23.9 C
London
July 21, 2026
TV3 BANGLA
মুক্তমত

দাবানলের বিস্তার: কেন বাড়ছে আগুনের প্রকোপ এবং কী বলছে বিজ্ঞান

নাশিত রহমান || লন্ডন || ২১ জুলাই ২০২৬

নিয়ন্ত্রণহীন দাবানল আজ বিশ্বের বহু অঞ্চলে এক গভীর পরিবেশগত সংকটের প্রতীক। কেন দাবানল সৃষ্টি হয়, কেন প্রতি বছর তা বাড়ছে, কোন অঞ্চলগুলো বেশি ঝুঁকিপূর্ণ, কীভাবে মানুষ ও সম্পদ রক্ষা করা যায় এবং প্রাণীরা কীভাবে আগুনের সঙ্গে লড়ে বাঁচে—এই সব প্রশ্নের উত্তরই আমাদের সময়ের জলবায়ু বাস্তবতা ও মানবিক আচরণের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। নিচে আমরা এই নিবন্ধে দাবানলের কারণ, এর বিস্তার, বৃদ্ধি এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পরিবেশগত ও মানবিক বাস্তবতা বিশদভাবে ব্যাখ্যা করছি।

দাবানলের উত্থান: কারণ, বিস্তার ও মানব-প্রকৃতির সংগ্রাম। বিশ্বজুড়ে দাবানলের প্রকোপ গত এক দশকে নজিরবিহীনভাবে বেড়েছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, দাবানল কখনও নিজে নিজে জন্ম নেয় না; এর জন্য তিনটি উপাদান অপরিহার্য—জ্বালানি, আগুনের উৎস এবং অনুকূল আবহাওয়া। শুকনো ঘাস, ঝরা পাতা, গাছপালা ও বনজ উদ্ভিদ জ্বালানি হিসেবে কাজ করে; আগুনের উৎস হতে পারে বজ্রপাত, মানুষের অসতর্কতা বা ইচ্ছাকৃত অগ্নিসংযোগ; আর আবহাওয়ার মধ্যে তীব্র গরম, খরা ও প্রবল বাতাস আগুনকে দ্রুত ছড়িয়ে দেয়।
প্রাকৃতিক কারণের মধ্যে বজ্রপাত সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে “হট লাইটনিং”—যা দীর্ঘস্থায়ী বৈদ্যুতিক প্রবাহ তৈরি করে—শুকনো বনভূমিতে মুহূর্তে আগুন ধরিয়ে দিতে পারে। গবেষণা বলছে, তাপমাত্রা প্রতি এক ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে বজ্রপাতের হার প্রায় ১২% বৃদ্ধি পায়, ফলে দাবানলের ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।

 

তবে আধুনিক যুগে মানুষের কর্মকাণ্ডই দাবানলের প্রধান কারণ। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর প্রায় ৮৫% দাবানল মানুষের কারণে ঘটে—সিগারেটের আগুন, ক্যাম্পফায়ার, যন্ত্রপাতির স্পার্ক, গাড়ির এক্সহস্ট, এমনকি ইচ্ছাকৃত অগ্নিসংযোগও এর জন্য দায়ী। শুকনো ঘাসে একটি ছোট্ট সিগারেটের আগুনও কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বিশাল বনভূমি গ্রাস করতে পারে।
প্রতি বছর দাবানল কেন বাড়ছে? জলবায়ু পরিবর্তন এখন দাবানল বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় চালিকা শক্তি। তীব্র তাপপ্রবাহ, দীর্ঘস্থায়ী খরা এবং বৃষ্টিপাতের অনিশ্চয়তা বনভূমিকে আরও শুকনো ও দাহ্য করে তুলছে। ব্রিটিশ মেট অফিসের গবেষণা বলছে, ২০৩০ সালের মধ্যে চরম দাবানলের ঝুঁকি ১৪%, ২০৫০ সালে ৩০% এবং শতাব্দীর শেষে ৫০% পর্যন্ত বাড়তে পারে।

২০২৪–২৫ সালের বৈশ্বিক দাবানল পর্যালোচনা রিপোর্টে দেখা গেছে, মাত্র এক বছরে দাবানলে ৩.৭ মিলিয়ন বর্গকিলোমিটার এলাকা পুড়েছে এবং ৮ বিলিয়ন টন কার্বন ডাই-অক্সাইড বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়েছে—যা বহু দেশের বার্ষিক জীবাশ্ম জ্বালানি নির্গমনের চেয়েও বেশি। দক্ষিণ আমেরিকা, ক্যালিফোর্নিয়া ও কঙ্গো অঞ্চলে দাবানল ছিল সবচেয়ে তীব্র।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপপ্রবাহ ও খরা এতটাই তীব্র হয়েছে যে দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার দাবানল এখন আগের তুলনায় ২৫ গুণ বড় আকার ধারণ করছে। দক্ষিণ আমেরিকার প্যানটানাল–চিকুইতানো অঞ্চলে দাবানল ৩৫ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

