লন্ডন বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ নগর উন্নয়ন পুরস্কার ‘লি কুয়ান ইউ ওয়ার্ল্ড সিটি প্রাইজ ২০২৬’ অর্জন করেছে। এই অর্জনের মধ্য দিয়ে নগর পরিকল্পনা, পরিবেশ সুরক্ষা, গণপরিবহন উন্নয়ন এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে লন্ডনের দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে। একই সঙ্গে লন্ডনের মেয়র স্যার সাদিক খানের নেতৃত্বেরও প্রশংসা করেছে আয়োজক কর্তৃপক্ষ।
সিঙ্গাপুরের আরবান রিডেভেলপমেন্ট অথরিটি (ইউআরএ) এবং সেন্টার ফর লাইভেবল সিটিজ যৌথভাবে ২০১০ সালে এই দ্বিবার্ষিক আন্তর্জাতিক পুরস্কার চালু করে। নগরায়ণের জটিল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে বাসযোগ্য, প্রাণবন্ত এবং টেকসই শহর গঠনে অসাধারণ উদ্ভাবন, কার্যকর শাসনব্যবস্থা এবং দূরদর্শী নেতৃত্বের স্বীকৃতি হিসেবেই এই পুরস্কার দেওয়া হয়।
২০২৬ সালের অষ্টম আসরে বিচারকরা লন্ডনকে বিজয়ী ঘোষণা করেন। তাদের মতে, ৯০ লাখেরও বেশি জনসংখ্যা এবং ৩২টি বরো নিয়ে গঠিত জটিল প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যেও লন্ডন ধারাবাহিক নেতৃত্ব, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং উদ্ভাবনী নীতির মাধ্যমে নিজেকে নতুন করে গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে।
লন্ডনের এই স্বীকৃতির পেছনে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ ভূমিকা রেখেছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো আল্ট্রা লো এমিশন জোন (ULEZ), যা বিশ্বের বৃহত্তম পরিচ্ছন্ন বায়ু কর্মসূচিগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত। এই কর্মসূচির ফলে মধ্য লন্ডনে নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা প্রায় ৫৪ শতাংশ কমেছে, যা নগরবাসীর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।
এ ছাড়া মেয়র সাদিক খানের উদ্যোগে চালু হওয়া সর্বজনীন বিনামূল্যে স্কুল খাবার কর্মসূচিও আন্তর্জাতিক প্রশংসা কুড়িয়েছে। এই কর্মসূচির আওতায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে, যা প্রতি শিশুর পরিবারের বছরে ৫০০ পাউন্ডেরও বেশি অর্থ সাশ্রয় করতে সহায়তা করেছে।
গণপরিবহন উন্নয়নেও লন্ডনের সাফল্য বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এলিজাবেথ লাইন, যা প্রায় ১১৮ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি রেল নেটওয়ার্ক, চালু হওয়ার পর থেকে ৮০ কোটির বেশি যাত্রী পরিবহন করেছে। এই অবকাঠামো উন্নয়নকে কেন্দ্র করে ৭১ হাজারের বেশি নতুন আবাসন নির্মাণের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, যা নগর পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
এ ছাড়া কিংস ক্রস এবং কুইন এলিজাবেথ অলিম্পিক পার্কের মতো প্রকল্পগুলোকে নগর পুনরুজ্জীবনের সফল উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে অলিম্পিক পার্ক এলাকায় প্রায় ১ দশমিক ১ বিলিয়ন পাউন্ড বিনিয়োগের মাধ্যমে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও আবাসন খাতের সমন্বিত উন্নয়ন সাধন করা হয়েছে।
পুরস্কার প্রাপ্তির পর প্রতিক্রিয়ায় মেয়র সাদিক খান বলেন, “এই সম্মান লন্ডনের জনগণের সৃজনশীলতা, সহনশীলতা এবং ঐক্যের স্বীকৃতি। বিষাক্ত বায়ু দূষণ মোকাবিলা থেকে শুরু করে এলিজাবেথ লাইন চালু করা, তরুণদের জন্য ১০ কোটির বেশি বিনামূল্যে স্কুল খাবার সরবরাহ করা এবং আমাদের বৈচিত্র্যময় সমাজকে শক্তিতে পরিণত করা—সবই গত এক দশকের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল।”
তিনি আরও বলেন, “লন্ডন সুযোগ, অগ্রগতি এবং বৈচিত্র্যের শহর। আমরা একসঙ্গে আরও নিরাপদ, ন্যায়ভিত্তিক, সবুজ এবং সমৃদ্ধ লন্ডন গড়ে তুলতে কাজ করে যাব।”
প্রাইজ কমিটির চেয়ারম্যান ড. চিয়ং কুন হিয়ান মন্তব্য করেন, “লন্ডন দেখিয়েছে কীভাবে একটি ঐতিহাসিক বৈশ্বিক শহর উদ্ভাবনী নেতৃত্ব ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিকল্পনার মাধ্যমে নিজেকে সময়ের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারে। ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং আধুনিকায়নের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে তারা অন্যান্য শহরের জন্য একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।”
এবারের পুরস্কারে লন্ডনের পাশাপাশি বিশেষ স্বীকৃতি পেয়েছে বেলজিয়ামের অ্যান্টওয়ার্প, হাঙ্গেরির বুদাপেস্ট, চীনের গুয়াংজু ও তিয়ানজিন এবং তাইওয়ানের তাইপে। নগর উন্নয়ন ও নাগরিক অংশগ্রহণে উদ্ভাবনী উদ্যোগ গ্রহণের জন্য এসব শহরকে সম্মানিত করা হয়েছে।
আগামী বিশ্ব সিটিজ সামিটে আনুষ্ঠানিকভাবে লন্ডনের হাতে এই পুরস্কার তুলে দেওয়া হবে। পুরস্কারের অংশ হিসেবে লন্ডন একটি স্মারক পদক এবং নগদ অর্থও পাবে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বের বিভিন্ন শহর যখন জলবায়ু পরিবর্তন, জনসংখ্যার চাপ এবং সামাজিক বৈষম্যের মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে, তখন লন্ডনের এই অর্জন দেখিয়ে দিয়েছে যে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং জনসম্পৃক্ততার মাধ্যমে একটি শহরকে আরও বাসযোগ্য ও টেকসই করে তোলা সম্ভব।
সূত্রঃ লন্ডন সিটি হল \ ইউ আর এ
এম.কে

