নাশীত রহমান || লন্ডন || ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে প্রতিটি যুগ—১৭৫৭, ১৮৫৭, ১৯৪৭, ১৯৭১, ১৯৯০, এবং সর্বশেষ ২০২৪—একই ঘটনার ভিন্ন ব্যাখ্যা তৈরি করেছে। এই ব্যাখ্যাগুলো নির্ধারিত হয়েছে রাজনৈতিক ক্ষমতা, ভাষাগত পরিচয়, রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ এবং দলীয় স্বার্থের ভিত্তিতে। ফলে ইতিহাস, ভাষা, সংবাদমাধ্যম, আমলাতন্ত্র ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী—সবই রাজনৈতিক বয়ানের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে। এই বাস্তবতা আজ বাংলাদেশের রাষ্ট্রচিন্তা ও পরিচয়কে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে।
ঐতিহাসিক ঘটনাবলির ভিন্ন বয়ান: ১৭৫৭ ও ১৮৫৭: উপনিবেশিক ইতিহাসের ভিন্ন পাঠ
১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহকে পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে “প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ” হিসেবে প্রচার করা হয়েছে। কলকাতা ছিল ব্রিটিশ ভারতের প্রশাসনিক কেন্দ্র, এবং পশ্চিমবঙ্গের মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত শ্রেণি ব্রিটিশ প্রশাসন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং চাকরির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল ছিল। ব্রিটিশ শাসন তাদের জন্য ছিল সামাজিক মর্যাদা, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং আধুনিক শিক্ষার উৎস। ফলে পশ্চিমবঙ্গের অভিজাত সমাজ ব্রিটিশ রাজের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখে এবং বিদ্রোহের সময় তাদের অবস্থান ছিল দ্বিধান্বিত বা অনেক ক্ষেত্রে ব্রিটিশপন্থী। এই কারণে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক স্মৃতিতে ১৮৫৭ বিদ্রোহের গুরুত্ব থাকলেও বাস্তব অংশগ্রহণ ছিল সীমিত।
পূর্ববঙ্গের পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। পূর্ববঙ্গ ছিল কৃষিভিত্তিক, উৎপাদনশীল এবং তুলনামূলকভাবে স্বনির্ভর অঞ্চল। এখানে মধ্যবিত্ত শ্রেণি তখনও গড়ে ওঠেনি; জমিদার, কৃষক, কারিগর এবং স্থানীয় উৎপাদনশীল শ্রেণিই ছিল সমাজের মূল শক্তি। ব্রিটিশ চাকরি বা ব্যবসার ওপর পূর্ববঙ্গের মানুষের নির্ভরতা ছিল কম। ফলে ব্রিটিশ রাজের প্রতি তাদের আনুগত্য ছিল সামাজিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতার কারণে, রাজনৈতিক আদর্শের কারণে নয়। পূর্ববঙ্গের অভিজাত মুসলিম শ্রেণি ব্রিটিশ প্রশাসনের সঙ্গে সহযোগিতা করলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্রিটিশবিরোধী মনোভাব ছিল বেশি। বিদ্রোহের কেন্দ্র পূর্ববঙ্গে না থাকলেও ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের আবেগ পূর্ববঙ্গের সমাজে গভীরভাবে উপস্থিত ছিল।
