যুক্তরাজ্যে তরুণদের ক্রমবর্ধমান বেকারত্বের মধ্যে ১৮ থেকে ২০ বছর বয়সীদের ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির গতি নিয়ে সরকারের ভেতরে তীব্র মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। লেবার পার্টির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তরুণদের পূর্ণ ন্যূনতম মজুরি দেওয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে কি না এবং কত দ্রুত করা হবে—তা নিয়ে মন্ত্রীদের মধ্যে বিভক্তি তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাজ্যের ব্যবসাবিষয়ক মন্ত্রী পিটার কাইল মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ১৮ থেকে ২০ বছর বয়সীদের পূর্ণ ন্যূনতম মজুরি দেওয়ার সিদ্ধান্ত ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। বিশেষ করে আতিথেয়তা ও খুচরা বিক্রয় খাতের মতো কম লাভজনক ব্যবসাগুলো এতে নতুন কর্মী নিয়োগে নিরুৎসাহিত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে ট্রেজারি মন্ত্রী টরস্টেন বেল দাবি করেছেন, অতীতে তরুণদের ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির কারণে কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে—এমন কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। তিনি বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, লো পে কমিশনের সাম্প্রতিক মূল্যায়নেও একই তথ্য উঠে এসেছে।
এ বিতর্ক নতুন করে সামনে আসে সাবেক লেবার মন্ত্রী অ্যালান মিলবার্নের নেতৃত্বে প্রকাশিত একটি সরকার-সমর্থিত প্রতিবেদনের পর। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্যে তরুণদের বেকারত্ব ও কর্মহীনতার কারণে প্রতি বছর দেশটির অর্থনীতিতে প্রায় ১২৫ বিলিয়ন পাউন্ড ক্ষতি হচ্ছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এক দশকেরও বেশি সময় পর প্রথমবারের মতো কাজ বা পড়াশোনার বাইরে থাকা তরুণদের সংখ্যা ১০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। এর ফলে তরুণদের জন্য ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির হার কমানোর দাবি উঠেছে।
অ্যালান মিলবার্ন বলেন, নিয়োগদাতাদের ঝুঁকি নেওয়ার পরিবেশ তৈরি না হলে তরুণদের জন্য চাকরি সৃষ্টি কঠিন হয়ে পড়বে। তার মতে, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক চাপের কারণে বিশেষ করে আতিথেয়তা খাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এদিকে লেবার পার্টির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও বিতর্ক বাড়ছে। ম্যানচেস্টারের মেয়র অ্যান্ডি বার্নহ্যাম দলকে আরও বামঘেঁষা নীতির দিকে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। বিপরীতে দলের একাংশ মনে করছে, রাজনৈতিক কেন্দ্রপন্থা থেকে সরে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারও এ সপ্তাহে প্রকাশিত এক প্রবন্ধে সতর্ক করে বলেছেন, অতিরিক্ত ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি ব্যবসার জন্য চাপ তৈরি করতে পারে এবং অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
লেবার পার্টি নির্বাচনী ইশতেহারে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, ১৮ থেকে ২০ বছর বয়সীদের ন্যূনতম মজুরি ২১ বছর বা তার বেশি বয়সীদের সমপর্যায়ে আনা হবে। তবে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের নির্দিষ্ট সময়সীমা এখনো ঘোষণা করা হয়নি।
বর্তমানে যুক্তরাজ্যে মূল ন্যূনতম মজুরি ঘণ্টাপ্রতি ১২ দশমিক ৭১ পাউন্ড এবং তরুণদের জন্য ১০ দশমিক ৮৫ পাউন্ড। এ বছর সরকার মূল মজুরি ৪ দশমিক ১ শতাংশ এবং যুব মজুরি ৮ দশমিক ৫ শতাংশ বৃদ্ধি করেছে।
তবে সরকারের অভ্যন্তরে এখন এমন আশা করা হচ্ছে যে, আগামী অর্থবছরের জন্য লো পে কমিশন হয়তো তুলনামূলক কম হারে মজুরি বৃদ্ধির সুপারিশ করবে।
যদিও লো পে কমিশন স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, তরুণদের বেকারত্ব বৃদ্ধির সঙ্গে মজুরি বৃদ্ধির সরাসরি কোনো প্রমাণ তারা খুঁজে পায়নি, তবুও সরকারের একাংশ এখনো সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
অন্যদিকে ট্রেড ইউনিয়ন ও শ্রমিক সংগঠনগুলো সরকারকে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণের আহ্বান জানিয়েছে। ট্রেডস ইউনিয়ন কংগ্রেসের সহকারী মহাসচিব কেট বেল বলেন, “ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধিকে দায়ী করা সহজ, কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি অনেক বেশি জটিল।”
দোকানকর্মীদের ইউনিয়ন ইউএসড’র সাধারণ সম্পাদক জোয়ান থমাস সতর্ক করে বলেছেন, তরুণদের জন্য বৈষম্যমূলক মজুরি ব্যবস্থা বন্ধের প্রতিশ্রুতি থেকে সরকার সরে গেলে তা ভোটারদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, তরুণদের কর্মসংস্থান রক্ষা এবং জীবনযাত্রার ব্যয় সামাল দেওয়ার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা এখন লেবার সরকারের জন্য বড় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান
এম.কে

