত্রীবাহী বাস পুড়িয়ে দেওয়া হয় এবং রাস্তাজুড়ে ভাঙা কাচ, পোড়া ময়লার পাত্র ও ধ্বংসাবশেষ পড়ে থাকতে দেখা যায়।
শ্যাঙ্কিল রোড এলাকায় দুটি মোবাইল ফোনের দোকানে লুটপাটের ঘটনাও ঘটে। পাশাপাশি একটি আফ্রিকান মালিকানাধীন দোকানে অগ্নিসংযোগ করা হয়। দমকল বাহিনীর সদস্যরা আগুন নেভানোর চেষ্টা চালানোর সময়ও কিছু মানুষ দূর থেকে দাঁড়িয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে দেখা যায়।
পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে, ঘটনাস্থলের কাছে অবস্থান করা পুলিশ সদস্যরা প্রাথমিকভাবে হস্তক্ষেপকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করেন। পরে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হলেও অধিকাংশ বিক্ষুব্ধ ব্যক্তি এলাকা ত্যাগ করে।
উত্তর আয়ারল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার মিশেল ও’নিল এই ঘটনাগুলোকে “নিরেট সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড” হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, “মুখোশধারী ব্যক্তিদের দ্বারা পরিবারগুলোকে বাড়িঘর থেকে বের করে দেওয়া জঘন্য কাপুরুষতা ছাড়া কিছু নয়। এর সঙ্গে সম্প্রদায়ের কল্যাণের কোনো সম্পর্ক নেই। এটি নিছক তাণ্ডব।”
তিনি আরও বলেন, “একটি নৃশংস ঘটনার সুযোগ নিয়ে নিরপরাধ মানুষদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হচ্ছে। বর্ণবাদ, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং সহিংসতার কোনো স্থান নেই।”
উত্তর আয়ারল্যান্ডবিষয়ক ব্রিটিশ মন্ত্রী হিলারি বেনও সহিংসতার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “মানুষ ছুরিকাঘাতের ঘটনায় স্বাভাবিকভাবেই ক্ষুব্ধ। কিন্তু পুলিশকে তাদের দায়িত্ব পালন করতে দিতে হবে। আইন তার নিজস্ব গতিতে চলতে হবে।”
তার ভাষায়, “এই ধরনের বিশৃঙ্খলা শুধু সম্প্রদায়গুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং নিরীহ মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। এ ধরনের তাণ্ডবের কোনো যৌক্তিকতা নেই।”
এদিকে, উত্তর আয়ারল্যান্ডের বিচারমন্ত্রী নাওমি লং অভিযোগ করেন, কিছু ব্যক্তি জনগণের প্রকৃত উদ্বেগ ও ক্ষোভকে নিজেদের উদ্দেশ্য হাসিলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। তিনি বলেন, “মুখোশধারী সন্ত্রাসীদের রাস্তায় নেমে মানুষকে ভয় দেখানো কিংবা সম্পদের ক্ষতি করার কোনো বৈধতা নেই। ঘৃণাকে জিততে দেওয়া যাবে না।”
ডেপুটি ফার্স্ট মিনিস্টার এমা লিটল-পেঙ্গেলিও শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, “সহিংসতা কোনো আন্দোলনকে এগিয়ে নেয় না; বরং সেটিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। একজনের অপরাধের দায় নিরপরাধ মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া সম্পূর্ণ ভুল।”
রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেলফাস্টে ভারী বৃষ্টিপাত শুরু হলে উত্তেজিত জনতার বড় একটি অংশ ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। তবে তাদের রেখে যাওয়া পুড়ে যাওয়া যানবাহন, ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘর এবং ধ্বংসস্তূপ শহরটির অস্থির পরিস্থিতিরই সাক্ষ্য বহন করছে।
স্থানীয় কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং নতুন করে সহিংসতা ঠেকাতে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। পুলিশ সাধারণ জনগণকে গুজব ও উসকানিমূলক প্রচারণা থেকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে।
সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান
এম.কে