এই কারণে আজও দুই বাংলায় ১৮৫৭ বিদ্রোহের স্মরণ ভিন্ন। পশ্চিমবঙ্গ এখনও ব্রিটিশ রাজের সঙ্গে তাদের ঐতিহাসিক সম্পর্কের ধারাবাহিকতায় ১৮৫৭-কে সাংস্কৃতিক প্রতীক হিসেবে দেখে, কিন্তু পূর্ববঙ্গ—বর্তমান বাংলাদেশ—১৮৫৭-কে ব্রিটিশবিরোধী প্রথম প্রতিরোধ হিসেবে উদযাপন করে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে জাতীয় পরিচয় গঠনের সময় ১৮৫৭ বিদ্রোহকে স্বাধীনতার ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হয়। পাঠ্যপুস্তক, জাতীয় দিবসের আলোচনা এবং রাজনৈতিক বয়ানে ১৮৫৭-কে ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামের সূচনা হিসেবে তুলে ধরা হয়। ফলে পূর্ববঙ্গের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা ও জাতীয়তাবাদী বয়ান মিলিয়ে ১৮৫৭ আজ বাংলাদেশের কাছে পশ্চিমবঙ্গের তুলনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
এভাবে দেখা যায় যে একই ঘটনা—১৮৫৭ বিদ্রোহ—দুই বাংলায় দুই ভিন্ন অর্থ বহন করে। পশ্চিমবঙ্গের মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত শ্রেণি ব্রিটিশ চাকরি ও ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল ছিল বলে তাদের রাজনৈতিক অবস্থান ছিল ব্রিটিশপন্থী; আর পূর্ববঙ্গ ছিল কৃষিভিত্তিক, উৎপাদনশীল এবং তুলনামূলকভাবে স্বনির্ভর, যার ফলে ব্রিটিশবিরোধী মনোভাব সেখানে বেশি ছিল। এই বাস্তবতা আজও দুই বাংলার স্মৃতিচর্চায় প্রতিফলিত হয়—পূর্ববঙ্গ ১৮৫৭-কে স্বাধীনতার প্রথম যুদ্ধ হিসেবে উদযাপন করে, আর পশ্চিমবঙ্গ তা সাংস্কৃতিক-ঐতিহাসিক প্রতীক হিসেবে স্মরণ করে।
১৯৪৭: বিভাজনের দুই ভিন্ন স্মৃতি
১৯৪৭ সালের বিভাজন পাকিস্তান ও বাংলাদেশের কাছে দুই ভিন্ন অভিজ্ঞতা এবং দুই ভিন্ন স্মৃতি তৈরি করেছে। পাকিস্তানের কাছে ১৯৪৭ ছিল স্বাধীনতার মুহূর্ত—একটি নতুন রাষ্ট্রের জন্ম, মুসলমানদের জন্য পৃথক জাতিরাষ্ট্রের বাস্তবায়ন, এবং ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্তি। পাকিস্তানের জাতীয় বয়ানে ১৯৪৭ হলো বিজয়ের বছর, যেখানে রাষ্ট্রের জন্মকে ধর্মীয় পরিচয় ও রাজনৈতিক আদর্শের সাফল্য হিসেবে তুলে ধরা হয়।
কিন্তু পূর্ববঙ্গের অভিজ্ঞতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। পূর্ববঙ্গ ১৯৪৭-এ স্বাধীন রাষ্ট্র পায়নি; বরং পাকিস্তানের অংশ হয়ে যায়। নতুন রাষ্ট্রে অন্তর্ভুক্তি পূর্ববঙ্গের জন্য ছিল এক ধরনের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, যেখানে পশ্চিম পাকিস্তানের আধিপত্য দ্রুত স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ভাষা, প্রশাসন, অর্থনীতি এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ক্ষেত্রে পূর্ববঙ্গ বৈষম্য ও দমন-পীড়নের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়। পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় কাঠামো পশ্চিম পাকিস্তানকেন্দ্রিক হওয়ায় পূর্ববঙ্গের মানুষ দ্রুত বুঝতে পারে যে ১৯৪৭ তাদের জন্য স্বাধীনতার সমাপ্তি নয়, বরং নতুন বৈষম্যের সূচনা।
এই অভিজ্ঞতার পার্থক্যই ভাষা আন্দোলনের জন্ম দেয়। পাকিস্তান রাষ্ট্র উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করলে পূর্ববঙ্গের মানুষ বুঝতে পারে যে তাদের ভাষা, সংস্কৃতি এবং পরিচয় রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে স্বীকৃতি পাচ্ছে না। ভাষা আন্দোলন তাই পূর্ববঙ্গের রাজনৈতিক আত্মপরিচয়ের প্রথম বড় প্রতিরোধ হয়ে ওঠে। পাকিস্তানে ভাষা আন্দোলনের কোনো প্রতিধ্বনি ছিল না, কারণ পশ্চিম পাকিস্তানের কাছে ১৯৪৭ ছিল সম্পূর্ণ বিজয়ের গল্প; সেখানে ভাষা বা সাংস্কৃতিক বৈষম্যের অভিজ্ঞতা ছিল না।
