কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই আগামী ১০ বছরের মধ্যে মানবজাতির অস্তিত্বের জন্য ভয়াবহ হুমকি হয়ে উঠতে পারে বলে সতর্ক করেছেন গুগলের সাবেক গবেষক অ্যালেক্স টার্নার। তার আশঙ্কা, বর্তমান গতিতে এআই প্রযুক্তির উন্নয়ন অব্যাহত থাকলে মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়ে এই প্রযুক্তি পুরো মানবজাতিকে ধ্বংস করার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এমন বিপর্যয়ের আশঙ্কা তিনি তিন ভাগের এক ভাগ বলে উল্লেখ করেছেন।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ডেইলি স্টারের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এনডিটিভি ওয়ার্ল্ড সামিটে বক্তব্য দেওয়ার সময় টার্নার এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ এবং তা নিয়ন্ত্রণে বিজ্ঞানীদের সীমাবদ্ধতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তার মতে, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো আরও শক্তিশালী এআই ব্যবস্থা তৈরির প্রতিযোগিতায় নেমেছে। এতে প্রযুক্তির সক্ষমতা বাড়লেও এর কার্যক্রম কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে, তা পুরোপুরি বোঝা ও নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
টার্নার সতর্ক করে বলেন, মানুষের নির্দেশ ছাড়াও উন্নত এআই ব্যবস্থা এমন কিছু করতে পারে, যা মানবজাতির জন্য বিপর্যয় ডেকে আনবে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো যেভাবে এআই তৈরি করছে, সেই পদ্ধতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
তিনি আরও বলেন, সেতু নির্মাণ বা রকেট তৈরির মতো প্রচলিত প্রকৌশলকাজে নির্মাতারা সাধারণত তাদের তৈরি ব্যবস্থার নকশা ও কার্যপ্রণালি সম্পর্কে বিস্তারিত জানেন। কিন্তু এআইয়ের ক্ষেত্রে এর অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া সম্পর্কে গবেষকদের পূর্ণ ধারণা নেই। এমনকি পরীক্ষার সময় এআই ব্যবস্থা নিজেদের প্রকৃত সক্ষমতা আড়াল করে রাখতে পারে বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
গত জুলাইয়ে গুগল ডিপমাইন্ড ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন টার্নার। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গোপন সামরিক প্রকল্পে এআই ব্যবহারের জন্য মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের সঙ্গে গুগলের চুক্তির পর তিনি প্রতিষ্ঠানটি ছেড়ে যান। বর্তমানে তিনি আশঙ্কা করছেন, এআইয়ের এমন এক পর্যায় শুরু হতে পারে, যেখানে কম্পিউটার ব্যবস্থা নিজেই নিজের সক্ষমতা দ্রুত বাড়াতে থাকবে এবং মানুষের পক্ষে সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলানো কঠিন হয়ে পড়বে। প্রযুক্তিবিষয়ক আলোচনায় এ ধরনের পরিস্থিতিকে ‘ইন্টেলিজেন্স এক্সপ্লোশন’ বা বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তার বলা হয়।
এআইয়ের ঝুঁকি পর্যবেক্ষণের পদ্ধতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন টার্নার। তার দাবি, এক গবেষক তাকে জানিয়েছেন, এআইয়ের তৈরি কাজ মানুষ সরাসরি যাচাই করার পরিবর্তে এখন আরেকটি এআই ব্যবস্থা ব্যবহার করে প্রথমটির কাজ পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। এতে ভুল শনাক্তকরণ এবং নিরাপত্তা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে নতুন ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
প্রযুক্তি খাতের বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর কিছু নেতার বিরুদ্ধে এআইয়ের সম্ভাব্য বিপদকে গুরুত্ব না দেওয়ার অভিযোগও তুলেছেন তিনি। টার্নার বলেন, অতীতে তামাক ও জ্বালানি শিল্পের কিছু প্রতিষ্ঠান স্বাস্থ্যঝুঁকি ও জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে সতর্কবার্তা অস্বীকার করেছিল। তার মতে, এআই শিল্পের একটি অংশও এখন একইভাবে সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলোকে খাটো করে দেখছে।
এদিকে মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল গেটসও এআইয়ের অপব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার মতে, এআই এমন বিপর্যয় ঘটাতে সক্ষম, যাতে বিপুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যু হতে পারে। বিশেষ করে অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিরা উন্নত এআই ব্যবহার করে জৈব অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করতে পারেন বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
গেটস বলেন, রোগের চিকিৎসার জন্য নতুন ওষুধ তৈরির মতো ইতিবাচক গবেষণা এবং জীবাণু সন্ত্রাসের উদ্দেশ্যে প্রযুক্তি ব্যবহারের মধ্যে পার্থক্য করা কঠিন হতে পারে। এ কারণে উন্নত এআই মডেলগুলোর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ এবং সেগুলোর ব্যবহার সংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
এআই নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সতর্ক করেছেন অ্যানথ্রপিকের সাবেক কর্মী ও হুইসেলব্লোয়ার জ্যাকব কক্সনও। তার বক্তব্য, পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে বিশ্ব অনেক কিছু জানলেও এআইকে কীভাবে নির্ভরযোগ্যভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, সে বিষয়ে এখনো যথেষ্ট জ্ঞান অর্জিত হয়নি।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এআই নিয়ে প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তার বক্তব্য, এআই প্রযুক্তিতে যে দেশ এগিয়ে থাকবে, ভবিষ্যতে তারাই বড় সুবিধা পাবে।
সূত্রঃ ডেইলি স্টার
এমকে