কোন অঞ্চলগুলো বেশি দাবানলপ্রবণ? বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে দাবানলের ঝুঁকি ভিন্ন ভিন্ন কারণে বাড়ছে। গবেষণা বলছে—
• দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়া, অ্যামাজন, প্যানটানাল–চিকুইতানো ও কঙ্গো বেসিন—তীব্র খরা ও তাপপ্রবাহের কারণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।
• ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল, স্পেন–পর্তুগাল, অস্ট্রেলিয়া—দীর্ঘ গ্রীষ্ম ও কম বৃষ্টিপাতের কারণে আগুন দ্রুত ছড়ায়।
• যুক্তরাজ্যের দক্ষিণ-পূর্ব ও মধ্যাঞ্চল—গরম ও শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে আগুনের ঝুঁকি দ্রুত বাড়ছে।
বিশ্বব্যাপী ১০০ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ দাবানলের ঝুঁকির মধ্যে বাস করে এবং প্রতি বছর শত শত বিলিয়ন ডলারের সম্পদ আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

 

দাবানল প্রতিরোধে মানুষের সচেতনতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, খোলা জায়গায় আগুন জ্বালানো থেকে বিরত থাকা জরুরি, কারণ সামান্য অসতর্কতাও শুকনো ঘাস বা ঝরা পাতায় দ্রুত আগুন ছড়িয়ে দিতে পারে। বারবিকিউ বা রান্নার আগুন অবশ্যই নির্দিষ্ট স্থানে করতে হবে এবং কাজ শেষে সম্পূর্ণভাবে নিভিয়ে ফেলা অপরিহার্য। সিগারেটের আগুন নেভানো ছাড়া ফেলে দেওয়া বিপজ্জনক, কারণ একটি ছোট্ট জ্বলন্ত অংশও কয়েক মিনিটের মধ্যে বড় অগ্নিকাণ্ডের সূচনা করতে পারে। কাচের বোতল বা এমন বস্তু খোলা জায়গায় ফেলে রাখা উচিত নয় যা সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে আগুন ধরাতে পারে। কোথাও আগুন দেখা গেলে সঙ্গে সঙ্গে নিরাপদ স্থানে সরে গিয়ে জরুরি সেবাকে খবর দেওয়া উচিত।
দাবানল ছড়িয়ে পড়লে ঘরের জানালা ও দরজা বন্ধ করে ধোঁয়া প্রবেশ রোধ করা জরুরি। ঘরের ভেতরের বাতাস পরিষ্কার রাখতে ভেন্টিলেশন সিস্টেম বন্ধ রাখতে হয় এবং প্রয়োজনে ভেজা কাপড় বা তোয়ালে দিয়ে ফাঁকফোকর ঢেকে দিতে হয়। জরুরি সেবার নির্দেশনা মেনে চলা এবং দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি রাখা জীবন রক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিস্থিতি গুরুতর হলে নিজের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত স্থানত্যাগ করাই একমাত্র উপায়।দাবানলে প্রাণীদের আচরণ ও বাঁচার কৌশল

 

দাবানল শুধু মানুষের জন্য নয়, প্রাণীকুলের জন্যও এক মহাবিপর্যয়। তবে প্রাণীরা হাজার বছরের বিবর্তনে আগুন থেকে বাঁচার নানা কৌশল তৈরি করেছে।
প্রাণীরা আগুনের শব্দ, তাপমাত্রার পরিবর্তন, ধোঁয়ার গন্ধ এবং বাতাসের চাপের পরিবর্তন খুব দ্রুত শনাক্ত করতে পারে। অনেক প্রাণী ইনফ্রাসাউন্ড শনাক্ত করতে পারে, যা আগুনের আগে তৈরি হয়। ফলে তারা আগুন আসার অনেক আগেই পালানোর প্রস্তুতি নিতে পারে।
বড় প্রাণীরা সাধারণত দ্রুত পালিয়ে যায়—হরিণ, ভালুক, বন্য বিড়াল আগুনের বিপরীত দিকে ছুটে যায়। ছোট প্রাণীরা মাটির নিচে গর্তে আশ্রয় নেয়। পাখিরা উড়ে নিরাপদ স্থানে চলে যায়। অস্ট্রেলিয়ার অ্যান্টেকিনাস নামের ছোট মারসুপিয়াল গভীর গর্তে লুকিয়ে আগুন শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করে।
গবেষণা বলছে, দাবানলে সরাসরি প্রাণী মৃত্যুর হার গড়ে মাত্র ৩% হলেও আগুনের পরবর্তী সময়ে খাদ্য, পানি ও আশ্রয়ের অভাবে আরও বেশি প্রাণী মারা যায়। আগুনের পর বন পুনরুদ্ধার শুরু হলে প্রাণীরা ধীরে ধীরে ফিরে আসে।
দাবানল আজ আর কেবল একটি বিচ্ছিন্ন প্রাকৃতিক ঘটনা নয়; এটি জলবায়ু পরিবর্তন, মানবিক অসতর্কতা এবং পরিবেশগত অব্যবস্থাপনার সম্মিলিত সংকটের প্রতিচ্ছবি। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে

আরো পড়ুন

নিয়ন্ত্রণের ভারে বদলে যাওয়া অবস্থান- ব্রেক্সিটের এক দশক পর ব্রিটেনের প্রযুক্তি ও আর্থিক খাতের ইউরোপ‑দ্বিধা

ব্রিটিশ ব্যবসায়ীদের জন্য কেমন যাচ্ছে ব্রেক্সিট?

নিউজ ডেস্ক

কতো আয় হতে চলেছে টিকা আবিষ্কারকদের?

অনলাইন ডেস্ক