TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

ট্রাম্পের ফকল্যান্ড বার্তায় ব্রিটেনে আতঙ্কঃ যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া কি দ্বীপ রক্ষা করতে পারবে লন্ডন

ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের সার্বভৌমত্ব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান পুনর্বিবেচনার ইঙ্গিত দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর এই বক্তব্যের পরই ব্রিটেনের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর দেশটির নিরাপত্তা-নির্ভরতা এবং আর্জেন্টিনার সঙ্গে দীর্ঘদিনের ফকল্যান্ড বিরোধ নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে।

৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট-এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের মন্তব্য ব্রিটেনকে নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট করে দিয়েছে। বিশেষ করে রাশিয়া, চীন ও ইরান থেকে সম্ভাব্য নিরাপত্তা হুমকির পাশাপাশি ফকল্যান্ড নিয়ে আর্জেন্টিনার নতুন করে কঠোর অবস্থান পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।

ট্রাম্পের বক্তব্যের পর আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই ফকল্যান্ড ইস্যুতে আরও সরব হয়েছেন। তিনি দ্বীপগুলোকে আর্জেন্টিনার জাতীয় স্বার্থের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ‘পবিত্র’ বিষয় হিসেবে তুলে ধরেছেন এবং জানিয়েছেন, তার দেশ নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় কঠোর অবস্থান অব্যাহত রাখবে।

ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে ব্রিটেন ও আর্জেন্টিনার মধ্যে ১৯৮২ সালে যুদ্ধ হয়েছিল। ওই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ব্রিটেনকে সমর্থন করেছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটনের অবস্থান নিয়ে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে দ্বীপগুলোর সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে নিরপেক্ষ অবস্থান ধরে রাখলেও ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্য সেই অবস্থান পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে জল্পনা তৈরি করেছে।

ট্রাম্প বলেছেন, তিনি সব ধরনের নীতিগত অবস্থানই পর্যালোচনা করেন। তার এই মন্তব্যকে ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর জন্য লন্ডনের ওপর চাপ সৃষ্টির একটি কৌশল হিসেবেও দেখা হচ্ছে। দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, ট্রাম্পের মন্তব্যের মাধ্যমে নতুন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহামের সরকারের ওপর প্রতিরক্ষা ব্যয় এবং ন্যাটোতে অবদান বাড়ানোর চাপ তৈরির ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

এদিকে ব্রিটেনে রাজনৈতিক চাপও বাড়ছে। কনজারভেটিভ নেতা কেমি বেডেনক সতর্ক করে বলেছেন, শক্তিশালী দেশগুলো সাধারণত আক্রমণের লক্ষ্য হয় না—দুর্বল দেশগুলোই বেশি ঝুঁকিতে থাকে। তার বক্তব্যের মূল বার্তা হলো, বর্তমান বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে ব্রিটেনকে সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

লেবার পার্টির এমপি এবং হাউস অব কমন্সের প্রতিরক্ষা বিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান তান সিং ধেসি-ও প্রধানমন্ত্রী বার্নহামকে সতর্ক করেছেন যে শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য বা ‘ভালো অনুভূতি’ দিয়ে ব্রিটেনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে না। প্রতিরক্ষা সক্ষমতার জন্য প্রয়োজন বাস্তব অর্থায়ন ও সামরিক প্রস্তুতি।

প্রতিরক্ষা ব্যয় নিয়ে সরকারের ওপর চাপের অন্যতম কারণ হলো ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতিরক্ষা খাতে জাতীয় আয়ের ৩ শতাংশ ব্যয় করার লক্ষ্য। দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট-এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে এই লক্ষ্যমাত্রাকে আর বিলাসিতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং এটিকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এমনকি ২০৩০ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করাও অতিরিক্ত ধীরগতির হতে পারে বলে যুক্তি দেওয়া হয়েছে।

তবে এখানে রয়েছে বড় আর্থিক সংকট। ব্রিটিশ সরকারের হাতে সীমাহীন অর্থ নেই। প্রতিরক্ষা খাতে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হলে স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা, আবাসনসহ অন্যান্য খাতে ব্যয়ের সঙ্গে ভারসাম্য তৈরি করতে হবে। এ কারণেই প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়ানোর প্রশ্নটি শুধু সামরিক নয়, বরং বড় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিতর্কে পরিণত হয়েছে।