ফলে দেখা যায়, একই ঘটনা—১৯৪৭—পাকিস্তান ও বাংলাদেশের কাছে দুই ভিন্ন অর্থ বহন করে। পাকিস্তানের কাছে এটি স্বাধীনতার জন্ম, আর বাংলাদেশের কাছে এটি ছিল এমন একটি রাষ্ট্রে অন্তর্ভুক্তি, যা পরবর্তীতে বৈষম্য, সাংস্কৃতিক দমন এবং রাজনৈতিক বঞ্চনার অভিজ্ঞতায় রূপ নেয়। এই ভিন্ন অভিজ্ঞতাই পরবর্তীতে বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, স্বায়ত্তশাসন দাবি এবং শেষ পর্যন্ত ১৯৭১-এর স্বাধীনতা যুদ্ধের ভিত্তি তৈরি করে।
১৯৯০: স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের দলভেদে ব্যাখ্যা
জাতীয় পার্টির কাছে ১৯৯০ ছিল “অবৈধ আন্দোলন”; বিএনপি ও আওয়ামী লীগের কাছে এটি ছিল “গণঅভ্যুত্থান”—যেখানে তারা নিজেদের ভূমিকা বড় করে দেখায়। একই ঘটনার তিনটি ভিন্ন রাজনৈতিক ইতিহাস তৈরি হয়েছে।
জুলাই ২০২৪: নতুন রাষ্ট্রবোধের জন্ম
জুলাই ২০২৪ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক সম্পূর্ণ নতুন অধ্যায়। এই আন্দোলনকে অনেকেই ১৯৭১-এর সঙ্গে তুলনা করলেও প্রকৃতপক্ষে দুই ঘটনার চরিত্র, উদ্দেশ্য এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়া একেবারেই আলাদা। ১৯৭১ ছিল বহিরাগত দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার যুদ্ধ, যেখানে পাকিস্তানি সামরিক শাসন ছিল প্রধান প্রতিপক্ষ। কিন্তু জুলাই ২০২৪ ছিল ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে এবং আওয়ামী লীগের ফ্যাসিস্ট শাসন ও রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতা কাঠামোর বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থান। এটি ছিল এমন এক বিদ্রোহ যেখানে ছাত্র-জনতা রাষ্ট্রযন্ত্রের দীর্ঘদিনের আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। এই আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রকে পুনর্গঠন করা, ক্ষমতার কেন্দ্রকে ভেঙে দেওয়া এবং নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা।
বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা বহু বছর ধরে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল – আওয়ামী লীগের হাতে কেন্দ্রীভূত ছিল। আমলাতন্ত্র, বিচারব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সংবাদমাধ্যম—সবই সেই ক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চলত। জুলাই ২০২৪-এর আন্দোলন এই কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করে। ছাত্ররা যখন রাস্তায় নামে, তখন তারা শুধু সরকারের পতন নয়, রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দেয়। এই আন্দোলনের শক্তি ছিল সংগঠিত রাজনৈতিক দলের বাইরে থাকা সাধারণ মানুষ, যারা রাষ্ট্রের ওপর নিজেদের মালিকানা দাবি করে। এই কারণে আন্দোলনটি ছিল অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ—রাষ্ট্রের ভেতরের ক্ষমতার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের জনগণের প্রতিরোধ।
