ছোট নৌকায় করে ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে যুক্তরাজ্যে অবৈধভাবে প্রবেশ ঠেকাতে ফ্রান্সকে শত শত মিলিয়ন পাউন্ড দেওয়া হলেও কাঙ্ক্ষিত ফল মিলছে না বলে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য সান-এর এক বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে, ফরাসি কর্তৃপক্ষ যে সংখ্যক অভিবাসীকে বাস্তবে থামাতে সক্ষম হয়েছে, সেই হিসাবে প্রতিজনের জন্য গড়ে প্রায় ৮ হাজার ৮৪ পাউন্ড ব্যয় করছে যুক্তরাজ্য।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের মে মাস থেকে উত্তর ফ্রান্স উপকূল থেকে যুক্তরাজ্যের উদ্দেশে ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করা ৫০ হাজার ৯০৩ জন অভিবাসীকে আটকানো হয়েছে। একই সময়ে সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদারে ফ্রান্সের সঙ্গে বিভিন্ন চুক্তির আওতায় ৪১১ দশমিক ৫ মিলিয়ন পাউন্ড ব্যয় বা বরাদ্দ দিয়েছে যুক্তরাজ্য।
এই অর্থের মধ্যে চলতি বছরের এপ্রিল থেকে জুলাই পর্যন্ত সময়ের জন্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমারের সময় স্বাক্ষরিত চুক্তির আওতায় আনুমানিক ৭৩ দশমিক ৫ মিলিয়ন পাউন্ড রয়েছে। এছাড়া ২০২৩ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাকের করা ৪৭৬ মিলিয়ন পাউন্ডের চুক্তি এবং চলতি বছরে স্বাক্ষরিত ৬৬২ মিলিয়ন পাউন্ডের নতুন সীমান্ত সহযোগিতা চুক্তির অর্থও এই হিসাবের অংশ।
তবে নতুন চুক্তির ১৬১ মিলিয়ন পাউন্ড ফলাফলের ওপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ, ফ্রান্স যদি অবৈধ পারাপার রোধে নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জন করতে না পারে, তাহলে পুরো অর্থ পাবে না।
অভিবাসন নিয়ন্ত্রণবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর মাইগ্রেশন কন্ট্রোল-এর প্রতিনিধি রবার্ট বেটস অভিযোগ করেন, ফরাসি পুলিশ অগভীর পানিতে নৌকা নামার পর অনেক ক্ষেত্রেই আর হস্তক্ষেপ করে না। ফলে যারা একবার ব্যর্থ হয়, তারা কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহ পর আবার একইভাবে পারাপারের চেষ্টা করে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে উত্তর ফ্রান্সে অবৈধ পারাপার ঠেকানোর হার আগের বছরের তুলনায় কমেছে। জানুয়ারি থেকে জুলাইয়ের শেষ পর্যন্ত মোট প্রচেষ্টার ৩৪ দশমিক ৮ শতাংশ ঠেকানো সম্ভব হয়েছে, যেখানে ২০২৫ সালের একই সময়ে এই হার ছিল ৩৯ শতাংশ।
জুনের ১৫ থেকে ২১ তারিখের মধ্যে ১ হাজার ৯১২ জন অভিবাসী যুক্তরাজ্যে পৌঁছাতে সক্ষম হলেও ফরাসি কর্তৃপক্ষ আটকাতে পেরেছে মাত্র ৮০০ জনকে। আবার মার্চের শেষের এক সপ্তাহে পুলিশ মাত্র ৩৯ জনকে থামাতে সক্ষম হলেও ২৭২ জন সফলভাবে নৌযাত্রা শুরু করেন।
এছাড়া ১৯ থেকে ২৬ জুলাই, অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম দায়িত্ব নেওয়ার সপ্তাহে ৮৮১ জন অভিবাসী যুক্তরাজ্যে পৌঁছান, বিপরীতে ফরাসি কর্তৃপক্ষ প্রতিরোধ করে ৫০৪ জনকে।
শনিবার উত্তর ফ্রান্সের একটি সৈকতে মানবপাচারকারীদের নৌকা ছাড়ার ঘটনাও প্রত্যক্ষ করেছে দ্য সান। সংবাদমাধ্যমটির দাবি, সৈকতে শিশুদের খেলাধুলার মধ্যেই শতাধিক অভিবাসী লাইফ জ্যাকেট পরে একটি রাবারের নৌকার দিকে হেঁটে যান। পরে প্রায় ৮০ জন নৌকায় উঠতে সক্ষম হন, আর জায়গা না হওয়ায় আরও প্রায় ২০ জন ফিরে যান।
প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম ডোভারে উপকূলরক্ষী ও সীমান্ত নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে বলেন, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণে অগ্রগতি হচ্ছে। তার ভাষায়, চলতি সময় পারাপারের জন্য সবচেয়ে ব্যস্ত মৌসুম হলেও সামগ্রিকভাবে অবৈধ পারাপারের সংখ্যা কমেছে এবং দেশে অবৈধভাবে অবস্থানকারীদের ফেরত পাঠানোর সংখ্যা বেড়েছে। তবে সীমান্তের ওপর জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ বলেন, অভিবাসন অপরাধ দমনে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। তিনি জানান, অভিবাসনসংক্রান্ত অপরাধ তদন্তে নিয়োজিত কর্মকর্তার সংখ্যা ৩৭৬ থেকে বাড়িয়ে ৭৯১ জন করা হয়েছে। পাশাপাশি ফ্রান্সের সঙ্গে নতুন চুক্তির আওতায় সৈকতে নজরদারি, গোয়েন্দা তৎপরতা এবং মানবপাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করা হয়েছে।
সরকারের দাবি, এসব উদ্যোগের ফলে এখন পর্যন্ত ১ হাজার ১০০টির বেশি নৌকা ও ইঞ্জিন জব্দ করা হয়েছে, যা ব্যবহার করে ৭২ হাজারেরও বেশি অবৈধ পারাপার সম্ভব হতে পারত। এছাড়া নির্বাচনের পর থেকে ৪৬ হাজারের বেশি অবৈধ পারাপারের চেষ্টা প্রতিরোধ করা হয়েছে।
তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দ্য সান-এর প্রকাশিত ৪১১ দশমিক ৫ মিলিয়ন পাউন্ড ব্যয়ের হিসাব মানতে রাজি নয়। মন্ত্রণালয়ের দাবি, প্যারিসের সঙ্গে সীমান্ত সহযোগিতা চুক্তির আওতায় এখন পর্যন্ত প্রকৃত অর্থে ৩৪২ মিলিয়ন পাউন্ড পরিশোধ করা হয়েছে। তবে সেই হিসাবেও প্রতিজন অভিবাসীকে থামাতে ব্যয় দাঁড়ায় ৬ হাজার ৭০০ পাউন্ডের বেশি, যা সীমান্ত নিরাপত্তা ব্যয় নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
সূত্রঃ দ্য সান
এম.কে