কনজারভেটিভ পার্টি ইতোমধ্যে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতিরক্ষা ব্যয় ৩ শতাংশে নেওয়ার জন্য বছরে প্রায় ১০ বিলিয়ন পাউন্ড অতিরিক্ত অর্থ দেওয়ার পরিকল্পনার কথা বলেছে। দলটি এর অর্থায়নের জন্য কল্যাণ ব্যয় কমানোর প্রস্তাব দিয়েছে। তবে এই পরিকল্পনার সমালোচকেরা সতর্ক করেছেন, কল্যাণ ব্যয়ে বড় ধরনের কাটছাঁট সামাজিক সংকট বাড়াতে পারে।

অন্যদিকে, ন্যাটোর সামগ্রিক প্রতিরক্ষা ব্যয়ের প্রতিশ্রুতিও ব্রিটেনের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। ২০২৫ সালে ন্যাটো সদস্যরা ২০৩৫ সালের মধ্যে প্রতিরক্ষা ও সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বিনিয়োগের লক্ষ্যে সম্মত হয়েছিল—এর মধ্যে অন্তত ৩.৫ শতাংশ মূল প্রতিরক্ষা খাতে যাওয়ার কথা।

এই পরিস্থিতিতে ফকল্যান্ড ইস্যু শুধু ব্রিটেন-আর্জেন্টিনা বিরোধ হিসেবে দেখা হচ্ছে না। এটি ব্রিটেনের সামরিক সক্ষমতা, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক এবং ন্যাটোর ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গেও জড়িয়ে পড়েছে।

বিশ্লেষকদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি এখন—যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও কূটনৈতিক সমর্থন ছাড়া ব্রিটেন কি ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জকে কার্যকরভাবে রক্ষা করতে পারবে?

আর্জেন্টিনা অবশ্য সামরিক সংঘাতের ঘোষণা দেয়নি। কিন্তু প্রেসিডেন্ট মিলেইর সাম্প্রতিক বক্তব্যে ফকল্যান্ড ইস্যুকে আবার জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে নিয়ে আসার প্রবণতা স্পষ্ট হয়েছে। একই সময়ে ট্রাম্প প্রশাসন যদি সত্যিই দীর্ঘদিনের মার্কিন অবস্থান পরিবর্তনের দিকে এগোয়, তাহলে ব্রিটেনের জন্য কূটনৈতিক চাপ আরও বাড়তে পারে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাশিয়ার হুমকি। ইউক্রেন যুদ্ধে ব্রিটেনের ভূমিকা নিয়ে মস্কোর সঙ্গে উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। ব্রিটিশ সামরিক স্থাপনা বা অন্যান্য লক্ষ্যবস্তু নিয়ে রাশিয়ার হুমকির খবরও সাম্প্রতিক সময়ে সামনে এসেছে। ফলে লন্ডনের নিরাপত্তা পরিকল্পনাকারীদের কাছে একই সময়ে একাধিক সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলার প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

চীন ও ইরানকেও সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ফলে ব্রিটেনের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিয়ে বিতর্ক এখন শুধু ফকল্যান্ড রক্ষার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই; বরং ইউরোপ ও বিশ্বের পরিবর্তিত নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে যুক্তরাজ্য কতটা সামরিকভাবে স্বনির্ভর থাকবে—সেই বৃহত্তর প্রশ্ন সামনে এসেছে।

সব মিলিয়ে ট্রাম্পের ফকল্যান্ড-সংক্রান্ত মন্তব্য ব্রিটিশ সরকারের সামনে একটি কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরেছে। একদিকে সীমিত সরকারি অর্থ, অন্যদিকে বাড়তে থাকা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ঝুঁকি। এর মধ্যে অ্যান্ডি বার্নহাম সরকারের ওপর চাপ—প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়িয়ে ব্রিটেনের সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠন করা, একই সঙ্গে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যয়ের ভারসাম্য বজায় রাখা।

ফলে ফকল্যান্ড সংকট আপাতত নতুন কোনো যুদ্ধের ঘোষণা না হলেও, এটি ব্রিটেনের নিরাপত্তা নীতি নিয়ে বড় ধরনের সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। ওয়াশিংটনের ওপর দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা নির্ভরতা কতটা কমিয়ে ব্রিটেন নিজস্ব সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে পারবে—আগামী দিনগুলোতে সেটিই হতে পারে বার্নহাম সরকারের অন্যতম বড় পরীক্ষা।

সূত্রঃ দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট \ দ্য গার্ডিয়ান

এম.কে

আরো পড়ুন

অর্থনৈতিক মন্দার কারণে যুক্তরাজ্যে বাড়ছে বেকারত্ব

ধর্ষক ও খুনিদের বিয়ে বন্ধের আইন!

নিউজ ডেস্ক

যুক্তরাজ্যে এম-২৫ মোটরওয়েতে লরিতে আগুন, যান চলাচল বন্ধ