23.8 C
London
June 16, 2026
TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

যুক্তরাজ্যকে বাঁচাতে টোরিদের ছয় দফা রূপরেখাঃ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত

যুক্তরাজ্য ক্রমবর্ধমান জাতীয় ঋণ, স্থবির অর্থনীতি, উচ্চ কর, ব্যাপক অভিবাসন এবং তরুণদের বেকারত্বের মতো একাধিক সংকটের মুখোমুখি। এমন পরিস্থিতিতে দেশকে “পতনের হাত থেকে রক্ষা” করতে কনজারভেটিভ পার্টির নেতা কেমি ব্যাডেনকের সামনে ছয় দফা সংস্কার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছেন দলটির জ্যেষ্ঠ সংসদ সদস্য বার্নার্ড জেনকিন।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এক মতামতধর্মী নিবন্ধে তিনি দাবি করেন, যুক্তরাজ্য বর্তমানে এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে সাহসী ও কঠোর সিদ্ধান্ত ছাড়া জাতীয় সমৃদ্ধি এবং নিরাপত্তা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে না।

তার মতে, ব্রিটেনের অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরে ধীরগতির প্রবৃদ্ধির ফাঁদে আটকে আছে। সরকারি ব্যয় ও জাতীয় ঋণ বেড়েই চলেছে, অন্যদিকে উচ্চ করের কারণে বিনিয়োগ ও দক্ষ জনশক্তি বিদেশমুখী হচ্ছে।

তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমানে প্রায় ১০ লাখ তরুণ শিক্ষা, কর্মসংস্থান কিংবা প্রশিক্ষণ—কোনোটির সঙ্গেই যুক্ত নয়। এটি শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং সামাজিক সংকটও বটে।

বার্নার্ড জেনকিনের মতে, কেমি ব্যাডেনকের নেতৃত্বাধীন কনজারভেটিভ পার্টির ভবিষ্যৎ নির্বাচনী ইশতেহারে ছয়টি মৌলিক লক্ষ্য স্পষ্টভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন, যাতে জনগণের কাছ থেকে কঠিন সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নের রাজনৈতিক অনুমোদন পাওয়া যায়।

তার প্রস্তাবিত প্রথম পদক্ষেপ হলো সরকারি ব্যয় হ্রাস। তিনি মনে করেন, ব্যয় কমিয়ে জাতীয় ঋণ নিয়ন্ত্রণ, কর হ্রাস এবং প্রতিরক্ষা খাতে অতিরিক্ত বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, তিনি কল্যাণমূলক ব্যয় সংস্কারের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। তার দাবি, কর্মক্ষম বয়সী বিপুলসংখ্যক মানুষ বর্তমানে সরকারি ভাতার ওপর নির্ভরশীল থাকলেও তাদের কর্মসংস্থানে ফিরিয়ে আনার কার্যকর উদ্যোগ নেই।

তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় সহায়তা সবচেয়ে অসহায় মানুষদের জন্য প্রয়োজনীয় হলেও দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরশীলতা ব্যক্তি ও সমাজ—উভয়ের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

প্রবন্ধে তিনি যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধিকেও সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানান। তার মতে, ইউরোপের নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির প্রেক্ষাপটে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।

এ ছাড়া ব্যাপক কর সংস্কারের কথাও বলেন তিনি। তার মতে, মধ্যবিত্ত শ্রেণি এবং বিনিয়োগকারীদের ওপর অতিরিক্ত করের বোঝা চাপিয়ে অর্থনৈতিক গতি ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। বরং আয়, মূলধন এবং সম্পত্তির ওপর করের হার যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পেতে পারে।

বার্নার্ড জেনকিন আরও দাবি করেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে আসার পরও যুক্তরাজ্যে অনেক পুরোনো নিয়ন্ত্রক কাঠামো বহাল রয়েছে, যা ব্যবসা-বাণিজ্য এবং উদ্ভাবনের পথে বাধা সৃষ্টি করছে।

তিনি কর্মসংস্থান সম্পর্কিত কিছু আইন পুনর্বিবেচনারও আহ্বান জানান এবং বলেন, অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে নিরুৎসাহিত করতে পারে।

তবে তার আলোচনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে অভিবাসন ইস্যু।

জেনকিনের মতে, গত দুই দশকে বিভিন্ন সরকার অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে কাঙ্ক্ষিত ফল আনতে পারেনি। এতে জনগণের মধ্যে রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে এবং বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির প্রতি সমর্থন বৃদ্ধি পেয়েছে।

তিনি বলেন, অভিবাসন নীতি কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের জন্য আন্তর্জাতিক আইনি বাধাগুলো পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের মার্চ পর্যন্ত এক বছরে যুক্তরাজ্যে নিট অভিবাসনের সংখ্যা ৯ লাখ ৪৪ হাজারে পৌঁছেছিল, যা দেশটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ পর্যায়ের একটি।

প্রবন্ধে তিনি সতর্ক করে বলেন, জনগণের উদ্বেগের যথাযথ সমাধান না করা হলে ভবিষ্যতে রাজনৈতিক মেরুকরণ আরও তীব্র হতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, কনজারভেটিভ পার্টি বর্তমানে জনসমর্থন পুনরুদ্ধারের কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে অর্থনীতি, জনসেবা, প্রতিরক্ষা এবং অভিবাসন নিয়ে দলটির ভবিষ্যৎ অবস্থান আগামী সাধারণ নির্বাচনের আগে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিতে পারে।

তবে সমালোচকদের মতে, সরকারি ব্যয় কমানো, কল্যাণমূলক কর্মসূচি সংস্কার এবং অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের মতো প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন করতে গেলে সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও তৈরি হতে পারে।

ফলে কেমি ব্যাডেনকের নেতৃত্বাধীন কনজারভেটিভ পার্টি যদি পুনরায় ক্ষমতায় ফেরার লক্ষ্য নিয়ে এগোয়, তাহলে তাদের শুধু উচ্চাভিলাষী প্রতিশ্রুতিই নয়, বরং সেসব বাস্তবায়নের গ্রহণযোগ্য ও কার্যকর রূপরেখাও জনগণের সামনে উপস্থাপন করতে হবে।

সূত্রঃ দ্য টেলিগ্রাফ

এম.কে

আরো পড়ুন

যুক্তরাজ্যে আশ্রয়প্রার্থীদের সঙ্গে প্রতারণার ফাঁদ

যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা বাজেটে ঘাটতির রেকর্ড

রুয়ান্ডা প্রকল্পের নামে ১৩৪ মিলিয়ন ফান্ড ধ্বংস করেছে কনজার্ভেটিভ সরকারঃ রিপোর্ট