TV3 BANGLA
বাংলাদেশ

দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাচ্ছে বাংলাদেশের ৮,৪২৮ পণ্য

বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যকার সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি নিয়ে দীর্ঘ এক বছরের আলোচনা আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়েছে। মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) সচিবালয়ে দুই দেশের বাণিজ্যমন্ত্রীর যৌথ ঘোষণার মাধ্যমে নেগোসিয়েশনের সফল সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়। উভয় দেশের আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক অনুমোদনের পর চুক্তিটি কার্যকর হবে।

চুক্তি কার্যকর হওয়ার প্রথম দিন থেকেই বাংলাদেশের ৮ হাজার ৪২৮টি পণ্য দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে তাৎক্ষণিক শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে। অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়ার ১ হাজার ৫৪টি পণ্য বাংলাদেশের বাজারে একই ধরনের সুবিধা ভোগ করবে।

চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশের ৯৭ শতাংশ পণ্য ও সেবা দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা পাবে। বিপরীতে বাংলাদেশের বাজারে দক্ষিণ কোরিয়ার ৮৭ শতাংশ পণ্য ও সেবা একই ধরনের সুবিধার আওতায় আসবে। বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে এই চুক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

 

সচিবালয়ের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত CEPA Negotiation Conclusion Ceremony-তে যৌথ ঘোষণা দেন বাংলাদেশের বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এবং দক্ষিণ কোরিয়ার বাণিজ্যমন্ত্রী হান-কু ইয়েও। অনুষ্ঠানে দুই দেশের প্রধান নেগোসিয়েটরসহ বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, বর্তমান সরকার মাত্র পাঁচ মাসের মধ্যে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতির একটি দেশের সঙ্গে উচ্চমানের এই বাণিজ্য চুক্তির আলোচনা সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়েছে। তার মতে, এ চুক্তির ফলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, জুতা, ওষুধ, হোম টেক্সটাইল, হিমায়িত খাদ্য ও সিরামিক পণ্য দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান অর্জন করবে।

তিনি আরও জানান, ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার সরকারি লক্ষ্য বাস্তবায়নে এই চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে রপ্তানি বৃদ্ধি, বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং শিল্পায়নের গতি বাড়াতে সিইপিএ কার্যকর অবদান রাখবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

 

দক্ষিণ কোরিয়ার বাণিজ্যমন্ত্রী হান-কু ইয়েও বলেন, বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনৈতিক সম্পর্কের ইতিহাস ৫৬ বছরের হলেও এতদিন সহযোগিতার কেন্দ্রবিন্দু ছিল মূলত তৈরি পোশাক খাত। এখন সময় এসেছে প্রযুক্তি, শিল্প সহযোগিতা, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং বিনিয়োগের মতো নতুন খাতে অংশীদারিত্ব আরও সম্প্রসারণের। তার মতে, সিইপিএ কার্যকর হলে বাংলাদেশে কোরিয়ান কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।

শুধু পণ্য বাণিজ্য নয়, সেবা খাতেও এই চুক্তির মাধ্যমে বড় ধরনের অগ্রগতি হয়েছে। বাংলাদেশ দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য ৯৫টি উপখাত উন্মুক্ত করবে। বিপরীতে দক্ষিণ কোরিয়া বাংলাদেশের জন্য ১১১টি উপখাতে চারটি মোডে সেবা বাণিজ্যের সুযোগ দেবে। এতে তথ্যপ্রযুক্তি, দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি, প্রযুক্তি স্থানান্তর, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং বিনিয়োগ সহযোগিতা আরও সম্প্রসারিত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।

সিইপিএ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রথমে দুই দেশ Terms of Reference (ToR) চূড়ান্ত করে। এরপর Trade Negotiating Committee (TNC)-এর অধীনে ১১টি Technical Working Group (TWG) গঠন করা হয়। ২০২৫ সালের আগস্টে দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলে প্রথম দফা আলোচনা শুরু হয়। পরবর্তী এক বছরে বাংলাদেশে দুই দফা এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় তিন দফা সরাসরি বৈঠকের পাশাপাশি প্রায় ৪০টি ভার্চুয়াল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এসব আলোচনার মাধ্যমেই চুক্তির নেগোসিয়েশন সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।

 

বর্তমানে বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে বাংলাদেশ রপ্তানি করে ৪৯১ দশমিক ৭৩ মিলিয়ন ডলারের পণ্য, আর আমদানি করে ৯০২ দশমিক ৯০ মিলিয়ন ডলারের পণ্য। ফলে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪১১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সিইপিএ কার্যকর হলে শুধু শুল্ক সুবিধাই নয়, বরং শিল্পায়ন, প্রযুক্তি স্থানান্তর, বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (FDI), দক্ষতা উন্নয়ন এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। একই সঙ্গে এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা ধরে রাখতেও এই চুক্তি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

তবে চুক্তিটি এখনো কার্যকর হয়নি। বর্তমানে এটি নেগোসিয়েশন পর্যায়ের সমাপ্তি মাত্র। উভয় দেশের আইনগত প্রক্রিয়া, মন্ত্রিসভার অনুমোদন এবং আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর সম্পন্ন হওয়ার পর বাংলাদেশ-দক্ষিণ কোরিয়া সিইপিএ কার্যকর হবে।

সূত্রঃ কমার্স মিনিস্ট্রি বাংলাদেশ

এম.কে

আরো পড়ুন

হাসিনার দেশত্যাগের পর ‘সংযম’ দেখানোয় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রশংসা যুক্তরাষ্ট্রের

ভোটকেন্দ্রে মোবাইল ফোন নিয়ে প্রবেশ করা যাবে নাঃ ইসি

দেশে বৈধ–অবৈধ বিদেশিদের মধ্যে শীর্ষে ভারতীয়