১৯৭১-এর তুলনায় জুলাই ২০২৪-এর আন্দোলন ছিল আরও জটিল। ১৯৭১-এ প্রতিপক্ষ ছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনী; রাষ্ট্রের ভেতরে প্রতিরোধের শক্তি ছিল একমুখী। কিন্তু ২০২৪-এ প্রতিপক্ষ ছিল রাষ্ট্রের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান—পুলিশ, র্যাব, আমলাতন্ত্র, দলীয় ছাত্রসংগঠন এবং রাজনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রিত প্রশাসনিক কাঠামো। এই কারণে আন্দোলনটি ছিল রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার বিরুদ্ধে জনগণের সংঘর্ষ। এটি ছিল রাষ্ট্রের ভেতরেই রাষ্ট্রের পুনর্জন্ম।
ইউনুস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে ইতিহাস পুনর্লিখনের প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রাষ্ট্র যখন নতুন বয়ান তৈরি করতে চায়, তখন প্রথম আঘাত আসে প্রতীক ও স্মৃতির ওপর। শেখ মুজিবের প্রতিকৃতি অপসারণ, সরকারি ভবন থেকে মুজিববাদী প্রতীক সরানো, জাতীয় দিবসের ব্যাখ্যা পরিবর্তন—এসবই রাষ্ট্রীয় বয়ান পুনর্গঠনের অংশ। ইতিহাসকে পুনর্লিখন করা হয় রাজনৈতিক প্রয়োজন অনুযায়ী। নতুন পাঠ্যক্রমে ১৯৭১-এর বর্ণনা পরিবর্তন, ভাষা আন্দোলনের গুরুত্ব পুনর্মূল্যায়ন, পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন—এসবই দেখায় যে রাষ্ট্র নতুন পরিচয় তৈরি করতে চাইছে। এটি ইতিহাসের স্বাভাবিক বিবর্তন নয়; এটি রাজনৈতিক ক্ষমতার দ্বারা পরিচালিত ইতিহাস নির্মাণ।
বাংলাদেশে ইতিহাস কখনোই নিরপেক্ষভাবে লেখা হয়নি। ১৯৭৫-এর পর সামরিক শাসন ইতিহাসকে বদলে দেয়। ১৯৯১-এর পর গণতন্ত্র ইতিহাসকে দলীয়ভাবে ভাগ করে। ২০০৯-এর পর ইতিহাস হয়ে ওঠে একদলীয় বয়ান। ২০২৪-এর পর ইতিহাস আবার নতুনভাবে লেখা হচ্ছে। প্রতিটি সরকার ইতিহাসকে ব্যবহার করেছে নিজেদের বৈধতা প্রতিষ্ঠার জন্য। ইতিহাস হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক ক্ষমতার হাতিয়ার। এই কারণে একই ঘটনা—১৯৭১, ১৯৯০, ২০০৭, ২০২৪—ভিন্ন রাজনৈতিক দলের কাছে ভিন্ন অর্থ বহন করে।
জুলাই ২০২৪-এর আন্দোলন সংবাদমাধ্যমের চরিত্রও বদলে দেয়। যে গণমাধ্যম একসময় সরকারের প্রচারযন্ত্র ছিল, আন্দোলনের সময় তারা নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের বয়ানও পাল্টে যায়। এটি দেখায় যে সংবাদমাধ্যম বাস্তবতার প্রতিফলন নয়; তারা ক্ষমতার প্রতিফলন। একইভাবে আমলাতন্ত্র ও বিচারব্যবস্থা রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের অবস্থান সামঞ্জস্য করে। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো নিরপেক্ষ নয়; তারা ক্ষমতার সঙ্গে চলতে অভ্যস্ত।
জুলাই ২০২৪-এর আন্দোলন বাংলাদেশের রাষ্ট্রবোধকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে। এটি দেখিয়েছে যে রাষ্ট্রের মালিক জনগণ, রাজনৈতিক দল নয়। এটি দেখিয়েছে যে ক্ষমতার কাঠামো ভাঙা সম্ভব, যদি জনগণ সংগঠিত হয়। এটি দেখিয়েছে যে ইতিহাস শুধু অতীত নয়; এটি বর্তমানের রাজনৈতিক প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়। এটি দেখিয়েছে যে ভাষা, প্রতীক, স্মৃতি—সবই রাজনৈতিক হাতিয়ার। এবং সবচেয়ে বড় কথা, এটি দেখিয়েছে যে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহও একটি নতুন রাষ্ট্রবোধের জন্ম দিতে পারে।
বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটলে রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান—সংবাদমাধ্যম, আমলাতন্ত্র, বিচারব্যবস্থা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী—একই ঘটনার ভিন্ন অবস্থান নেয়। গবেষণা ও বাস্তব অভিজ্ঞতা দেখায় যে এই প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাধীনভাবে কাজ করে না; বরং ক্ষমতার কেন্দ্রের সঙ্গে নিজেদের অবস্থান সামঞ্জস্য করে। ফলে একটি সরকারে যে গণমাধ্যমকে দেশপ্রেমিক বলা হয়, অন্য সরকারে সেই একই গণমাধ্যমকে বিরোধী বা পক্ষপাতদুষ্ট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। সংবাদমাধ্যমের এই অবস্থান পরিবর্তন শুধু সম্পাদকীয় নীতির কারণে নয়; বরং রাজনৈতিক চাপ, মালিকানার স্বার্থ, বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণ এবং রাষ্ট্রীয় প্রভাবের কারণে ঘটে। বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম বহু বছর ধরে রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে সমন্বয় করে চলেছে। ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তাদের ভাষা, বয়ান, বিশ্লেষণ এবং সংবাদ পরিবেশনের ধরন পাল্টে যায়। এটি দেখায় যে সংবাদমাধ্যম বাস্তবতার প্রতিফলন নয়; তারা ক্ষমতার প্রতিফলন।
আমলাতন্ত্রের আচরণও একই রকম। বাংলাদেশের আমলাতন্ত্র ঐতিহাসিকভাবে রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কাজ করে। ১৯৭৫-এর পর সামরিক শাসন আমলাতন্ত্রকে রাজনৈতিকভাবে পুনর্গঠন করে। ১৯৯১-এর পর গণতন্ত্র আমলাতন্ত্রকে দলীয়ভাবে ভাগ করে। ২০০৯-এর পর আমলাতন্ত্র আরও কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ে এবং রাজনৈতিক আনুগত্যই পদোন্নতি ও দায়িত্ব বণ্টনের প্রধান মানদণ্ড হয়ে ওঠে। ফলে সরকার পরিবর্তন হলে আমলাতন্ত্রের অবস্থানও দ্রুত বদলে যায়। যে কর্মকর্তা এক সরকারে প্রভাবশালী ছিলেন, অন্য সরকারে তিনি হয়তো উপেক্ষিত হন। এই আচরণ দেখায় যে আমলাতন্ত্র রাষ্ট্রের স্থায়ী প্রতিষ্ঠান হলেও তাদের কার্যক্রম রাজনৈতিক ক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল।
বিচারব্যবস্থার অবস্থান পরিবর্তন আরও সূক্ষ্ম। বিচারব্যবস্থা স্বাধীন হলেও বাস্তবে রাজনৈতিক চাপ, নিয়োগ প্রক্রিয়া, পদোন্নতি এবং প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের কারণে তাদের অবস্থানও ক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য করে। বিভিন্ন সময়ে দেখা গেছে যে রাজনৈতিক মামলার রায় ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায়। একই ঘটনার বিচার ভিন্ন সরকারের অধীনে ভিন্ন ব্যাখ্যা পায়। এটি বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে এবং দেখায় যে রাষ্ট্রীয় বয়ান বিচারিক সিদ্ধান্তেও প্রভাব ফেলে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আচরণ সবচেয়ে স্পষ্টভাবে রাজনৈতিক বয়ানের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। বাংলাদেশের পুলিশ, র্যাব এবং অন্যান্য বাহিনী ঐতিহাসিকভাবে ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সমন্বয় করে চলে। আন্দোলন দমন, বিরোধী দলের ওপর মামলা, রাজনৈতিক নেতাদের গ্রেপ্তার—এসবই সরকারের নির্দেশে পরিচালিত হয়। ২০২৪ সালের আন্দোলনে এই আচরণ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আন্দোলনের প্রথম দিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর অবস্থান নেয়, কিন্তু আন্দোলন যখন রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে নাড়িয়ে দেয়, তখন তাদের অবস্থান দ্রুত বদলে যায়। অনেক বাহিনী নিরপেক্ষ অবস্থান নেয়, কেউ কেউ আন্দোলনকারীদের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়, এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে গেলে বাহিনীর আচরণও নতুন বয়ানের সঙ্গে সামঞ্জস্য করে। এটি দেখায় যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী রাষ্ট্রের আইন নয়, বরং রাষ্ট্রের ক্ষমতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলে।
বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর এই আচরণ প্রমাণ করে যে বয়ানই তাদের অবস্থান নির্ধারণ করে। রাজনৈতিক ক্ষমতা পরিবর্তিত হলে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোও নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করে। সংবাদমাধ্যমের ভাষা বদলে যায়, আমলাতন্ত্রের আনুগত্য বদলে যায়, বিচারব্যবস্থার ব্যাখ্যা বদলে যায়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আচরণ বদলে যায়। এই বাস্তবতা দেখায় যে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাধীন নয়; তারা রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত। ফলে একই ঘটনা ভিন্ন সরকারের অধীনে ভিন্ন অর্থ বহন করে। একই সংবাদ ভিন্নভাবে পরিবেশিত হয়। একই আইন ভিন্নভাবে প্রয়োগ হয়। একই আন্দোলন ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হয়। রাষ্ট্রের এই আচরণ বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি স্থায়ী বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।ভাষা ও পরিচয়: বয়ান নিয়ন্ত্রণের মূল অস্ত্র। বাংলাদেশে ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়—এটি রাজনৈতিক পরিচয়ের কেন্দ্র।
ইতিহাস নিয়ন্ত্রণ: রাজনৈতিক ক্ষমতার হাতিয়ার
বাংলাদেশে ইতিহাস কখনোই নিরপেক্ষভাবে লেখা হয়নি। প্রতিটি সরকার নিজেদের রাজনৈতিক প্রয়োজন অনুযায়ী ইতিহাসকে পুনর্গঠন করেছে। পাঠ্যপুস্তক পরিবর্তন করা হয়েছে, জাতীয় দিবসের ব্যাখ্যা বদলানো হয়েছে, রাষ্ট্রীয় প্রতীক ও স্মৃতি নতুনভাবে সাজানো হয়েছে, এবং বিরোধী রাজনৈতিক বয়ানকে বিভিন্নভাবে দমন করা হয়েছে। ফলে ইতিহাস ধীরে ধীরে অতীতের নিরপেক্ষ দলিল না হয়ে রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রতিফলনে পরিণত হয়েছে। ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ইতিহাসের ভাষা, ব্যাখ্যা এবং গুরুত্বও বদলে গেছে, যা দেখায় যে বাংলাদেশের ইতিহাস রাষ্ট্রীয় বয়ানের ওপর নির্ভরশীল এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্য পূরণের জন্য ব্যবহৃত হয়।
বাংলাদেশে একই ঘটনা—১৭৫৭, ১৮৫৭, ১৯৪৭, ১৯৭১, ১৯৯০, ২০২৪—ভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির কাছে ভিন্ন অর্থ বহন করে। ইতিহাস, ভাষা, সংবাদমাধ্যম, আমলাতন্ত্র ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী—সবই রাজনৈতিক বয়ানের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। এ কারণেই বাংলাদেশের ইতিহাস একক নয়; এটি বহুস্তরীয়, বহু-বয়ানসমৃদ্ধ এবং রাজনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রিত।

