TV3 BANGLA
আন্তর্জাতিক

এশিয়াজুড়ে ভয়াবহ তাপপ্রবাহ, দক্ষিণ কোরিয়ায় মাঠেই ‘সেদ্ধ’ আলু

এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে চলমান তীব্র তাপপ্রবাহে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন, কৃষি ও প্রাণিজগৎ। সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি দক্ষিণ কোরিয়া। দেশটিতে ১২২ বছরের মধ্যে সবচেয়ে তীব্র দাবদাহের সময় মাটির নিচে থাকা কাঁচা আলু ক্ষেতেই নরম হয়ে ‘সেদ্ধ’ আলুর মতো হয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত গরমে প্রাণহানি ও কৃষিতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে।

দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনের বরাতে বাংলাদেশ প্রতিদিন জানায়, সিউল থেকে প্রায় ১৩০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে গ্যাংওন প্রদেশের ইয়াংগু কাউন্টির আলুচাষি লি সাং-হিউক সম্প্রতি মাটি খুঁড়ে দেখতে পান, সংরক্ষণ করার মতো ফসল প্রায় অবশিষ্ট নেই। অথচ মাত্র এক সপ্তাহ আগেও তার খেতের আলুগুলো স্বাভাবিক ছিল। পরে মাটি থেকে তোলা আলুগুলো অস্বাভাবিকভাবে নরম হয়ে যাওয়ায় কৃষকেরা তীব্র তাপের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

দক্ষিণ কোরিয়ার আবহাওয়া দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২ আগস্ট দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় শহর ইয়াংসানে তাপমাত্রা ৪২ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়। ১৯০৪ সালের পর এটিই দেশটির সর্বোচ্চ তাপমাত্রা হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছে।

তীব্র গরমে শুধু কৃষি নয়, মানুষের জীবন ও প্রাণিজগতও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দেশটির রোগ নিয়ন্ত্রণ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, তাপপ্রবাহে এখন পর্যন্ত অন্তত ৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে ৯ লাখের বেশি গবাদিপশু এবং খামারে পালিত প্রায় ১৪ লাখ মাছ মারা গেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কর্তৃপক্ষ তাপ সতর্কতা জারি করে মানুষকে বাইরের কার্যক্রম সীমিত বা বন্ধ রাখার আহ্বান জানিয়েছে।

দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ংও এমন চরম আবহাওয়া দেশটি আগে দেখেনি বলে মন্তব্য করেছেন। তার মতে, ভবিষ্যতে এ ধরনের আবহাওয়া ‘নিউ নরমাল’ বা নতুন স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে পরিণত হতে পারে। এ কারণে জাতীয় সংকট মোকাবিলার ব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তনের প্রয়োজন রয়েছে বলেও তিনি মন্ত্রিসভাকে জানিয়েছেন।

তাপপ্রবাহের প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে প্রতিবেশী দেশ জাপানেও। দেশটির বিভিন্ন এলাকায় তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি উঠেছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় জাপানের আবহাওয়া সংস্থা ৪০ ডিগ্রি বা তার বেশি তাপমাত্রার জন্য ‘কোকুশোবি’ বা ‘নিষ্ঠুর গরম দিন’ নামে নতুন একটি শ্রেণি চালু করেছে। অতিরিক্ত গরমে টোকিওর একটি চিড়িয়াখানায় হিটস্ট্রোকে তিনটি সিংহের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে।

হংকংয়েও তাপমাত্রার নতুন রেকর্ড তৈরি হয়েছে। টাইফুন ডলফিনের বাইরের অংশ শহরের ওপর দিয়ে উষ্ণ বায়ু প্রবাহিত করার সময় সেখানে ৩৬ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। ১৮৮৪ সালে তাপমাত্রার রেকর্ড রাখা শুরুর পর এটিই হংকংয়ের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা।

তবে রেকর্ড তাপমাত্রার মধ্যেও বাইরে কাজ করা শ্রমিকদের জন্য হংকংয়ের তাপজনিত ঝুঁকি সতর্কতা ব্যবস্থা সর্বনিম্ন স্তরে থাকায় সমালোচনা তৈরি হয়েছে। হংকং অবজারভেটরির সাবেক প্রধান লাম চিউ-ইং সতর্কতা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। পরে শ্রম বিভাগ জানিয়েছে, তারা আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের সঙ্গে সমন্বয় করে ব্যবস্থাটি পর্যালোচনা করছে।

চীনের পশ্চিমাঞ্চলীয় শিনজিয়াংয়েও জুলাইয়ে একটি আবহাওয়া কেন্দ্রে ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলেও তাপপ্রবাহ ছড়িয়ে পড়েছে। অন্যদিকে উত্তর কোরিয়া জানিয়েছে, রাজধানী পিয়ংইয়ংয়ে একটানা কয়েকটি ‘ট্রপিক্যাল নাইট’ দেখা গেছে, যখন রাতের তাপমাত্রাও ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামেনি।

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার এশিয়ার জলবায়ু পরিস্থিতি নিয়ে সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৯১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে এশিয়ার উষ্ণায়নের গতি তার আগের ৩০ বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এ অঞ্চলে তাপপ্রবাহের তীব্রতা ও ব্যাপ্তি বাড়ছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

দক্ষিণ কোরিয়ার কৃষকরাও এই পরিস্থিতির বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন। গওয়াংজুর তরমুজচাষি হং কিয়ং-হি জানান, স্বাভাবিকভাবে উচ্চ দামে বিক্রি হওয়া তার তরমুজগুলো হঠাৎ নষ্ট হয়ে গেছে। ফলের ভেতরের অংশ ও মিষ্টতা ঠিক থাকার পরও মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে সেগুলো পচে যায়। পাঁচ দশকের কৃষিজীবনে এমন ঘটনা তিনি আগে দেখেননি।

দক্ষিণ জিওলা প্রদেশের দামইয়াং কাউন্টির স্ট্রবেরিচাষি ইউন উ-হাও তিন মাস ধরে পরিচর্যা করা চারাগাছ হারিয়েছেন। ক্ষতির পরিমাণ বড় হলেও নির্দিষ্ট ফসল, চাষপদ্ধতি ও অঞ্চলভিত্তিক সীমাবদ্ধতার কারণে তিনি ফসল বীমা থেকে ক্ষতিপূরণ নাও পেতে পারেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এশিয়াজুড়ে ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা শুধু জনস্বাস্থ্যের জন্য নয়, খাদ্য উৎপাদন ও কৃষকের জীবিকার জন্যও বড় হুমকি হয়ে উঠছে। দক্ষিণ কোরিয়ায় মাটির নিচে আলু নষ্ট হয়ে যাওয়ার ঘটনা সেই ঝুঁকিরই একটি ব্যতিক্রমী উদাহরণ। ভবিষ্যতে এমন চরম তাপপ্রবাহ আরও ঘন ঘন দেখা দিলে কৃষি উৎপাদন, খাদ্য সরবরাহ এবং অর্থনীতিতে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে।

সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান

এম.কে

আরো পড়ুন

ভারতকে দেওয়া, বিশেষ সুবিধা বাতিল, করলো সুইজারল্যান্ড

নিউজ ডেস্ক

পদার্থে নোবেল পেলেন যে ৩ জন

জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব পদে আলোচনায় ড. ইউনূস