আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দণ্ডিত পলাতক আসামিদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে তা বিক্রির মাধ্যমে প্রাপ্ত অর্থ শহীদ পরিবারের মধ্যে বিতরণের উদ্যোগ নিয়েছে প্রসিকিউশন। ট্রাইব্যুনালের ইতিহাসে এ ধরনের পদক্ষেপ এবারই প্রথম হতে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধান কৌঁসুলি আমিনুল ইসলাম। একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, জুলাই অভ্যুত্থান-সংশ্লিষ্ট বাছাইকৃত ১০৯টি মামলার তদন্ত ও বিচার আগামী এক বছরের মধ্যে সম্পন্ন করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে।
মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে প্রধান কৌঁসুলি বলেন, যেসব দণ্ডিত পলাতক আসামির বিরুদ্ধে সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত, সম্পত্তি জব্দ বা অর্থদণ্ডের আদেশ রয়েছে, সেগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শুরু করা হচ্ছে। সম্পত্তি বিক্রি করে প্রাপ্ত অর্থ শহীদ পরিবারের মধ্যে বিতরণের বিষয়টিও এ উদ্যোগের অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
তিনি জানান, এ প্রক্রিয়া বাস্তবায়নে কিছু আইনি জটিলতা রয়েছে। কারণ ট্রাইব্যুনালের কার্যবিধিতে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা নেই। তাই বিদ্যমান আইন, আন্তর্জাতিক আইন এবং সরকারের অন্য কোনো আইন প্রয়োগের মাধ্যমে ট্রাইব্যুনালের আদেশ বাস্তবায়নের সুযোগ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। দ্রুত এ বিষয়ে কার্যকর সিদ্ধান্ত পাওয়া যাবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
পলাতক আসামিদের বিচার প্রসঙ্গে প্রধান কৌঁসুলি বলেন, আইন অনুযায়ী কোনো আসামি বিচার এড়িয়ে পলাতক থাকলেও তার বিরুদ্ধে বিচার কার্যক্রম চালানো সম্ভব। তবে তাকে গ্রেপ্তার, আত্মসমর্পণ বা দেশে ফিরিয়ে আনার আগে আদালতের দেওয়া দণ্ড কার্যকর করা যায় না। আদালত দণ্ড ও অর্থদণ্ডের আদেশ দিতে পারলেও তা বাস্তবায়নের জন্য আসামির উপস্থিতি প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার ও দেশে ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। ট্রাইব্যুনালের পক্ষ থেকেও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও প্রয়োজনীয় আইনগত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। কোনো পলাতক আসামির অবস্থান সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য থাকলে তা প্রসিকিউশনকে জানানোর আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জুলাই অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ট্রাইব্যুনালে জমা পড়া ৫৯০টি অভিযোগের মধ্যে বাছাই করা ১০৯টি মামলার তদন্ত ও বিচার এক বছরের মধ্যে শেষ করার পরিকল্পনার কথাও জানান প্রধান কৌঁসুলি। তিনি বলেন, একই এলাকার একাধিক ঘটনাকে পৃথকভাবে তদন্ত না করে সমন্বিতভাবে একটি বড় তদন্তের আওতায় আনা হবে। এতে সময় সাশ্রয়ের পাশাপাশি তদন্ত আরও কার্যকর হবে।
তিনি জানান, যাত্রাবাড়ী, উত্তরা ও নরসিংদীসহ বিভিন্ন এলাকার একাধিক ঘটনার তথ্য একত্র করে তদন্ত পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে একই ঘটনার বিভিন্ন দিক একটি তদন্তেই উপস্থাপন করা সম্ভব হবে এবং বিচার প্রক্রিয়াও দ্রুত এগোবে।
প্রধান কৌঁসুলি বলেন, প্রসিকিউশনের লক্ষ্য শুধু তদন্ত নয়, আগামী এক বছরের মধ্যেই তদন্ত ও বিচার—উভয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা। শহীদ পরিবার ও আহতদের স্বজনদের দ্রুত বিচার পাওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে, সেই প্রত্যাশা পূরণে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করা হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, জুলাই-সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর পাশাপাশি গুম ও কথিত ক্রসফায়ারের ঘটনাগুলোর তদন্তও সমান গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, কিছু গুম স্বতন্ত্র ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে, আবার কিছু ঘটনা মানবতাবিরোধী অপরাধের আওতায় বিচারযোগ্য হতে পারে।
গত এক থেকে দেড় বছরে জুলাই-সংশ্লিষ্ট ছয়টি মামলার বিচার সম্পন্ন হয়েছে উল্লেখ করে আমিনুল ইসলাম বলেন, আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবে এসব বিচার শেষ করা হয়েছে। তিনি মনে করেন, অতিরিক্ত তাড়াহুড়া করলে বিচার নিয়ে জনমনে প্রশ্ন সৃষ্টি হতে পারে। তাই স্বাভাবিক গতি বজায় রেখেই বিচার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
তিনি জানান, চলতি মাসেই আরও তিনটি মামলার রায় ঘোষণার সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে ওবায়দুল কাদেরের মামলায় যুক্তিতর্কের শুনানি চলছে, মাহবুবউল আলম হানিফের মামলায় যুক্তিতর্ক শেষ হয়েছে। যাত্রাবাড়ীর তাইম ভূঁইয়া হত্যা মামলার যুক্তিতর্কের শুনানি কয়েক দিনের মধ্যেই শুরু হবে। এছাড়া জিয়াউল আহসানের মামলাটি সাক্ষ্যগ্রহণের শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
সূত্রঃ দৈনিক আজাদী
এম.কে

